লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি: আশীর্বাদ না হুমকি?
- আপডেট সময় : ০৯:৪০:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 154
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো মামলাজট। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকা, বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও সময়ের অপচয় এবং আদালতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ—সব মিলিয়ে দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
এই বাস্তবতায় সরকার আইনগত সহায়তা ব্যবস্থাকে শুধু দরিদ্র মানুষের বিনামূল্যে আইনগত সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা (Pre-case Mediation) এবং মামলা দায়েরের পর মধ্যস্থতা (Post-case Mediation)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলছে।
২০২৫ সালের আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এর অধীনে নির্দিষ্ট কিছু বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে সংশ্লিষ্ট লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মধ্যস্থতা ব্যর্থ হলে তবেই আদালতে মামলা করার সুযোগ থাকবে।
কোন কোন মামলা এই ব্যবস্থার আওতায়?
২০২৫ সালের সংশোধিত ব্যবস্থায় মোটামুটি দুই ধরনের বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—দেওয়ানী/পারিবারিক বিরোধ এবং কিছু আপসযোগ্য বা সমঝোতাযোগ্য ফৌজদারি অভিযোগ।
এর মধ্যে রয়েছে—
* পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫-এর বিষয়সমূহ • বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ, সহকারী জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টনসংক্রান্ত বিরোধ, State Acquisition and Tenancy Act-এর নির্দিষ্ট অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ, Non-Agricultural Tenancy Act-এর নির্দিষ্ট অগ্রক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিরোধ, পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট চেক ডিজঅনারের অভিযোগ, যৌতুক নিরোধ আইনের নির্দিষ্ট অভিযোগ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ১১(গ)-এর আওতাভুক্ত যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগ।
অর্থাৎ এটি সব দেওয়ানী মামলা বা সব ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র, মানবপাচারসহ গুরুতর এবং আইনগতভাবে আপসের অযোগ্য অধিকাংশ ফৌজদারি মামলাকে এই বাধ্যতামূলক pre-case mediation-এর সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আইনে “বিচারপ্রার্থী”র সংজ্ঞার মধ্যে দেওয়ানী, পারিবারিক ও ফৌজদারি মামলার সম্ভাব্য বা প্রকৃত বাদী-বিবাদী/ফরিয়াদী-আসামি সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিগ্যাল এইড অফিসারকে আপসযোগ্য বিষয়ে post-case mediation পরিচালনার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে?
আমার মূল্যায়নে এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি তবে শতভাগ নয়।কারণ ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের কিছু পরিসংখ্যান এই ব্যবস্থার সম্ভাবনা দেখিয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০টি জেলায় পরিচালিত pilot প্রকল্পে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়কালে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নতুন মামলা দায়ের গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমেছে। পারিবারিক মামলা কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ, বণ্টনসংক্রান্ত মামলা প্রায় ৬৬.৯৭ শতাংশ এবং যৌতুক সংক্রান্ত মামলা প্রায় ৬৭.৭১ শতাংশ।
এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তবে এখানেই একটি সতর্কতা প্রয়োজন।
মামলা দায়ের কমে যাওয়া মানেই বিরোধ স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া নয়।
কতগুলো বিরোধ সত্যিকার অর্থে টেকসই সমঝোতায় পৌঁছেছে, কতগুলো পক্ষ পরে আবার মামলা করেছে, কতগুলো পক্ষ আপসের চাপে সমঝোতা করেছে এবং কতগুলো বিরোধ আদালতের বাইরে ঝুলে আছে—এসব তথ্যও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তাই বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, প্রাথমিক ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সফলতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
কেন এই ব্যবস্থা সফল হতে পারে?
১. মামলা করার আগেই সমাধানের সুযোগ
বর্তমান বিচারব্যবস্থায় অনেক বিরোধ মামলা হওয়ার পর বছরের পর বছর চলে। অথচ অনেক বিরোধের প্রকৃতি এমন যে পক্ষগুলো বসে আলোচনা করলে সমাধান সম্ভব।
লিগ্যাল এইডের pre-case mediation সেই সুযোগটি মামলা দায়েরের আগেই তৈরি করছে। ২. সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে
একটি মামলা মানে শুধু কোর্ট ফি নয়। আইনজীবীর ফি, যাতায়াত, সাক্ষী, সময়, নথিপত্র এবং বারবার আদালতে উপস্থিত হওয়ার খরচও রয়েছে।
মধ্যস্থতার মাধ্যমে কয়েকটি বৈঠকেই বিরোধ শেষ হলে বিচারপ্রার্থীর আর্থিক ও মানসিক চাপ অনেক কমতে পারে। ৩. মামলাজট কমানোর বাস্তব সম্ভাবনা
বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।
এই বিশাল backlog-এর মধ্যে যদি নতুন মামলা প্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে।
কিন্তু আইনজীবীদের জন্য কি এটি হুমকি?
হ্যাঁ—কিছু ক্ষেত্রে এটি বাস্তব পেশাগত হুমকি। কিন্তু পুরো আইনজীবী পেশার জন্য এটি অস্তিত্বের হুমকি নয়।
বরং আমি এটিকে বলব—
Traditional litigation lawyer-এর জন্য হুমকি, কিন্তু modern dispute-resolution lawyer-এর জন্য নতুন বাজার।
এখানেই মূল বিষয়টি বুঝতে হবে।
কোন আইনজীবীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন?
যেসব আইনজীবীর প্রধান আয়ের উৎস— নতুন দেওয়ানী মামলা দায়ের, পারিবারিক মামলা, বণ্টন মামলা, ছোট অঙ্কের চেক ডিজঅনার মামলা, নির্দিষ্ট যৌতুক মামলা, বাড়িভাড়া সংক্রান্ত মামলা, ছোটখাটো আপসযোগ্য বিরোধ তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
কারণ এসব বিষয়ে মামলা দায়েরের আগেই লিগ্যাল এইড অফিসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
ফলে একজন ক্লায়েন্ট আগে যে কাজের জন্য সরাসরি আইনজীবীর কাছে এসে মামলা করতেন, এখন সেই ক্লায়েন্টের প্রথম ধাপ হতে পারে লিগ্যাল এইড অফিস।
এতে নতুন মামলা থেকে পাওয়া drafting fee, filing fee এবং initial litigation fee-এর একটি অংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এখানেই পুরো গল্প শেষ নয়
কারণ নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—আইনজীবীকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি।
বরং আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায় আইনজীবীদের ভূমিকা নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের সংশোধনে আইনজীবীদের জন্য সম্মানী/ফি প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনজীবীদের মধ্য থেকে Special Mediator তালিকা তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে আইনজীবীর কাজ শুধু—
“মামলা করা → শুনানি করা → রায় নেওয়া”
এই মডেলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে—
“বিরোধ শনাক্ত করা → negotiation → mediation → settlement → agreement drafting → enforcement”
ভবিষ্যতের বড় সুযোগ: Mediator Lawyer
আমার দৃষ্টিতে আইনজীবীদের জন্য এই সংস্কারের সবচেয়ে বড় সুযোগ এখানেই।
যে আইনজীবী mediation, negotiation, settlement drafting এবং dispute resolution-এ দক্ষ হবেন, তিনি ভবিষ্যতে নতুন ধরনের পেশাগত বাজার তৈরি করতে পারবেন।
বিশেষ করে—
* Family dispute mediation, Property dispute mediation, Partition settlement, Cheque dispute settlement, Rent dispute, Maintenance dispute, Commercial dispute, Negotiation, Settlement agreement drafting
এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনকারী আইনজীবীর চাহিদা বাড়তে পারে।
আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায় Special Mediator হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ এবং mediation বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিধান ইতোমধ্যে রাখা হয়েছে।
এটি ভবিষ্যতের পেশাগত পরিবর্তনের একটি পরিষ্কার ইঙ্গিত।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে “Litigation Economy”-তে
বর্তমান আদালতকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে একটি মামলা যত দীর্ঘ হয়, তত বেশি hearing, হাজিরা, petition, application, evidence, argument এবং বিভিন্ন procedural কাজ তৈরি হয়।
মধ্যস্থতার সফলতা বাড়লে সেই litigation activity-এর একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই কমবে।
অর্থাৎ— মামলার সংখ্যা কমবে → hearing কমবে → adjournment কমবে → procedural work কমবে।
এতে কিছু আইনজীবীর আয় কমতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে— মধ্যস্থতা বাড়বে → negotiation বাড়বে → settlement drafting বাড়বে → legal consultancy বাড়বে → dispute prevention-এর কাজ বাড়বে।
অর্থাৎ পেশাটি বিলুপ্ত হবে না; পেশার চরিত্র পরিবর্তিত হবে।
ফৌজদারি আইনজীবীদের জন্য প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগকে দেখে যদি মনে করা হয় যে ভবিষ্যতে “ফৌজদারি মামলা কমে গিয়ে criminal lawyer-এর পেশা সংকটে পড়বে”—তাহলে সেটি অতিরঞ্জিত ধারণা।
কারণ বাধ্যতামূলক pre-case mediation-এর আওতায় থাকা ফৌজদারি বিষয়গুলো মূলত নির্দিষ্ট এবং তুলনামূলকভাবে সমঝোতাযোগ্য/আপসকেন্দ্রিক অভিযোগ।
অন্যদিকে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার, গুরুতর মারধর, সাইবার অপরাধের বহু ধরনের মামলা, দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং ইত্যাদি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের criminal justice system-এর প্রয়োজন থেকেই যাবে।
বরং criminal lawyer-এর ভবিষ্যৎ কাজ আরও specialised হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে—
bail → remand → discharge → charge → evidence → cross-examination → trial strategy → appeal → revision → High Court litigation
এসব ক্ষেত্রে দক্ষতার গুরুত্ব কমবে না।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?
১. “Lawyer bypass” সংস্কৃতি
যদি জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়—
“আইনজীবীর কাছে যাওয়ার দরকার নেই, লিগ্যাল এইড অফিসেই সব হয়ে যাবে।”
তাহলে এটি আইনজীবী পেশার জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
কারণ একজন প্রশিক্ষিত আইনজীবী শুধু মামলা করেন না; তিনি আইনি অধিকার, সম্ভাব্য ফলাফল, evidence এবং ভবিষ্যৎ litigation risk বিশ্লেষণ করেন।
মধ্যস্থতার আগে পক্ষের অধিকার সম্পর্কে স্বাধীন ও পর্যাপ্ত legal advice না থাকলে “সমঝোতা” কখনও কখনও প্রকৃত ন্যায়বিচারের বিকল্প হয়ে যেতে পারে ২. দুর্বল পক্ষের ওপর আপসের চাপ
বিশেষ করে পারিবারিক ও যৌতুকসংক্রান্ত বিরোধে ক্ষমতার ভারসাম্য সমান নয়।
একজন আর্থিকভাবে দুর্বল নারী বা ব্যক্তি যদি সামাজিক, পারিবারিক বা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আপস করতে বাধ্য হন, তাহলে সেই settlement দেখতে সফল হলেও প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার নাও হতে পারে।
তাই mediation-এর সাফল্য শুধু “কতটি মামলা মিটেছে” দিয়ে মাপা উচিত নয়।
মাপতে হবে— “কতটি বিরোধ ন্যায়সংগত, স্বেচ্ছাসম্মত ও টেকসইভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।” ৩. Legal Aid Office-এর সক্ষমতা
এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রশ্ন।
যদি একজন Legal Aid Officer-এর ওপর বিপুল সংখ্যক বিরোধের দায়িত্ব দেওয়া হয়,
পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত mediator না থাকে,
পর্যাপ্ত staff না থাকে এবং case management system দুর্বল থাকে—
তাহলে mediation নিজেই নতুন bottleneck তৈরি করতে পারে।
২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণেও funding, trained staff, public awareness এবং সরকারি সংস্থা,
NGO ও legal practitioners-এর সমন্বয়কে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৪. আইনজীবীদের আয় কাঠামো পরিবর্তন
এটি সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তব পেশাগত ঝুঁকি।
আগে একজন আইনজীবী হয়তো একটি মামলার মাধ্যমে বহু বছরের hearing-based income পেতেন।
ভবিষ্যতে একই বিরোধ হয়তো কয়েকটি mediation session এবং একটি settlement agreement-এর মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে।
ফলে per-case income কমতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে দক্ষ আইনজীবী যদি একসঙ্গে বেশি mediation/consultancy matter পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে volume-based professional income তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ— কম মামলা × বেশি সময় = পুরনো মডেল
এর পরিবর্তে হতে পারে— বেশি consultancy/mediation × কম সময় = নতুন মডেল
আগামী ৫–১০ বছরে কী হতে পারে?
আমার বিশ্লেষণে বাংলাদেশের আইনজীবী পেশায় পাঁচটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত: Litigation কমবে, কিন্তু litigation শেষ হবে না
সব বিরোধ mediation-এ সমাধান হবে না।
মানুষের মধ্যে সম্পত্তি, অর্থ, পারিবারিক সম্পর্ক ও ব্যবসায়িক বিরোধ সবসময় থাকবে।
তাই আদালতের প্রয়োজন কখনও শেষ হবে না।
দ্বিতীয়ত: Mediation একটি স্বতন্ত্র পেশাগত দক্ষতা হয়ে উঠবে
যে আইনজীবী negotiation ও mediation জানেন, তিনি অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকবেন।
তৃতীয়ত: Legal consultancy-এর গুরুত্ব বাড়বে
মামলা হওয়ার আগে client-কে পরামর্শ দেওয়া—“মামলা করব, নাকি settlement করব?”—এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইনজীবীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
চতুর্থত: Specialist lawyer-এর মূল্য বাড়বে
সবকিছু জানা general practitioner-এর চেয়ে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ আইনজীবীর চাহিদা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে—
* Criminal defence, Corporate litigation, Land law, Family law, Cyber law, Financial crime, Human trafficking, Narcotics,Constitutional litigation, High Court practice, Arbitration and mediation
পঞ্চমত: Lawyer-client relationship আরও পরামর্শনির্ভর হবে
আইনজীবী শুধু “মামলা পরিচালনাকারী” থাকবেন না।
তিনি হবেন—
Legal Strategist + Negotiator + Mediator + Risk Adviser।
তাহলে আইনজীবীদের কী করা উচিত?
সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই সংস্কারের বিরুদ্ধে শুধু প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বরং Bar Association, Bar Council এবং individual lawyers-এর উচিত এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা পরিবর্তন করা।
আইনজীবীদের এখন থেকেই—
১. Mediation training নেওয়া ২. Negotiation skill বাড়ানো ৩. Settlement agreement drafting শেখা ৪. Family dispute resolution-এ দক্ষ হওয়া ৫. Commercial dispute resolution শেখা ৬. Legal consultancy-কে পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা ৭. Digital legal service ও online consultation-এর দিকে যাওয়া ৮. High Court ও specialised litigation-এ দক্ষতা বৃদ্ধি করা ৯. নিজের নির্দিষ্ট practice area তৈরি করা ১০. Client-এর কাছে “মামলা করাই সমাধান”—এই ধারণার পরিবর্তে “সঠিক legal strategy-ই সমাধান”—এই মূল্য তৈরি করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ: আইনজীবীরাই Mediator হতে পারেন
২০২৫ সালের সংশোধিত ব্যবস্থায় Special Mediator হিসেবে অভিজ্ঞ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনজীবীদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে এবং তাদের সম্মানির ব্যবস্থাও রয়েছে।
অতএব, যে পরিবর্তনকে আজ একজন আইনজীবী “হুমকি” হিসেবে দেখছেন, তিনি চাইলে সেটিকেই আগামী দিনের নতুন income stream বানাতে পারেন।
একজন দক্ষ আইনজীবী একই সঙ্গে হতে পারেন—
Advocate + Legal Consultant + Negotiator + Mediator।
এটাই সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল।
উপসংহার:
লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক pre-case mediation বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি বড় structural change।
এটিকে শুধু “বিনা খরচে মামলা মিটিয়ে দেওয়া” হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না।
এটি আসলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে—
Litigation-based Justice System
থেকে Dispute Resolution-based Justice System -এর দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
২০২৬ সালের pilot-এর ফলাফল—২০টি জেলায় নতুন মামলা দায়ের গড়ে ৬২.০২ শতাংশ কমে যাওয়ার সরকারি দাবি—এই উদ্যোগের সম্ভাবনাকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে জুলাই ২০২৬-এ আরও ১০ জেলায় কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে তিনটি বিষয় অপরিহার্য:
প্রথমত—ন্যায়বিচারকে বিসর্জন দিয়ে শুধু মামলা কমানো যাবে না।
দ্বিতীয়ত—দুর্বল পক্ষকে চাপ দিয়ে আপস করানো যাবে না।
তৃতীয়ত—আইনজীবীকে ব্যবস্থার বাইরে না রেখে ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।
কারণ বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ হয়তো এমন হবে না যেখানে প্রত্যেক বিরোধের শেষ ঠিকানা আদালত।
কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থাও কাম্য নয় যেখানে আদালতে যাওয়ার আগে মানুষ তার আইনজীবীকে হারিয়ে ফেলে।
সুতরাং ভবিষ্যতের মূল প্রশ্ন “লিগ্যাল এইড আইনজীবীদের কাজ কেড়ে নেবে কি না” নয়।
বরং প্রশ্ন হলো— আইনজীবীরা কি পুরনো litigation model আঁকড়ে থাকবেন, নাকি পরিবর্তিত বিচারব্যবস্থায় নিজেদের নতুন ভূমিকা তৈরি করবেন?
আমার মতে, যারা পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা পরিবর্তন করতে পারবেন, তাদের জন্য এই সংস্কার হুমকির চেয়ে সুযোগই বেশি। আর যারা শুধু মামলা দায়ের ও দীর্ঘ শুনানিনির্ভর পেশাগত কাঠামোর ওপর নির্ভর করবেন, তাদের জন্য আগামী দশকটি নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে কঠিন হতে পারে।
ভবিষ্যতের সফল আইনজীবী সম্ভবত শুধু ভালো “লিটিগেটর” হবেন না; তিনি একই সঙ্গে ভালো “লিগ্যাল স্ট্র্যাটেজিস্ট, নেগোশিয়েটর এবং মেডিয়েটর” হবেন।






















