Bangladesh ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ>>
Logo জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি ওয়াহিদুজ্জামান Logo ফরিদপুর হলিডে মার্কেটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ইস্যুতে তোলপাড় Logo ফরিদপুরে যাত্রীবাহী বাস থেকে চাঁদা উঠানোর সময় আটক ৪ Logo লোভের গ্রাসে ধ্বংস হলো ফরিদপুর ‘টাউন থিয়েটার’ Logo ৩ বছরের শিশুর পেটে চাবির ছড়া : এন্ডোস্কোপির পর পেলো রক্ষা Logo বৃষ্টিভেজা দুপুরে ফমেক হাসপাতালে তিক্ত সাংবাদিকতা Logo মোংলা ও তিস্তায় চীনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’: কী ভাবছে দিল্লি? Logo মেক্সিকোর রোমাঞ্চকর প্রতিরোধ ভেঙে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড Logo ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে Logo বাস-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই যুবক নিহত
আমার নাম জালাল!

বৃষ্টিভেজা দুপুরে ফমেক হাসপাতালে তিক্ত সাংবাদিকতা

হারুন আনসারী
  • আপডেট সময় : ০১:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • / 641

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের সার্জারী বিভাগের ডক্টরস রুম পাঁচতলায়। অল্পবয়সী এক সুন্দরী ইন্টার্নী জুনিয়রকে নিজের সামনে বসিয়ে রেখে, পরিচিত-অপরিচিত অনেকের সামনেই তাচ্ছিল্য করে ছবক দেয়ার ছলে একধরনের বিকৃত আত্মতুষ্টিতে মগ্ন লোকটির নাম জালাল।

গতকাল দুপুরে সাংবাদিক পরিচয়ে হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগীর ব্যাপারে তথ্য জানতে চাইলে, কোনকিছুই বলতে রাজি না হওয়া লোকটির নাম জালাল। জানতে চাইলে তিনি উত্তরে নিজের নাম বললেন এভাবেই!

আসলে সময় স্বল্পতা স্বত্তেও শুধুমাত্র তার মনোযোগ পেতে আমরা চারজন ওই ডক্টরস রুমের দরজার কাছে, তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রায় মিনিট দশেক।

আমরা অনুমতি নিয়ে ঢুকলাম, তিনি ভ্রুক্ষেপই করলেন না। দুবার সালাম দিলাম, কোনো উত্তর দিলেন না। কি নিয়ে যেনো একই কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে মেয়েটিকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে যেতে থাকলেন। সম্ভবত অসুস্থতার কারণে ওই ইন্টার্ন সুন্দরী কোথাও কোনো কাজে বা ক্লাসে হাজির হতে পারেনি, এনিয়ে তাকে কৈফিয়ত তলবের কসরত। মেয়েটি প্রথমে একটু বিনীত ও সৌজন্যের সাথে তার সমস্যা জানাতে থাকলেও, জালালের যেনো মন ভরছিলো না তাতে। বৃষ্টির সাথে বুঝি হরমোনজনিত কিছু একটা সংযোগ রয়েছে, কারো কারো বাও ব্যারাম উঠে যায়! জালাল সেই ব্যারামেই কিনা জানি না, সে অনবরত একই কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে মেয়েটিকে পরিচিত-অপরিচিত সবার সামনে লজ্জিত করে তুললো।

মেয়েটি বললো, “স্যার, আমি সাধারণত নিজের অসুস্থতার কথা অন্যকে জানাতে চাই না। আমি আসলে সেদিন অসুস্থ ছিলাম।” এই কথাগুলোই সে অনেকক্ষণ ধরে বোঝাতে লাগলো। তবে জালাল যেনো মেয়েটির এই অসহায়ত্বের উদামতা উপভোগের নেশায় তাকে ক্ষ্যান্ত দিচ্ছিল না।

একবার দুই ঠোঁটের কোণে ‘চিক’ করে একটা শব্দ করে সে বাম চোখের ভ্রু নাচিয়ে কি যেনো ইশারা করলো; মনে হলো কাউকে কিছু বললো। আমি ভাবলাম, এতোক্ষণে বোধহয় ষাঁড় আমাদের নজরে এনেছেন। আমি আবারও তার দিকে হাত তুলে শব্দ করে সালাম দিলাম, তবে কোন রিঅ্যাক্ট পেলাম না। আমরা চারটি লোক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম তার সামনে—মাত্র একমিনিট কথা বলবো বলে। অনেকক্ষণ পরে মেয়েটিরও যেনো ধৈর্যচ্যুতি হলো; সে নিজেই তার এক্সকিউজের ডালা গুটিয়ে বিদায় নিতে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার ছেড়ে। তারপরেও তাকে আরো কয়েকমিনিট ভর্ৎসনাজড়িত ছবকের জালে যেনো নিজের তুষ্টি মেটালেন জালাল। এরপর মেয়েটি চলে গেলো। অবাক হলাম, মেয়েটি চলে যাওয়ার পরে জালাল চেয়ারে বসে পা নাচাতে নাচাতে ভাবের জগতে ডুবে রইলো; আমাদের যেনো দেখছিলোই না।

আমি আবার সালাম দিয়ে নিজেদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানালাম। জালাল আমাদের সাথে কোনো ধরনের সৌজন্যতা দেখালো না, বসতেও বললো না। রোগীর বিষয়ে তথ্য জানতে হলে হাসপাতালের পরিচালকের অনুমতি লাগবে বলে আমাদের পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো। এরমধ্যে সজল ফোনে পরিচালককে ধরিয়ে মোবাইলটা তার হাতে দিলো।

জালাল পরিচালককে বললো, “স্যার, এই সাংবাদিকেরা রুমে ঢুকে ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার নিতেছে।” এরপর দু’একটি কথা শেষে আমাদের বললো, “পরিচালক স্যার স্পষ্ট নিষেধ করে দিয়েছেন সাক্ষাৎকার দিতে।”

তার সৌজন্যতার অপেক্ষা না করে আমি একটি চেয়ার টেনে বসলাম, সজলকেও হাত টেনে বসানোর চেষ্টা করলাম। আমি জালালকে বললাম, “আমরা তো আপনার সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করিনি। আপনি কেন মিথ্যা কথা বললেন?”

সজল তাকে বিনয়ের সাথে বোঝাতে লাগলেন, “এমন কোনো ক্ষতিকর কিছু আপনাকে বলতে হবে না। আপনি শুধু রোগীটি কেন ভর্তি আর তার কন্ডিশন কি—তাই বলবেন।”

জালাল বললো, “আমরা এসব সাক্ষাৎকার-টাক্ষাৎকার দিই না। পুলিশ কেস, রোগী ভর্তি হয়েছে। যথাযথ অথরিটির মাধ্যমে আপিল করলে আমরা সার্টিফিকেট লিখে দিবো।”

নিজেকে খুবই সংবরণ করে এই সার্টিফিকেট-খোরকে আমি বিনয়ের সাথে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে, ক্যামেরার সামনে বলতে হবে না; আপনি আমাদের অব দ্য রেকর্ড, আন-অফিসিয়ালি জানান—রোগীর কন্ডিশন কি? সে কি সত্যি সত্যিই অ্যাসাল্ট? কি ট্রিটমেন্ট দিচ্ছেন?”

জালাল তার অবস্থায় অনড় থেকে আমাদের কোনোপ্রকার সহযোগিতা করলো না, কোনো সৌজন্যতাও দেখালো না; যেনো আমরা সেখানে কোনো পেশাগত কাজে যাইনি। কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এরপর নিচে নেমে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এনামুল হককে ফোনে জানালাম একথা। বললাম, আমাদের যাতে পেশাগত কাজে সহায়তা করা হয়, এব্যাপারে তাদের একটু ব্রিফ করবেন। সেই নব্বইয়ের দশকে এই হাসপাতাল চালুর পরে সেখানে জরুরি বিভাগের দু-তিনটি নম্বর ছিলো। তখন মোবাইল ছিলো না, যাতায়াতও সময়সাপেক্ষ। আমরা সেই অ্যানালগ ফোনে বারবার ডায়াল ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে যদিও অপর প্রান্তে কাউকে পেতাম, সাংবাদিক পরিচয় জেনেও কোনো তথ্য দিতো না; নানা কথায় এড়িয়ে যেতো। কথা শেষ না করেই ফোন রেখে দিতো, দুর্ব্যবহার করতো। অনেক সাংবাদিক এই দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন, তবে তাদের কখনোই কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা যায়নি।

আমরা জানতাম, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খবর সংগ্রহে কোনো সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখলে এই হাসপাতালের একশ্রেণির ডাক্তারের যেনো মাথার চান্দি গরম হয়ে যায়; ছোটলোকের মতো চিল্লাচিল্লি শুরু করে মস্তানের মতো উদ্ধত আচরণ করেন। অনেকবার, বারবার এমন হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে বলি, কিন্তু তাদের আচরণের পরিবর্তন হয় না।

গতকাল বৃষ্টির মাঝে কাজের চাপে দুপুরের খাবারও সময় পাইনি। বৃষ্টিতে বাসায় ফিরতে না পেরে দু’দিন গোসলও করিনি। সেই বৃষ্টিতেই প্রেসক্লাব থেকে একটি ইজিবাইক নিয়ে আমি, সময় টিভির সজল দা, আনন্দ টিভির মনির ভাই ও সঞ্জয় হেচলার পানি কাঁচাতে কাঁচাতেই পৌঁছলাম ফরিদপুর মেডিক্যাল হাসপাতালে—চরভদ্রাসনের ফাস্টফুড দোকানি রব মোল্লার খবর সংগ্রহের জন্য। খবরের গুরুত্বের কারণেই মোটরসাইকেল ক্লাবে রেখে ইজিবাইকে চড়ে আমাদের এই বৈরী আবহাওয়ার মাঝেই ছুটে আসা।

আমি জানি না এই জালালের বংশপরিচয়। একজনের নাম তো শুধু জালাল হতে পারে না; হয়তো জালাল প্রামাণিক বা জালাল গোবাজ কিংবা আগে-পিছে অবশ্যই কিছু আছে। হয়তো বাড়িতে তাকে কিভাবে নাম বলতে হয়, শেখানোর মতো কেউ ছিলেন না। কিন্তু একজন ডাক্তারী সনদধারী শিক্ষাজীবনের এতো বছরে পারিবারিক শিক্ষা বঞ্চিত হলেও যেনো সাধারণ সৌজন্যমূলক এসব আচার-ব্যবহার শেখার একটু সুযোগ পায়—সে ব্যবস্থা করার জন্য আমি সদাশয় নীতি-নির্ধারক মহলের প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ, দীর্ঘদিনের কাজ ও অভিজ্ঞতার সুবাদে আমি এই হাসপাতালের জালালদের চরিত্র সম্বন্ধে জানি বলে হয়তো এনিয়ে আর তর্কে যাই না। কিন্তু ইদানীংয়ের পোলাপান কিংবা স্থানীয় কোনো লোক বহিরাগত এসব পারিবারিক শিক্ষাবঞ্চিত দুপেয়েদের কথাবার্তায় নিজেকে সংবরণ করতে নাও পারেন। সতর্কতার জন্যই তাদের সু-আচরণে অভ্যস্ত করা দরকার।

পুনশ্চ: ২০২৩ সালের ১০ আগস্টের অভিজ্ঞতা থেকে লেখাটি তৈরি করে পরেরদিন ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। ফরিদপুরের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে লেখাটি এখনো প্রাসঙ্গিক হ‌ওয়ায় অগ্নিপ্রহর পাঠকের জন্য আবারো প্রকাশ করা হলো।

 

শেয়ার করুন

আমার নাম জালাল!

বৃষ্টিভেজা দুপুরে ফমেক হাসপাতালে তিক্ত সাংবাদিকতা

আপডেট সময় : ০১:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের সার্জারী বিভাগের ডক্টরস রুম পাঁচতলায়। অল্পবয়সী এক সুন্দরী ইন্টার্নী জুনিয়রকে নিজের সামনে বসিয়ে রেখে, পরিচিত-অপরিচিত অনেকের সামনেই তাচ্ছিল্য করে ছবক দেয়ার ছলে একধরনের বিকৃত আত্মতুষ্টিতে মগ্ন লোকটির নাম জালাল।

গতকাল দুপুরে সাংবাদিক পরিচয়ে হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগীর ব্যাপারে তথ্য জানতে চাইলে, কোনকিছুই বলতে রাজি না হওয়া লোকটির নাম জালাল। জানতে চাইলে তিনি উত্তরে নিজের নাম বললেন এভাবেই!

আসলে সময় স্বল্পতা স্বত্তেও শুধুমাত্র তার মনোযোগ পেতে আমরা চারজন ওই ডক্টরস রুমের দরজার কাছে, তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রায় মিনিট দশেক।

আমরা অনুমতি নিয়ে ঢুকলাম, তিনি ভ্রুক্ষেপই করলেন না। দুবার সালাম দিলাম, কোনো উত্তর দিলেন না। কি নিয়ে যেনো একই কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে মেয়েটিকে চাপে ফেলার চেষ্টা করে যেতে থাকলেন। সম্ভবত অসুস্থতার কারণে ওই ইন্টার্ন সুন্দরী কোথাও কোনো কাজে বা ক্লাসে হাজির হতে পারেনি, এনিয়ে তাকে কৈফিয়ত তলবের কসরত। মেয়েটি প্রথমে একটু বিনীত ও সৌজন্যের সাথে তার সমস্যা জানাতে থাকলেও, জালালের যেনো মন ভরছিলো না তাতে। বৃষ্টির সাথে বুঝি হরমোনজনিত কিছু একটা সংযোগ রয়েছে, কারো কারো বাও ব্যারাম উঠে যায়! জালাল সেই ব্যারামেই কিনা জানি না, সে অনবরত একই কথা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে মেয়েটিকে পরিচিত-অপরিচিত সবার সামনে লজ্জিত করে তুললো।

মেয়েটি বললো, “স্যার, আমি সাধারণত নিজের অসুস্থতার কথা অন্যকে জানাতে চাই না। আমি আসলে সেদিন অসুস্থ ছিলাম।” এই কথাগুলোই সে অনেকক্ষণ ধরে বোঝাতে লাগলো। তবে জালাল যেনো মেয়েটির এই অসহায়ত্বের উদামতা উপভোগের নেশায় তাকে ক্ষ্যান্ত দিচ্ছিল না।

একবার দুই ঠোঁটের কোণে ‘চিক’ করে একটা শব্দ করে সে বাম চোখের ভ্রু নাচিয়ে কি যেনো ইশারা করলো; মনে হলো কাউকে কিছু বললো। আমি ভাবলাম, এতোক্ষণে বোধহয় ষাঁড় আমাদের নজরে এনেছেন। আমি আবারও তার দিকে হাত তুলে শব্দ করে সালাম দিলাম, তবে কোন রিঅ্যাক্ট পেলাম না। আমরা চারটি লোক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম তার সামনে—মাত্র একমিনিট কথা বলবো বলে। অনেকক্ষণ পরে মেয়েটিরও যেনো ধৈর্যচ্যুতি হলো; সে নিজেই তার এক্সকিউজের ডালা গুটিয়ে বিদায় নিতে উঠে দাঁড়ালো চেয়ার ছেড়ে। তারপরেও তাকে আরো কয়েকমিনিট ভর্ৎসনাজড়িত ছবকের জালে যেনো নিজের তুষ্টি মেটালেন জালাল। এরপর মেয়েটি চলে গেলো। অবাক হলাম, মেয়েটি চলে যাওয়ার পরে জালাল চেয়ারে বসে পা নাচাতে নাচাতে ভাবের জগতে ডুবে রইলো; আমাদের যেনো দেখছিলোই না।

আমি আবার সালাম দিয়ে নিজেদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য জানালাম। জালাল আমাদের সাথে কোনো ধরনের সৌজন্যতা দেখালো না, বসতেও বললো না। রোগীর বিষয়ে তথ্য জানতে হলে হাসপাতালের পরিচালকের অনুমতি লাগবে বলে আমাদের পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলো। এরমধ্যে সজল ফোনে পরিচালককে ধরিয়ে মোবাইলটা তার হাতে দিলো।

জালাল পরিচালককে বললো, “স্যার, এই সাংবাদিকেরা রুমে ঢুকে ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার নিতেছে।” এরপর দু’একটি কথা শেষে আমাদের বললো, “পরিচালক স্যার স্পষ্ট নিষেধ করে দিয়েছেন সাক্ষাৎকার দিতে।”

তার সৌজন্যতার অপেক্ষা না করে আমি একটি চেয়ার টেনে বসলাম, সজলকেও হাত টেনে বসানোর চেষ্টা করলাম। আমি জালালকে বললাম, “আমরা তো আপনার সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করিনি। আপনি কেন মিথ্যা কথা বললেন?”

সজল তাকে বিনয়ের সাথে বোঝাতে লাগলেন, “এমন কোনো ক্ষতিকর কিছু আপনাকে বলতে হবে না। আপনি শুধু রোগীটি কেন ভর্তি আর তার কন্ডিশন কি—তাই বলবেন।”

জালাল বললো, “আমরা এসব সাক্ষাৎকার-টাক্ষাৎকার দিই না। পুলিশ কেস, রোগী ভর্তি হয়েছে। যথাযথ অথরিটির মাধ্যমে আপিল করলে আমরা সার্টিফিকেট লিখে দিবো।”

নিজেকে খুবই সংবরণ করে এই সার্টিফিকেট-খোরকে আমি বিনয়ের সাথে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে, ক্যামেরার সামনে বলতে হবে না; আপনি আমাদের অব দ্য রেকর্ড, আন-অফিসিয়ালি জানান—রোগীর কন্ডিশন কি? সে কি সত্যি সত্যিই অ্যাসাল্ট? কি ট্রিটমেন্ট দিচ্ছেন?”

জালাল তার অবস্থায় অনড় থেকে আমাদের কোনোপ্রকার সহযোগিতা করলো না, কোনো সৌজন্যতাও দেখালো না; যেনো আমরা সেখানে কোনো পেশাগত কাজে যাইনি। কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।

এরপর নিচে নেমে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এনামুল হককে ফোনে জানালাম একথা। বললাম, আমাদের যাতে পেশাগত কাজে সহায়তা করা হয়, এব্যাপারে তাদের একটু ব্রিফ করবেন। সেই নব্বইয়ের দশকে এই হাসপাতাল চালুর পরে সেখানে জরুরি বিভাগের দু-তিনটি নম্বর ছিলো। তখন মোবাইল ছিলো না, যাতায়াতও সময়সাপেক্ষ। আমরা সেই অ্যানালগ ফোনে বারবার ডায়াল ঘুরিয়ে অনেক কষ্টে যদিও অপর প্রান্তে কাউকে পেতাম, সাংবাদিক পরিচয় জেনেও কোনো তথ্য দিতো না; নানা কথায় এড়িয়ে যেতো। কথা শেষ না করেই ফোন রেখে দিতো, দুর্ব্যবহার করতো। অনেক সাংবাদিক এই দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন, তবে তাদের কখনোই কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা যায়নি।

আমরা জানতাম, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খবর সংগ্রহে কোনো সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখলে এই হাসপাতালের একশ্রেণির ডাক্তারের যেনো মাথার চান্দি গরম হয়ে যায়; ছোটলোকের মতো চিল্লাচিল্লি শুরু করে মস্তানের মতো উদ্ধত আচরণ করেন। অনেকবার, বারবার এমন হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে বলি, কিন্তু তাদের আচরণের পরিবর্তন হয় না।

গতকাল বৃষ্টির মাঝে কাজের চাপে দুপুরের খাবারও সময় পাইনি। বৃষ্টিতে বাসায় ফিরতে না পেরে দু’দিন গোসলও করিনি। সেই বৃষ্টিতেই প্রেসক্লাব থেকে একটি ইজিবাইক নিয়ে আমি, সময় টিভির সজল দা, আনন্দ টিভির মনির ভাই ও সঞ্জয় হেচলার পানি কাঁচাতে কাঁচাতেই পৌঁছলাম ফরিদপুর মেডিক্যাল হাসপাতালে—চরভদ্রাসনের ফাস্টফুড দোকানি রব মোল্লার খবর সংগ্রহের জন্য। খবরের গুরুত্বের কারণেই মোটরসাইকেল ক্লাবে রেখে ইজিবাইকে চড়ে আমাদের এই বৈরী আবহাওয়ার মাঝেই ছুটে আসা।

আমি জানি না এই জালালের বংশপরিচয়। একজনের নাম তো শুধু জালাল হতে পারে না; হয়তো জালাল প্রামাণিক বা জালাল গোবাজ কিংবা আগে-পিছে অবশ্যই কিছু আছে। হয়তো বাড়িতে তাকে কিভাবে নাম বলতে হয়, শেখানোর মতো কেউ ছিলেন না। কিন্তু একজন ডাক্তারী সনদধারী শিক্ষাজীবনের এতো বছরে পারিবারিক শিক্ষা বঞ্চিত হলেও যেনো সাধারণ সৌজন্যমূলক এসব আচার-ব্যবহার শেখার একটু সুযোগ পায়—সে ব্যবস্থা করার জন্য আমি সদাশয় নীতি-নির্ধারক মহলের প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ, দীর্ঘদিনের কাজ ও অভিজ্ঞতার সুবাদে আমি এই হাসপাতালের জালালদের চরিত্র সম্বন্ধে জানি বলে হয়তো এনিয়ে আর তর্কে যাই না। কিন্তু ইদানীংয়ের পোলাপান কিংবা স্থানীয় কোনো লোক বহিরাগত এসব পারিবারিক শিক্ষাবঞ্চিত দুপেয়েদের কথাবার্তায় নিজেকে সংবরণ করতে নাও পারেন। সতর্কতার জন্যই তাদের সু-আচরণে অভ্যস্ত করা দরকার।

পুনশ্চ: ২০২৩ সালের ১০ আগস্টের অভিজ্ঞতা থেকে লেখাটি তৈরি করে পরেরদিন ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। ফরিদপুরের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে লেখাটি এখনো প্রাসঙ্গিক হ‌ওয়ায় অগ্নিপ্রহর পাঠকের জন্য আবারো প্রকাশ করা হলো।