প্রশ্নফাঁসে উত্তাল দিল্লি: মোদী সরকারের সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
- আপডেট সময় : ০৮:১১:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
- / 34
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উচ্চশিক্ষায় লাগামহীন দুর্নীতির জেরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন পূর্ণাঙ্গ গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার গঠিত সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র টানা বিক্ষোভের মুখে ব্যাকফুটে এসে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তবে সরকারের এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ।
বুধবার (২২ জুলাই) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিজিৎ দীপ সাফ জানিয়ে দেন, “সরকারকে তাদের দাম্ভিকতা ছাড়তে হবে। তারা যদি সত সত্যি আলোচনা চায়, তবে তাদেরই দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের কাছে আসতে হবে।” সরকারের দেওয়া শর্ত মানার বদলে আন্দোলনকারীদের নিজস্ব দাবিসমূহ মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিজিৎ অভিযোগ করে বলেন, “গত সোমবার (২০ জুলাই) আলোচনার কথা বলে আমাদের প্রতিনিধিদের ডেকে নিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং গৃহবন্দি করা হয়। ঠিক তখনই রাজপথে পার্লামেন্ট অভিমুখী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম লাঠিচার্জ চালানো হয়।” কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সাথে আলোচনার নামে এই প্রতারণার পর সরকারের ওপর আর আস্থা রাখা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
তবে সিজেপির মুখপাত্র আষুতোশ রাঙ্কা কিছুটা নমনীয় সুর মিলিয়ে জানান, যন্তর মন্তর কিংবা যেকোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আলোচনা হতে পারে, তবে তাদের মূল দাবি—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ থেকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বাংলাদেশের ২০২৪-এর ‘জুলাই বিপ্লবে’র ছায়াসঙ্গী
ভারতের এই অভূতপূর্ব যুব আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের কথা। দুই বছর আগে ঠিক এই সময়েই কোটা সংস্কার ও মেধার মূল্যায়নের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশের আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যের জবাবে শিক্ষার্থীরা যেমন আত্মসম্মানের লড়াই শুরু করেছিলেন, ভারতেও ঘটে ঠিক একই ঘটনা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের উদ্দেশ্য করে ‘তেলাপোকা’ (Cockroaches) বা সমাজের পরজীবী বলে মন্তব্য করলে ক্ষোভের দাবানল জ্বলে ওঠে। সেই অপমানকে নিজেদের শক্তির প্রতীকে রূপ দিয়ে তৈরি হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
বাংলাদেশের ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে দিল্লির রাজপথেও:
- পুলিশের পোশাক ও সাদা পোশাকের ক্যাডার: মুখ ঢাকা নেমপ্লেটহীন পুলিশ এবং তাদের প্রশ্রয়ে সাদা পোশাকের অস্ত্রধারী যুবকদের তাণ্ডব।
- গণমাধ্যম বর্জন: চাটুকার ও সরকারপন্থি সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদি মিডিয়া গো ব্যাক’ স্লোগানে বর্জন এবং ক্যামেরা নামাতে বাধ্য করা।
- একদফা দাবি: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি থেকে আন্দোলন এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের (‘দফা এক দাবি এক, মোদীর পদত্যাগ’) একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছে।
- সাংস্কৃতিক সংহতি: শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজসহ বলিউডের প্রথম সারির তারকা ও তরুণ শিল্পীদের রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের সমর্থন প্রদান।
অচল রাজধানী: বন্ধ ১৬টি মেট্রো স্টেশন
সিজেপি-র ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির জেরে রাজধানী দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) রাজীব চৌক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, জনপথ, মান্ডি হাউসসহ ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
এর ফলে সাধারণ যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিকল্প পরিবহন হিসেবে বাস, ক্যাব ও অটোর জন্য রাস্তায় কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। তীব্র টিয়ারগ্যাস ও গরমের মধ্যেও দিল্লির সাধারণ নাগরিক, রিকশাচালক ও ব্যবসায়ীরা শিক্ষার্থীদের খাবো ও পানি সরবরাহ করে পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তাপ
দিল্লির এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছে পশ্চিমবঙ্গেও। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের শহীদ দিবস পালনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চড়াও সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে শহীদ বেদীর মঞ্চ ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জীকে নিয়ে সারা রাত মঞ্চ পাহারা দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। অন্যদিকে, তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৃথক কর্মসূচিতে পুরো কলকাতা জুড়েই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিভাজন কিংবা দমনপীড়ন চালিয়ে ভারতের বর্তমান এই যুবসংগ্রাম স্তব্ধ করা আর সম্ভব নয়। প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন নরেন্দ্র মোদী সরকারের ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।




















