[১০ মার্চ ১৯৫০ – ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭]
স্মরণে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আবদুর রব
- আপডেট সময় : ১০:৩২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 109
বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক অধ্যাপক আবদুর রব ছিলেন একাধারে একজন মেধাবী শিক্ষক, সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সংগঠক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। দেশপ্রেম, নেতৃত্ব, ন্যায়নিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় তাঁর কর্মময় জীবন ছিল অনন্য। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শিক্ষা ও সমাজসেবার বিস্তৃত পরিসর—সর্বত্রই তিনি রেখে গেছেন তাঁর কর্মের স্বাক্ষর।
অধ্যাপক আবদুর রব ১৯৫০ সালের ১০ মার্চ রাজবাড়ী জেলার তৎকালীন পাংশা (বর্তমান কালুখালী) থানার চরভিটি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, আদর্শবান ও নেতৃত্বগুণে সমৃদ্ধ। শিক্ষাজীবনে তাঁর মেধার উজ্জ্বল প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৬৬ সালে পাংশা থানার মৃগী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে নবম স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৮ সালে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহসী নেতৃত্ব:
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অধ্যাপক আবদুর রব দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর দুই ফুফাতো ভাই—দিয়ানত আলী ও আব্দুল বারেককে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যান। ভারতের দেরাদুন মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য তিনি মনোনীত হন। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হলেও মেধা, দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে তিনি লিডার নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে লিডার হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার দেখা যায়নি। বরং একই মহকুমার হওয়ায় মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে তিনি আব্দুল মতিনকে লিডার এবং নিজেকে ডেপুটি লিডার করার প্রস্তাব দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে ফুটে ওঠে তাঁর অসাধারণ বিনয়, উদারতা ও নেতৃত্বের মানবিক বৈশিষ্ট্য।
দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পিতভাবে এলাকা ভাগ করে বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার তরুণদের সংগঠিত করেন। তাঁদের নিয়ে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী মুক্তিযোদ্ধাবাহিনী, যা পরবর্তীতে ‘রব বাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ভিটি গ্রামের মানিক ডাক্তারের ভবনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। রাজবাড়ীকে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার যুদ্ধে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অধ্যাপক আবদুর রবের নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা কালুখালী রেলস্টেশনের সম্মুখযুদ্ধে গোয়ালন্দ মহকুমার রাজাকার বাহিনীকে পরাস্ত করেন। এ যুদ্ধে রাজাকার কমান্ডার নাজিউর রহমান (নীলু চৌধুরী)সহ বেশ কয়েকজন রাজাকার বন্দি হন। অন্যান্য বন্দিদের পাটবাড়িয়ায় শাফি ডাক্তারের বাড়িতে বিচারের মাধ্যমে লঘু শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। নীলু চৌধুরীকে নিয়ে আসা হয় মৃগী ক্যাম্পে। পরে মৃগী বাজারের হাটবারে উপস্থিত জনতার কাছে তিনি তাঁর দেশবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরবর্তীতে তিনি রব বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে রাজবাড়ী মুক্ত করার যুদ্ধে অংশ নেন।
নীলু চৌধুরীর বাহিনীর কাছ থেকে প্রায় একশটি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। এসব অস্ত্র পরবর্তী সময়ে রাজাকার ও বিহারিদের বিরুদ্ধে রব বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি জোগায়।
মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তানি সরকার কর্তৃক মনোনীত রাজবাড়ীর তৎকালীন গভর্নর ও বিহারিদের নেতা সৈয়দ খামার ‘রব বাহিনী’র সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ উদ্ধার করে কমান্ডার আবদুর রব তা রাজবাড়ীর তৎকালীন এসডিও শাহ মোহাম্মদ ফরিদের কাছে সরকারি কোষাগারে জমা দেন।
পরবর্তীতে সৈয়দ খামারের স্ত্রী ছায়া দিদিমণি কমান্ডার আবদুর রবের কাছ থেকে সেই জমার স্লিপ সংগ্রহ করেন। স্লিপ প্রদর্শন করে তিনি সরকারি কোষাগার থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার অক্ষত অবস্থায় ফেরত পান। এ ঘটনায় ছায়া দিদিমণি বিভিন্নজনের কাছে অধ্যাপক আবদুর রবের সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘রব বাহিনী’র সঙ্গে শ্রীপুরের আকবর বাহিনীরও সমন্বয় ছিল। পরিকল্পনা করে তারা পাকিস্তানি সেনাদের লাঙ্গলবাঁধ বাজার ক্যাম্পে যৌথভাবে দুই দিক থেকে আক্রমণ চালায়। তাঁদের সাহসী ও সমন্বিত প্রতিরোধ স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘রব বাহিনী’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষাব্রতী অধ্যাপক আবদুর রব:
মুক্তিযুদ্ধের পর অধ্যাপক আবদুর রব তাঁর মেধা ও নেতৃত্বকে শিক্ষা বিস্তারের কাজে নিয়োজিত করেন। কালিয়াকৈর ও ঘোড়াশাল কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি ফরিদপুর ইয়াছিন কলেজে যোগ দেন এবং ১৯৮৭ সালে কলেজটি সরকারিকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। এরপর বরিশাল মহিলা কলেজ, সদরপুর কলেজ ও গৌরনদী কলেজে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি পুনরায় ইয়াছিন কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ২০০৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল গভীর ও আন্তরিক। নিজ জন্মভূমিতে তাঁর ফুফাতো ভাই ও সহযোদ্ধা শহীদ দিয়ানত আলীর স্মৃতি চিরঅম্লান করে রাখতে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মৃগী শহীদ দিয়ানত কলেজ’। কলেজ প্রতিষ্ঠায় এলাকার সাধারণ মানুষও তাঁর পাশে সক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ছাড়া ফরিদপুর মহাবিদ্যালয় ও ফরিদপুর সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন।
শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায় ও শিক্ষা আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং সমাজ ও জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ:
শিক্ষার পাশাপাশি সমাজসেবায়ও অধ্যাপক আবদুর রবের ছিল সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফরিদপুর রোটারি ক্লাবের সেক্রেটারি ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ রোটারি ডিস্ট্রিক্টের ডেপুটি গভর্নর হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
রোটারি ক্লাবের মাধ্যমে তিনি ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর গ্রামাঞ্চলের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় টিউবওয়েল ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়। বন্যার সময় তিনি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ বিতরণ করেন। স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এলজিইডিতে উচ্চপদে কর্মরত বন্ধুদের সহযোগিতায় নিজ এলাকায় ব্রিজ নির্মাণসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি ভূমিকা রাখেন। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তিনি তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সামাজিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়েছেন।
চিরস্মরণীয় এক কর্মবীর:
অধ্যাপক আবদুর রবের জীবন ছিল কর্ম, আদর্শ ও মানুষের জন্য নিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান এবং সমাজসেবায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা তাঁকে মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এই গুণী মানুষটি ইন্তেকাল করেন। নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মৃগী শহীদ দিয়ানত কলেজ প্রাঙ্গণেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর কর্ম ও আদর্শকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ থেমে থাকেনি। ২০১৪ সালে অধ্যাপক আবদুর রব ফাউন্ডেশন – এর উদ্যোগে মো. মাহবুবুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একটি স্মারকগ্রন্থ, যেখানে তাঁর জীবন, কর্ম, মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক অবদানের ওপর ৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখা স্থান পায়। স্মারকগ্রন্থটি তাঁর কর্মময় জীবন ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের একটি মূল্যবান দলিল হয়ে আছে।
আজ তাঁর ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর যোদ্ধা, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাবিদ, সংগঠক ও সমাজসেবক অধ্যাপক আবদুর রবকে। তাঁর দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা, নেতৃত্ব, শিক্ষা বিস্তারের প্রয়াস ও মানবসেবার আদর্শ আগামী প্রজন্মকে আলোকিত ও অনুপ্রাণিত করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে প্রার্থনা করি—তিনি যেন এই কর্মবীরকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমিন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ এবং সাধারণ সম্পাদক, অধ্যাপক আবদুর রব ফাউন্ডেশন।





















