ষাট এবং সত্তর দশকে ফরিদপুর শহরের কিছু সংবাদচিত্র-১
- আপডেট সময় : ০২:৪৪:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 140
[ষাট এবং সত্তর দশকে আমি ফরিদপুর শহরের একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। ওই সময় এই শহরে এবং এর আশেপাশে ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা ফিরে দেখা ইতিহাসের একটি অংশ হতে পারে। আমার স্মৃতিতে সে-সকল ঘটনা আজও ভাস্বর, যার কয়েকটি সংবাদচিত্র আজকের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হলো।]
ফরিদপুর শহরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আগমন
১৯৬০ সালের ১লা জুন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তান সফরের অংশ হিসেবে ফরিদপুরে আগমন করেন। ওই সময় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক এম এ গনি এবং আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগের জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট রাজনীতিক ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) তাঁকে স্বাগত জানান। তিনি সর্বপ্রথম ফরিদপুর সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে তিনি ফরিদপুর মেলার মাঠে (বর্তমানে ফরিদপুর স্টেডিয়াম) আসেন এবং আপামর জনসাধারণের সাক্ষাৎ দেন। প্রথমে তাঁর গাড়ির বহর মেলার মাঠের পূর্বপাশের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে এবং সরাসরি মাঠের উত্তরপাশে কালেক্টরেট ক্লাব ভবনের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে অবস্থান করেন। এখন অবশ্য সেই ভবনটি নেই। তখন এটি ছিল দ্বিতল বিশিষ্ট টিনের ছাউনি দেওয়া টিনশেড ভবন।
ততক্ষণে মেলার মাঠে লোকে লোকারণ্য। ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান খাকি রঙের ইউনিফর্ম পরিহিত ছিলেন। তাঁর ইউনিফর্মে দুই পাশে এবং কাঁধে সুদৃশ্য নানান ব্যাজ লটকানো ছিল। তিনি জনসম্মুখে উর্দুতে ভাষণ দেন। সেই একবারই তিনি ফরিদপুরে আগমন করেন এবং জনসম্মুখে ভাষণ দান করেছিলেন।
শতাব্দীর ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা: ২৩ জনের প্রাণহানি, একজন জীবিত উদ্ধার
ষাটের দশকের শুরুতেই ঢাকা-ফরিদপুর হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করে পিআইএ (পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স)। তখন সকাল-বিকাল দুই বেলা বাণিজ্যিকভাবে এই সার্ভিস চালু হয়। ২৫ সিট বিশিষ্ট এই সার্ভিসের ভাড়া নির্ধারিত ছিল ২৫ টাকা।
১৯৬৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি সকালে একজন ক্রুসহ ২৪ জন যাত্রী নিয়ে হেলিকপ্টারটি ঢাকা ছেড়ে আসে। হেলিকপ্টারটি ফরিদপুর বায়েতুল আমান আকাশে প্রবেশ করার পর হেলিকপ্টারের পাখার সঙ্গে একটি শকুনের সংঘর্ষ হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টারটিতে আগুন লেগে যায়। এমতাবস্থায় হেলিকপ্টারটি ফরিদপুর শহরের পার্শ্ববর্তী তুলাগ্রাম-আলালপুর সংলগ্ন গাছবাড়ি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাচক্রে একজন লোক প্রাণে বেঁচে যান এবং একজন ক্রুসহ ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। পরে জীবিত ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সিলেটের সুনামগঞ্জ নিবাসী আবদুল মান্নান, যিনি পরবর্তীতে একজন সচিব এবং আওয়ামী লীগের পরিকল্পনা মন্ত্রী হন। তিনি ভাগ্যক্রমে আমার কর্মকালীন জীবনে বিসিকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
পরদিন ৩রা ফেব্রুয়ারি দুপুরে ফরিদপুর হেলিপোর্টে মৃত ব্যক্তিদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাজায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি এতে উপস্থিত হননি।
ষাটের দশকে ফরিদপুরে এজাতীয় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কারণে আজ পর্যন্ত ফরিদপুরের সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের অন্য কোনো স্থানের বাণিজ্যিক হেলিকপ্টার অথবা বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হয়নি। উল্লেখ্য যে, ষাটের দশকে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ফরিদপুরে যত লোকের প্রাণহানি ঘটেছে, আজ পর্যন্ত এমন কোনো দুর্ঘটনায় এত লোকের প্রাণহানি সংঘটিত হয়নি।
ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে স্মরণকালের দু’টি জনসভা অনুষ্ঠিত
ষাট এবং সত্তর দশকে যত রাজনৈতিক জনসভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো অম্বিকা ময়দানে। কিন্তু ওই সময় স্মরণকালের দুটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে। একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে; এটি ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জনসভা। অন্যটি দেশ স্বাধীন হবার অব্যবহিত পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনসভা। দুটি জনসভাতেই আমার উপস্থিতি ছিল।
মওলানা ভাসানীর সেদিন পরনে ছিল তাঁর চিরাচরিত লুঙ্গি এবং খদ্দরের পাঞ্জাবি, মাথায় ছিল তালের টুপি। মাঠের পূর্বপাশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বলেছিলেন- “আমরা পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানের নিপীড়নের শিকার। নানান বিষয়ে আমরা বঞ্চিত। এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমার ন্যায্য দাবি মানতে হবে, নইলে পাকিস্তান সরকারের নীল সুতা লাল সুতা বের করে দেওয়া হবে।’
ফরিদপুরের শত শত জনতা মওলানা ভাসানীর এই জনসভায় উপস্থিত ছিলেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে ফরিদপুর শহরে আগমন করেন। ফরিদপুর সার্কিট হাউসে ইমামউদ্দিন আহমদ, কে এম ওবায়দুর রহমান, শামসুদ্দিন মোল্লা, এস এম নুরুন্নবী, প্রিন্সিপাল দেলোয়ার হোসেনসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ তাঁকে স্বাগত জানান এবং সার্কিট হাউসের দক্ষিণ পাশে নির্ধারিত মঞ্চে ফরিদপুর পুলিশ কর্তৃক তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সার্কিট হাউসে ফরিদপুরের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক শেষে তিনি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে নির্ধারিত জনসভায় উপস্থিত হন। রাজেন্দ্র কলেজের পূর্ব-উত্তর কোণে (বর্তমানে যেখানে বাবলাতলা) পশ্চিমমুখী একটি সভামঞ্চ করা হয়।
তিনি এই জনসভায় বলেন- “আমি জেল থেকে বের হয়ে এসে এক মুহূর্ত সময় পাই নাই। ফরিদপুর জেলায় আমি জন্মগ্রহণ করেছি। অন্যান্য জেলার ভাইবোনদের না দেখে তোমাদের কাছে তো আমি আগে যাবার পারি না, তাই প্রথমে আমার অন্য জেলায় ঘুরতে হবে। তারপরে আমি ফরিদপুর জেলায় যাব। আমারও মন কাঁদে আপনাদের কাছে আসতে।—আমি যখন ফিরে এলাম, বাংলার মানুষ আমাকে জাতির পিতা হিসেবে ভালোবাসে। আমার কাছে প্রধানমন্ত্রী হওয়া লজ্জার বিষয়। যে মানুষ জাতির পিতা হতে পারে, সে প্রধানমন্ত্রী হতে পারে না। কিন্তু আমি এসে দেখলাম, আমার সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম, দেখলাম ব্যাংকে অর্থ নেই, গুদামে খাবার নাই, বৈদেশিক মুদ্রা নাই, রাস্তা নাই, ঘাট নাই, কাপড়-চোপড় নাই, চিটাগং পোর্ট নষ্ট হয়ে গেছে, চালনা পোর্ট নষ্ট হয়ে গেছে, কী করে এই লোকদের বাঁচাতে হবে? বাঁচাতে পারব। বাধ্য হয়ে আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছে।—আমি ভিক্ষা করে আনি বাংলার গ্রামে দেই, কিছু কিছু চোরের দল, চাটার গোষ্ঠী সেইগুলা আবার চেটে চেটে খায়। এই চাটার গোষ্ঠীদের আমি ঠাণ্ডা করতে চাই। এই চাটার গোষ্ঠীদের আমি শেষ করতে চাই। আর চাই যারা আমার মানুষকে রাত্রে ঘুমাতে দেয় না, যারা রাত্রে চুরি ডাকাতি করে।—বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, মনে করেন ঐ রাজেন্দ্র কলেজ ঐখানে রক্তের দাগ আছে। এখনও ঐ সার্কিট হাউসে রক্তের দাগ আছে, এখনও ভাঙার রাস্তায় রক্তের দাগ আছে, এখনও কানাইপুরের রাস্তায় রক্তের দাগ আছে, এখনও মাঠে মাঠে লাশ আছে। ওদের কথা চিন্তা করেন। ওদের রক্তের কথা চিন্তা করেন। ওদের মা-বোনদের কথা চিন্তা করেন। ওদের কথা ভাবেন। ঐ রক্ত চিন্তা করে এদেশের মানুষকে ভালোবাসেন। এদেশের মানুষের দুঃখ মোচন করেন।—সাড়ে সাত কোটি মানুষকে আমার বাঁচাতে হবে। ভিক্ষা করে কতকাল চলবে, যদি দেশের মধ্যে আমি উৎপাদন করতে না পারি? রোজ মরারে কেডা মারে? রোজ ভিক্ষা চাইলে কে দেয়।”
তিনি আরো বলেন- “আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে তোমার বাড়ি কোথায়? আমি বলি বাংলাদেশ। সব জায়গার মানুষ আমার চোখে সমান। আমি তো বেইনসাফি করতে পারি না। আগে আসতে পারি নাই। তবুও আমি তো এখানে জন্মগ্রহণ করেছি, এই মাটিতে আমি জন্মগ্রহণ করেছি– একথা অস্বীকার করতে পারি না। আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদন রইল যে আপনারা যে যেখানে আছেন, সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করেন — আমি জেলের থেকে বের হয়ে এসেছি প্রায় এগারো মাস, দুই মাস অসুস্থ ছিলাম। সকালবেলা আমি বসি, রাত এগারোটা পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়। সকলেই কাজ করেন। কাজ না করলে হবে না।”
রাজেন্দ্র কলেজের ১৩০ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করে ফরিদপুর জেলা কারাগারে: যা ছিল নজিরবিহীন
মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী লাল মিয়া, যিনি আবদুল্লাহ জহিরুদ্দিন নামে পরিচিত, তিনি ছিলেন পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী। ১৯৬৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাজেন্দ্র কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে এক সংবর্ধনা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যথারীতি কলেজে সংবর্ধনার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু ইতিপূর্বে এই সরকার কর্তৃক দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকজন ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করার কারণে সরকারের প্রতি ছাত্ররা ছিলেন বিক্ষুব্ধ। তারা যখন জানতে পারেন সরকারের একজন মন্ত্রী তাদের কলেজে আসবেন এবং কলেজ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করা হবে, তখন তারা অধিকতর বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-মিটিং করে এবং ঘোষণা দেয় মন্ত্রীর আগমনকে প্রতিরোধ করবে।
মন্ত্রী লাল মিয়া সাহেব নির্ধারিত দিনে কলেজ প্রাঙ্গণে পৌঁছার আগেই বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা তাঁর স্মরণে কলেজ চত্বরে যে গেটটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিতে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সভামঞ্চ তছনছ করে ভেঙে ফেলা হয়।
ছাত্ররা স্লোগান দেয়— ‘খুনি আইয়ুবের মন্ত্রী লাল মিয়া ফিরে যাও, ফিরে যাও’, ‘ফরিদপুরের মাটিতে খুনিদের ঠাঁই নাই’, ‘খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনি তোমার রক্ষা নাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘ছাত্রদের বুকে গুলি কেন? খুনি সরকার জবাব চাই’, ‘আমাদের দাবি মানতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে’। এই সব স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজেন্দ্র কলেজ প্রাঙ্গণ। অবশেষে ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে মন্ত্রী মহোদয় পুলিশ প্রহরায় কলেজ ত্যাগ করেন।
সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ)-এর সঙ্গে পিএসএফ নামে নির্দলীয় ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ ছাত্রদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। পুলিশের বেধড়ক মারপিটে অনেক ছাত্রছাত্রী আহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ১৩০ জন (মতান্তরে ২৫০ জন) ছাত্রকে গ্রেফতার করে। এত সংখ্যক ছাত্রের কারাবরণ করার ইতিহাস ছিল নজিরবিহীন। ছাত্ররা ফরিদপুর জেলখানায় প্রবেশ করলে জেলখানা চত্বর সরগরম হয়ে ওঠে। ছাত্ররা জেলখানায় প্রবেশ করে মন্ত্রী লাল মিয়া এবং আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। সরকারের প্রবল বাধা সত্ত্বেও এক মাসের মধ্যে সকলে জেল থেকে জামিন লাভ করে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়।
ওই সময় যারা ছাত্রনেতা ছিলেন তারা হলেন— মাজেদুর রহমান, তাবিবুর রশিদ, বন্ধু গোপাল, লুৎফর রহমান, আ. বারী, আবদুল মোতালেব, মাসুদুর রহমান টিপু। (চলবে-)
লেখক— ডি-লিট, কবি, স্থানীয় ইতিহাসবিদ, গবেষক ও ফোকলোরবিদ।

















