দ্বিতীয় যুদ্ধ [২য় পর্ব] ‘নীরবতার অঙ্গীকার’
- আপডেট সময় : ০২:১৬:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 32
[১ম পর্বের পর]
অধিকার-হরণের হুকুমনামা জারির পর সাত দিন কেটে গেছে। দুর্গ রক্ষক দলের নিস্তব্ধতা যেন আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। দুর্গের বিভিন্ন অস্ত্রখানার মজুদ রসদগুলো পরীক্ষা করা হলো। নিয়ম মাফিক এক স্থান থেকে সেগুলো আরেক স্থানে জায়গা বদল করা হলো। এতে প্রহরীদের মনোবল বাড়লো তবে বাইরে আবার কিছু রটনাও ছড়ালো কোন মহল।
প্রধান অধিপতি ফিরোজ খান তাঁর অনুগত অধিপতিদের নিয়ে সেই রাতে শেষবারের মতো একটি গোপন কক্ষে মিলিত হলেন।
ওমর একটি মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে হতাশার সুরে বললেন, “মহান অধিপতি, জন-নিয়ম কেল্লা তাদের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। পরোয়ানা কার্যকর হলে, এদের সবাইকেই কালকের মধ্যে অন্ধকার সভার পরিষদের সামনে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি শৌর্য-শালা শক্তির নিয়ম অনুযায়ী নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করি, তবে পুরো আর্যভূমিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।
এটাই অন্ধকার সভার লক্ষ্য—অরাজকতা সৃষ্টি করে বণিক সংঘের প্রবেশপথ তৈরি করা।”
ফিরোজ খান শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমরা রক্তপাত করব না। আমাদের ঐতিহ্য হলো রক্ষা করা, ধ্বংস করা নয়। আমরা ওদের পাতা ফাঁদে পা দেব না।” সবাই অবাক হয়ে ফিরোজ খানের দিকে তাকাল।
“আমরা নীরবে এই অপমান গ্রহণ করব,” তিনি বললেন। “কিন্তু আত্মসমর্পণ করব না। আমরা আমাদের অধিকার-হরণের হুকুমনামা মেনে নেব। কারণ আমাদের সকলে এই অপরাধের জন্য দায়ী নয়। যারা নিয়ম ভঙ্গ করেছে তাদের শাস্তি হবে। সমগ্র জাতির সামনে প্রমাণ করব, এই দুর্গের রক্ষকেরা আর্যভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। তারা কখনো বিক্রি হওয়ার নয়। এটি আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি দলিল মাত্র।”
তিনি একটি কালো কাপড়ে মোড়ানো ছোট সিন্দুক খুললেন। এর ভেতর ছিল দুর্গ-রক্ষক দলের প্রতিষ্ঠার প্রথম দলিল, রক্ত-শপথের মূল শপথপত্র আর মূল স্তম্ভের একটি ছবি। ছবিটি দেখে কিছু তরুণ সহ-অধিপতি একে অপরের দিকে বিরক্তি নিয়ে চাহনি বিনিময় করলো। তাদের মুখে কেমন একটি বিতৃষ্ণা আর প্রতিশোধের আগুন।
“তোমরা কাল নগর প্রথার সভালয়ে যাবে,” ফিরোজ খান নিচু স্বরে নির্দেশ দিলেন। “কিন্তু তোমরা সেখানে প্রতিকার পাওয়ার জন্য কোনো বাকযুদ্ধ করবে না। তোমরা শুধু তোমাদের গৌরব-ক্ষয়ের লিপিতে স্বাক্ষর করবে, এই মর্মে যে- তোমরা আর্যভূমির সার্বভৌমত্বের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলে।
এই নীরবতা হবে আমাদের শেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—দেশের বিবেককে জাগিয়ে তোলার মন্ত্র।”
পরের দিন, যখন দুর্গ-অধিপতিরা জন-নিয়ম কেল্লার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটল।
আলী আকবারের মাধ্যমে প্রচারিত ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা আর্যভূমির সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছিল। তারা বুঝতে পারছিল, দুর্গের অধিপতিদের কারো কারো জন্য সকলেই দায়ী নয়। সকল অধিপতিদের পরাজয় হলে, এই পরাজয় আসলে তাদের নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হবে।
নগর-প্রথা বিচারালয়ের প্রাঙ্গণ লোকে লোকারণ্য। শোকাহত, নীরব জনগণের এক বিশাল সমাবেশ। তাদের হাতে হাতে ছিল আর্যভূমির প্রাচীন প্রতীক আঁকা পতাকা আর দেশের জন্য আত্ম উৎসর্গ করা তরুণদের আত্মদানের মুহুর্তের ছবি।
যখন দুর্গ অধিপতিরা মাথা নিচু করে কেল্লার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন, জনতার মধ্য থেকে আস্তে আস্তে একযোগে প্রাচীন আর্য-শপথ উচ্চারিত হতে থাকল—সেই শপথ, যা ভূমি ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ করে।
অন্ধকার সভার পরিষদের প্রতিনিধিরা এই উত্তাল জনতার স্রোত দেখে আতঙ্কিত হলেন। তাদের ধারণা ছিল, দুর্গ অধিপতিদের বিচার শুরু হলে জনতা দ্বিধাবিভক্ত হবে। গোটা দুর্গের রক্ষকদের মাঝে বিশৃঙ্খলা ঘটবে। কিন্তু এই শোকাহত ঐক্য তাদের হিসেব পাল্টে দিল।
বিচারিক কক্ষে তাঁরা যখন একে একে অধিকার-হরণের হুকুমনামা গ্রহণ করছিল, ঠিক সেই সময়, বাইরে অপেক্ষারত আলী আকবার তার শেষ কাজটি করল।
সে সেই চুক্তিপত্রের অনুলিপিগুলো, যেখানে স্বর্ণদ্বার বিক্রি আর সাগর-মুদ্রা দ্বীপের অধিকার তিমির দেশের বণিক সংঘের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিল।
ভেতরে যখন বিচার শুরু হলো, দুর্গের সেইসব অধিপতিদের আটক করা হলো যারা সরাসরি ভয়ংকর নানা অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু বাইরে, আর্যভূমির জনগণ তখন হাতে হাতে স্বর্ণদ্বারের বিক্রয়-দলিল দেখছে। তাদের কাছে যেন সবকিছু ক্রমেই পরিস্কার হয়ে উঠছে।
আস্তে আস্তে তাদের মন থেকে সব দ্বিধা দূর হয়ে গেল। ফিরোজ খান দূর থেকে এই দৃশ্য দেখলেন। তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। আর মুখের দুশ্চিন্তা কাটিয়ে সেখানে ফুটে উঠলো এক গভীর সন্তুষ্টি।
“ওমর,” ফিরোজ খান অস্ফুটে বললেন, “আমাদের তিমির-মুক্ত মিনার রক্ষার শেষ উপায় এই নীরব আত্মত্যাগই ছিল। দূর্গের রক্ষকেরা ভেঙে যায়নি, বরং তারা এখন আর্যভূমির প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে। এখন আর্যভূমির সার্বভৌমত্বের দায়িত্ব শুধুমাত্র আমাদের কাঁধে নয়, এটি এখন পুরো জাতির রক্ত-শপথ।”
অন্ধকার সভার পরিষদ এভাবে বিফল হলো। তারা শুধু অভিযুক্তদেরই গ্রেফতার করাতে পেরেছিল। তবে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধী আসামি কৌশলে পালিয়ে গেছে।
যাদের আটক করা গেছে তাদের বিচারের জন্য দুর্গের মধ্যেই তৈরি করা হলো বিশেষ কারাগার।
তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ছিলো মারাত্মক মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ। তাদের নির্দেশে সাধারণ মানুষকে ন্যায় রক্ষার আন্দোলনের জন্য রাঁতের আঁধারে ধরে এনে নিখোঁজ করে দেওয়া হতো। অনেকের মৃতদেহ ভেসে উঠতো নদীতে। অনেককে আবার কোনদিন আর পাওয়া যেতোনা। এসময় তাদের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়েও অনেক কথাবার্তা চললো। দুর্গের সাবেক রক্ষীদের কেউ কেউ তাদের দুর্গ রক্ষা আইনে বিচার করার দাবি জানালো।
কিন্তু পুরো জাতি এসময় জেগে উঠেছিল বিচারের জন্য। তারা অমানবিক জুলুম নির্যাতনের সাথে জড়িতদের উপযুক্ত বিচার দাবি করলো। জনগণের মাঝে এসব নিয়ে নানা কথাবার্তা শুরুর পরে তিমির দেশের বণিক সংঘের স্বর্ণদ্বারে প্রবেশ তখন কঠিন থেকে কঠিনতর হলো।
এক দীর্ঘ, কঠিন, এবং অনিশ্চিত জন-বিবেকের জাগরণের অপেক্ষাযেনো নতুন করে শুরু হলো আবার।
[অসমাপ্ত]


















