০২:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
মুম্বাই বিমানবন্দরে ১২ কোটি রুপির মাদকসহ সাবেক ‘মিসেস কেরালা’ প্রতিযোগী গ্রেপ্তার সকলকে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে -পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আগ্রহের কেন্দ্রে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতির নির্বাচন বিশ্বকাপে প্রথম খেলায় চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে কোরিয়ার জয় প্রতারক সন্দেহে খাসি ব্যবসায়ীকে বাড়িতে ডেকে মহিলাদের নির্যাতন, টাকা লুটের অভিযোগ লাল কার্ডের রেকর্ডেও উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের ধারায় মেক্সিকো দাঙ্গা আর মামলার ঝক্কি এড়িয়ে শান্তি ফিরবে কি অশান্ত সালথায়? নীরব ঘাতক ‘ফ্যাটি লিভার’: সচেতনতাই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি স্কুলের সামনে বিটুমিন পোড়ানোর ধোঁয়ায় অসুস্থ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ফরিদপুরে শিকারি সাংবাদিকতার তদন্ত দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন স্মারকলিপি

এআই যুগের চ্যালেঞ্জ: অতীত ও ভবিষ্যত [১ম পর্ব]

দীপ্ত মন্ডল ও রইছউদ্দিন
  • আপডেট সময় : ১১:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
  • / 50

ছবিটি প্রতীকী

মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা এআই। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এখন তথ্য থেকে স্বাস্থ্যখাতেবিরাট অগ্রগতি এসেছে। অনেক কিছুই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতা এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করছে পরবর্তী যুগের ভয়ংকর মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সবমিলিয়ে  প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতা কি ভবিষ্যত দুনিয়াকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলবে? ধারাবাহিক পর্বে সেইসব দিকগুলোই খতিয়ে দেখা হয়েছে অগ্নিপ্রহরের এই বিশেষ প্রতিবেদনে। লিখেছেন আইটি প্রতিবেদক দীপ্ত মন্ডল ও রইছ উদ্দিন।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞানের কোনো শাখা যদি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে থাকে, তবে তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। মানুষের চিন্তাশক্তিকে যান্ত্রিকভাবে পুনরুৎপাদন করার এই উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব, সমাজ এবং ভবিষ্যতের ভিত্তিগুলোকে আমূল পুনর্গঠনের এক মহাপরিকল্পনা। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের কল্পিত ‘অটোমাটন’ থেকে শুরু করে আজকের অতি-বুদ্ধিমান লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমা, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এআই একাধারে অপার সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং একই সাথে মানবজাতির জন্য এক অনিশ্চিত ও সমূহ বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে ।

প্রারম্ভিক ভিত্তি ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট: যান্ত্রিক চিন্তার উন্মেষ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি আধুনিক মনে হলেও এর তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি সহস্রাব্দ প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দেই গ্রিক, চীনা এবং ভারতীয় দার্শনিকরা যুক্তিবিদ্যার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিকদের চিন্তাধারা এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, মানুষের চিন্তন পদ্ধতি এক ধরনের গাণিতিক ও যৌক্তিক কাঠামোর অনুসারী। এই ‘মেকানাইজেশন অফ থট’ বা চিন্তার যান্ত্রিকীকরণই আজকের এআই-এর মূল ভিত্তি ।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে গটফ্রাইড লাইবনিজ এবং রেনে দেকার্তের মতো বিজ্ঞানীরা মানুষের চিন্তাকে একটি সার্বজনীন গাণিতিক ভাষায় রূপান্তর করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে উনিশ শতকে চার্লস ব্যাবেজ এবং অ্যাডা লাভলেসের কাজ এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮৩৭ সালে ব্যাবেজের নকশা করা ‘অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’ ছিল আধুনিক কম্পিউটারের প্রথম তাত্ত্বিক রূপ। অ্যাডা লাভলেস প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই যন্ত্র কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং সংগীত বা গ্রাফিক্সের মতো প্রতীকী তথ্যও প্রক্রিয়া করতে সক্ষম ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই দার্শনিক ভাবনাগুলো গাণিতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ডেভিড হিলবার্টের আনুষ্ঠানিক যুক্তিবিদ্যার আহ্বান এবং তার প্রতিক্রিয়ায় কুর্ট গোডেলের ‘ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম’ এবং অ্যালান টুরিংয়ের ‘টুরিং মেশিন’ ধারণাটি প্রমাণের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়। তবে চার্চ-টুরিং থিসিস নির্দেশ করে যে, যেকোনো যৌক্তিক বা গাণিতিক সমস্যা যদি সুসংজ্ঞায়িত হয়, তবে একটি যান্ত্রিক ডিভাইস (যেমন টুরিং মেশিন) তা সমাধান করতে সক্ষম । ১৯৪০-এর দশকের স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি এবং ক্লদ শ্যাননের ইনফরমেশন থিওরি দেখায় যে, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ইলেকট্রিক পালসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে, যা ডিজিটাল লজিকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ।

৯৫৬ ডার্টমাউথ সম্মেলন: একটি আধুনিক শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক জন্ম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ডার্টমাউথ সম্মেলনে। ডার্টমাউথ কলেজের তরুণ গণিতবিদ জন ম্যাকার্থি এই সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং তিনিই প্রথম ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি চয়ন করেন । সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মারভিন মিনস্কি, ক্লদ শ্যানন, নাথানিয়েল রোচেস্টার এবং অ্যালেন নেওয়েল ও হার্বার্ট সাইমনের মতো প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা।

এই সম্মেলনের মূল প্রস্তাবনা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী: “শিখনের প্রতিটি দিক বা বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে এত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যে, একটি যন্ত্র তা অনুকরণ করতে সক্ষম হবে” 。 এই সম্মেলনে নেওয়েল এবং সাইমন তাদের ‘লজিক থিওরিস্ট’ নামক প্রোগ্রামটি প্রদর্শন করেন, যা গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করতে সক্ষম ছিল। ডার্টমাউথ সম্মেলনকে এআই-এর সূতিকাগার বলা হয় কারণ এখান থেকেই প্রথমবার গবেষকরা একত্রিত হয়ে যন্ত্রের চিন্তাশক্তি তৈরির একটি সুসংগঠিত রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন 。

সম্মেলন পরবর্তী দুই দশকে (১৯৫৬-১৯৭০) এআই গবেষণায় এক স্বর্ণযুগ বা ‘গোল্ডেন এজ’ পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন যে, মানুষের সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ (AGI) অর্জন করা কেবল কয়েক দশকের ব্যাপার। ১৯৫৮ সালে জন ম্যাকার্থি ‘লিস্প’ (LISP) প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করেন, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এআই গবেষণার প্রধান হাতিয়ার ছিল । ১৯৫৯ সালে আর্থার স্যামুয়েল ‘মেশিন লার্নিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং একটি স্বয়ংক্রিয় চেকার্স খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করেন যা নিজে নিজেই শিখতে পারত ।

এআই উইন্টার এবং বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার উত্থান-পতন

ষাটের দশকের শেষের দিকে এআই গবেষকদের অতি-উৎসাহ বাস্তবতার মুখে হোঁচট খায়। তৎকালীন কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা এবং মেমোরি ছিল অত্যন্ত সীমিত। মারভিন মিনস্কি এবং সেমুর পেপার্ট ১৯৬৯ সালে ‘পারসেপট্রন’ (Perceptron) নামক নিউরাল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা দেখান, যা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক গবেষণাকে দীর্ঘকাল স্থবির করে দেয় । বাস্তব জগতের সাধারণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের বিশালতা বা ‘কম্বিনেটোরিয়াল এক্সপ্লোশন’ মোকাবিলা করতে সিম্বলিক এআই ব্যর্থ হয়।

এই ব্যর্থতার ফলে শুরু হয় প্রথম ‘এআই উইন্টার’ (১৯৭৪-১৯৮০)। এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। তবে আশির দশকে ‘এক্সপার্ট সিস্টেম’ (Expert Systems) বা বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার মাধ্যমে এআই গবেষণায় নতুন জোয়ার আসে। এক্সপার্ট সিস্টেমগুলো ছিল নির্দিষ্ট ডোমেইনে (যেমন ওষুধ নির্বাচন বা রাসায়নিক বিশ্লেষণ) বিশেষজ্ঞের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নিয়ম-নির্ভর (rule-based) প্রোগ্রাম। ১৯৮০ সালে ‘XCON’ নামক এক্সপার্ট সিস্টেম বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং ডেক (DEC) কোম্পানির জন্য বার্ষিক ৪০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে । জাপানি সরকার তাদের ‘ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার’ প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই এক্সপার্ট সিস্টেমগুলোও তাদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। এগুলো ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সামান্য পরিবর্তনের মুখে ভেঙে পড়ত। ফলে ১৯৯০-এর দশকে দ্বিতীয় ‘এআই উইন্টার’ শুরু হয় ।

[পরবর্তী অংশ ২য় পর্বে]

 

শেয়ার করুন

এআই যুগের চ্যালেঞ্জ: অতীত ও ভবিষ্যত [১ম পর্ব]

আপডেট সময় : ১১:৫২:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা এআই। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এখন তথ্য থেকে স্বাস্থ্যখাতেবিরাট অগ্রগতি এসেছে। অনেক কিছুই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সভ্যতা এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করছে পরবর্তী যুগের ভয়ংকর মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য। সবমিলিয়ে  প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতা কি ভবিষ্যত দুনিয়াকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলবে? ধারাবাহিক পর্বে সেইসব দিকগুলোই খতিয়ে দেখা হয়েছে অগ্নিপ্রহরের এই বিশেষ প্রতিবেদনে। লিখেছেন আইটি প্রতিবেদক দীপ্ত মন্ডল ও রইছ উদ্দিন।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিজ্ঞানের কোনো শাখা যদি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে থাকে, তবে তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। মানুষের চিন্তাশক্তিকে যান্ত্রিকভাবে পুনরুৎপাদন করার এই উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব, সমাজ এবং ভবিষ্যতের ভিত্তিগুলোকে আমূল পুনর্গঠনের এক মহাপরিকল্পনা। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের কল্পিত ‘অটোমাটন’ থেকে শুরু করে আজকের অতি-বুদ্ধিমান লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথপরিক্রমা, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এআই একাধারে অপার সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং একই সাথে মানবজাতির জন্য এক অনিশ্চিত ও সমূহ বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে ।

প্রারম্ভিক ভিত্তি ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট: যান্ত্রিক চিন্তার উন্মেষ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণাটি আধুনিক মনে হলেও এর তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি সহস্রাব্দ প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দেই গ্রিক, চীনা এবং ভারতীয় দার্শনিকরা যুক্তিবিদ্যার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিকদের চিন্তাধারা এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, মানুষের চিন্তন পদ্ধতি এক ধরনের গাণিতিক ও যৌক্তিক কাঠামোর অনুসারী। এই ‘মেকানাইজেশন অফ থট’ বা চিন্তার যান্ত্রিকীকরণই আজকের এআই-এর মূল ভিত্তি ।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে গটফ্রাইড লাইবনিজ এবং রেনে দেকার্তের মতো বিজ্ঞানীরা মানুষের চিন্তাকে একটি সার্বজনীন গাণিতিক ভাষায় রূপান্তর করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে উনিশ শতকে চার্লস ব্যাবেজ এবং অ্যাডা লাভলেসের কাজ এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮৩৭ সালে ব্যাবেজের নকশা করা ‘অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’ ছিল আধুনিক কম্পিউটারের প্রথম তাত্ত্বিক রূপ। অ্যাডা লাভলেস প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই যন্ত্র কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং সংগীত বা গ্রাফিক্সের মতো প্রতীকী তথ্যও প্রক্রিয়া করতে সক্ষম ।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই দার্শনিক ভাবনাগুলো গাণিতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ডেভিড হিলবার্টের আনুষ্ঠানিক যুক্তিবিদ্যার আহ্বান এবং তার প্রতিক্রিয়ায় কুর্ট গোডেলের ‘ইনকমপ্লিটনেস থিওরেম’ এবং অ্যালান টুরিংয়ের ‘টুরিং মেশিন’ ধারণাটি প্রমাণের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়। তবে চার্চ-টুরিং থিসিস নির্দেশ করে যে, যেকোনো যৌক্তিক বা গাণিতিক সমস্যা যদি সুসংজ্ঞায়িত হয়, তবে একটি যান্ত্রিক ডিভাইস (যেমন টুরিং মেশিন) তা সমাধান করতে সক্ষম । ১৯৪০-এর দশকের স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি এবং ক্লদ শ্যাননের ইনফরমেশন থিওরি দেখায় যে, মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো ইলেকট্রিক পালসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে, যা ডিজিটাল লজিকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ।

৯৫৬ ডার্টমাউথ সম্মেলন: একটি আধুনিক শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক জন্ম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ডার্টমাউথ সম্মেলনে। ডার্টমাউথ কলেজের তরুণ গণিতবিদ জন ম্যাকার্থি এই সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং তিনিই প্রথম ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি চয়ন করেন । সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মারভিন মিনস্কি, ক্লদ শ্যানন, নাথানিয়েল রোচেস্টার এবং অ্যালেন নেওয়েল ও হার্বার্ট সাইমনের মতো প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা।

এই সম্মেলনের মূল প্রস্তাবনা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী: “শিখনের প্রতিটি দিক বা বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে এত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যে, একটি যন্ত্র তা অনুকরণ করতে সক্ষম হবে” 。 এই সম্মেলনে নেওয়েল এবং সাইমন তাদের ‘লজিক থিওরিস্ট’ নামক প্রোগ্রামটি প্রদর্শন করেন, যা গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করতে সক্ষম ছিল। ডার্টমাউথ সম্মেলনকে এআই-এর সূতিকাগার বলা হয় কারণ এখান থেকেই প্রথমবার গবেষকরা একত্রিত হয়ে যন্ত্রের চিন্তাশক্তি তৈরির একটি সুসংগঠিত রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন 。

সম্মেলন পরবর্তী দুই দশকে (১৯৫৬-১৯৭০) এআই গবেষণায় এক স্বর্ণযুগ বা ‘গোল্ডেন এজ’ পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন যে, মানুষের সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ (AGI) অর্জন করা কেবল কয়েক দশকের ব্যাপার। ১৯৫৮ সালে জন ম্যাকার্থি ‘লিস্প’ (LISP) প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করেন, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এআই গবেষণার প্রধান হাতিয়ার ছিল । ১৯৫৯ সালে আর্থার স্যামুয়েল ‘মেশিন লার্নিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং একটি স্বয়ংক্রিয় চেকার্স খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করেন যা নিজে নিজেই শিখতে পারত ।

এআই উইন্টার এবং বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার উত্থান-পতন

ষাটের দশকের শেষের দিকে এআই গবেষকদের অতি-উৎসাহ বাস্তবতার মুখে হোঁচট খায়। তৎকালীন কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা এবং মেমোরি ছিল অত্যন্ত সীমিত। মারভিন মিনস্কি এবং সেমুর পেপার্ট ১৯৬৯ সালে ‘পারসেপট্রন’ (Perceptron) নামক নিউরাল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা দেখান, যা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক গবেষণাকে দীর্ঘকাল স্থবির করে দেয় । বাস্তব জগতের সাধারণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের বিশালতা বা ‘কম্বিনেটোরিয়াল এক্সপ্লোশন’ মোকাবিলা করতে সিম্বলিক এআই ব্যর্থ হয়।

এই ব্যর্থতার ফলে শুরু হয় প্রথম ‘এআই উইন্টার’ (১৯৭৪-১৯৮০)। এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। তবে আশির দশকে ‘এক্সপার্ট সিস্টেম’ (Expert Systems) বা বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার মাধ্যমে এআই গবেষণায় নতুন জোয়ার আসে। এক্সপার্ট সিস্টেমগুলো ছিল নির্দিষ্ট ডোমেইনে (যেমন ওষুধ নির্বাচন বা রাসায়নিক বিশ্লেষণ) বিশেষজ্ঞের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নিয়ম-নির্ভর (rule-based) প্রোগ্রাম। ১৯৮০ সালে ‘XCON’ নামক এক্সপার্ট সিস্টেম বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং ডেক (DEC) কোম্পানির জন্য বার্ষিক ৪০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে । জাপানি সরকার তাদের ‘ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার’ প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই এক্সপার্ট সিস্টেমগুলোও তাদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। এগুলো ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সামান্য পরিবর্তনের মুখে ভেঙে পড়ত। ফলে ১৯৯০-এর দশকে দ্বিতীয় ‘এআই উইন্টার’ শুরু হয় ।

[পরবর্তী অংশ ২য় পর্বে]