বিংশ শতাব্দীর বিস্ময় বিজ্ঞানী ড. আবদুস সাত্তার খান
- আপডেট সময় : ০৩:৫৮:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 70
মহাকাশ প্রযুক্তি, কাটিং-এজ জেট ইঞ্জিন কিংবা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের সুপারঅ্যালয়—প্রতিটি আধুনিক প্রযুক্তির নেপথ্যে রয়েছে উচ্চ তাপ সহনশীল ও টেকসই ধাতু উদ্ভাবনের গল্প। আর এই বিশ্বমঞ্চে অ্যারোস্পেস মেটালার্জিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন এক বাংলাদেশী বিজ্ঞানী—ড. আবদুস সাত্তার খান। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ থেকে শুরু করে বিমান তৈরির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘প্রাট অ্যান্ড হুইটনি’ এবং পাওয়ার জেনারেটিং টেকনোলজির সর্ববৃহৎ সংস্থা ‘আলস্টম’—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়।
চার দশকের বর্ণাঢ্য গবেষণাজীবনে ৪০টির বেশি সংকর ধাতু (Superalloy) উদ্ভাবন ও ৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পেটেন্টের মালিক হওয়া এই বিজ্ঞানী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান মেটালার্জিস্ট।
প্রান্তিক গ্রাম থেকে অক্সফোর্ড ১৯৪১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার খাগাতুয়া গ্রামের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন আবদুস সাত্তার খান। শৈশবেই পিতৃহীন হওয়ায় নানাবাড়িতে কাটে তাঁর বাল্যকাল। গ্রাম্য প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তিনি রতনপুর আবদুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে বোর্ড স্ট্যান্ড করেন এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। ১৯৬২ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে।
মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ স্কলারশিপ পেয়ে ১৯৬৪ সালে গমন করেন বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৮ সালে সেখান থেকে রসায়নে অর্জন করেন ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রি। দেশে ফিরে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৫শে মার্চের কালরাতে অলৌকিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ থেকে বেঁচে যান তিনি। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পর উচ্চতর গবেষণার উদ্দেশ্যে ১৯৭৩ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ফ্লোরিডা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুকাল শিক্ষকতার পর গবেষণাগারকে বেছে নেন তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র হিসেবে।
সংকর ধাতু এবং জেট ইঞ্জিনের নতুন দিগন্ত ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এএমএস (AMS) গবেষণাগারে সংকর ধাতু নিয়ে কাজ শুরু করেন ড. সাত্তার খান। সে সময়টি ছিল জেট ইঞ্জিনের ব্যাপক উন্নয়নকাল। কিন্তু তীব্র ঘর্ষণ ও অতিরিক্ত উচ্চ তাপমাত্রার দরুন পিস্টন ক্ষয় হয়ে যাওয়া ছিল তখনকার ইঞ্জিন প্রকৌশলীদের প্রধান সমস্যা।
আড়াই বছরের গবেষণায় ড. সাত্তার খান সেখানে ১০টিরও বেশি উচ্চ তাপ সহনশীল সংকর ধাতু তৈরি করতে সক্ষম হন। ১৯৭৬ সালে তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) লুইস রিসার্চ সেন্টারে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখানে এসে তাঁর নজর পড়ে মহাকাশযানে ব্যবহারোপযোগী হালকা কিন্তু চরম তাপসহনশীল ধাতুর ওপর। গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত হয় নিকেল ও অ্যালুমিনিয়ামের এক বিশেষ সংকর ধাতু। হালকা এবং উচ্চ তাপ প্রতিরোধী হওয়ায় এই উদ্ভাবন ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা ও গতি বাড়ায় এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয় এনে দেয়। পরবর্তীতে মার্কিন বিমান বাহিনীর দ্রুতগতির এফ-১৫ (F-15) ও এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমানের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিন উন্নয়নে এই সংকর ধাতু সরাসরি ব্যবহৃত হয়। মার্কিন প্রাট অ্যান্ড হুইটনি (Pratt & Whitney) কোম্পানি তাঁর এই উদ্ভাবনে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সাফল্য দেখে এতে অর্থায়ন করে।
এই অসামান্য উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’। মার্কিন জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পপুলার সায়েন্স’ ড. সাত্তার খানের এই অবদানকে বিংশ শতাব্দীর সেরা উদ্ভাবনগুলোর অন্যতম বলে ঘোষণা করে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস টারবাইন ও ন্যানো-ক্যাটালিস্ট একুশ শতকের সূচনায় ড. সাত্তার খান সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত শক্তি ও পরিবহন কোম্পানি ‘আলস্টম’ (Alstom)-এ যোগ দেন। সেখানে মাত্র পাঁচ বছর কাজ করে তিনি ২৫টি বৈশ্বিক পেটেন্টের মালিক হন। আলস্টমে তাঁর প্রধান সাফল্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী গ্যাস টারবাইনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুতগতির ট্রেনের ইঞ্জিনের জন্য টেকসই সংকর ধাতু তৈরি।
তাঁকে অ্যারোস্পেস প্রযুক্তির অগ্রদূত বলা হয় কারণ:
▫️কাটিং-এজ জেট ইঞ্জিনের জ্বালানি বাষ্পে ব্যবহারের জন্য তিনি তৈরি করেন উচ্চ সাশ্রয়ী ন্যানো-ক্যাটালিস্ট (Nano-catalyst)।
▫️ সামরিক বিমানে তাঁর ব্যবহৃত প্রলেপ প্রযুক্তি বা থার্মাল ব্যারিও কোটিং (Thermal Barrier Coating) ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষয় কমিয়ে দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
▫️আলস্টমের জি-১১ (GT11) শ্রেণির আধুনিক গ্যাস টারবাইনে তাঁর আবিষ্কৃত জারণরোধী প্রলেপযুক্ত যন্ত্রাংশ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ড. আবদুস সাত্তার খান অর্জন করেছেন বহু বৈশ্বিক সম্মাননা।
▫️ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি (Royal Society of Chemistry)-র চার্টার্ড বিজ্ঞানী এবং ফেলো।
▫️আমেরিকান সোসাইটি অব মেটালস (American Society of Metals)-এর ফেলোশিপ।
▫️নাসা স্পেস প্রপালশন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ‘নাসা অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স’।
▫️প্রাট অ্যান্ড হুইটনি কোম্পানির ‘স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড’ এবং আজীবন সম্মাননা।
দেশপ্রেম ও মানবসেবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শীর্ষ বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও নিজের শেকড়কে কখনো ভুলে যাননি তিনি। সুযোগ পেলেই ছুটে এসেছেন মাতৃভূমিতে। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় যখন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিধ্বস্ত হয়, তখন প্রবাসে থেকে একক প্রচেষ্টায় ৬১,০০০ মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেন তিনি এবং রেড ক্রসের মাধ্যমে বাংলাদেশে দুর্গতদের সহায়তায় প্রেরণ করেন।
এক বিস্মৃত নক্ষত্র ২০০৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ৬৭ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মৃত্যুবরণ করেন এই মহান বিজ্ঞানী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি মানচিত্রে যার অবদান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা স্থান দখল করে আছে, নিজ জন্মভূমিতে তাঁর চর্চা কিংবা প্রচার প্রায় নেই বললেই চলে। আগামী প্রজন্মকে বিজ্ঞান চর্চায় অনুপ্রাণিত করতে এবং গ্রামীণ প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বের শীর্ষস্থানে পৌঁছানোর উদাহরণ হিসেবে ড. আবদুস সাত্তার খানের জীবন ও কাজ ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সমাজে সম্মান কুড়ানো এই সূর্যসন্তানের অবদানকে জাতীয়ভাবে স্মরণ ও সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।

















