কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন
এআই যুগের চ্যালেঞ্জ-২: আধুনিক রিজনিংয়ের যুগ
- আপডেট সময় : ০৬:২৪:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 14
১৯৫৬ ডার্টমাউথ সম্মেলন: একটি আধুনিক শাস্ত্রের আনুষ্ঠানিক জন্ম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ডার্টমাউথ সম্মেলনে। ডার্টমাউথ কলেজের তরুণ গণিতবিদ জন ম্যাকার্থি এই সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং তিনিই প্রথম ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি চয়ন করেন । সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মারভিন মিনস্কি, ক্লদ শ্যানন, নাথানিয়েল রোচেস্টার এবং অ্যালেন নেওয়েল ও হার্বার্ট সাইমনের মতো প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরা।
এই সম্মেলনের মূল প্রস্তাবনা ছিল অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী: “শিখনের প্রতিটি দিক বা বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে এত সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা সম্ভব যে, একটি যন্ত্র তা অনুকরণ করতে সক্ষম হবে”। এই সম্মেলনে নেওয়েল এবং সাইমন তাদের ‘লজিক থিওরিস্ট’ নামক প্রোগ্রামটি প্রদর্শন করেন, যা গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণ করতে সক্ষম ছিল। ডার্টমাউথ সম্মেলনকে এআই–এর সূতিকাগার বলা হয় কারণ এখান থেকেই প্রথমবার গবেষকরা একত্রিত হয়ে যন্ত্রের চিন্তাশক্তি তৈরির একটি সুসংগঠিত রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন।
সম্মেলন পরবর্তী দুই দশকে (১৯৫৬–১৯৭০) এআই গবেষণায় এক স্বর্ণযুগ বা ‘গোল্ডেন এজ’ পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ে বিজ্ঞানীরা মনে করেছিলেন যে, মানুষের সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ (AGI) অর্জন করা কেবল কয়েক দশকের ব্যাপার। ১৯৫৮ সালে জন ম্যাকার্থি ‘লিস্প’ (LISP) প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করেন, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এআই গবেষণার প্রধান হাতিয়ার ছিল। ১৯৫৯ সালে আর্থার স্যামুয়েল ‘মেশিন লার্নিং’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং একটি স্বয়ংক্রিয় চেকার্স খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করেন যা নিজে নিজেই শিখতে পারত।
এআই উইন্টার এবং বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার উত্থান–পতন
ষাটের দশকের শেষের দিকে এআই গবেষকদের অতি–উৎসাহ বাস্তবতার মুখে হোঁচট খায়। তৎকালীন কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা এবং মেমোরি ছিল অত্যন্ত সীমিত। মারভিন মিনস্কি এবং সেমুর পেপার্ট ১৯৬৯ সালে ‘পারসেপট্রন’ (Perceptron) নামক নিউরাল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা দেখান, যা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক গবেষণাকে দীর্ঘকাল স্থবির করে দেয়। বাস্তব জগতের সাধারণ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের বিশালতা বা ‘কম্বিনেটোরিয়াল এক্সপ্লোশন’ মোকাবিলা করতে সিম্বলিক এআই ব্যর্থ হয়।
এই ব্যর্থতার ফলে শুরু হয় প্রথম ‘এআই উইন্টার’ (১৯৭৪–১৯৮০)। এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ নাটকীয়ভাবে কমে যায়। তবে আশির দশকে ‘এক্সপার্ট সিস্টেম’ (Expert Systems) বা বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থার মাধ্যমে এআই গবেষণায় নতুন জোয়ার আসে। এক্সপার্ট সিস্টেমগুলো ছিল নির্দিষ্ট ডোমেইনে (যেমন ওষুধ নির্বাচন বা রাসায়নিক বিশ্লেষণ) বিশেষজ্ঞের জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নিয়ম–নির্ভর (rule-based) প্রোগ্রাম। ১৯৮০ সালে ‘XCON’ নামক এক্সপার্ট সিস্টেম বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং ডেক (DEC) কোম্পানির জন্য বার্ষিক ৪০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে। জাপানি সরকার তাদের ‘ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার’ প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই এক্সপার্ট সিস্টেমগুলোও তাদের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। এগুলো ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সামান্য পরিবর্তনের মুখে ভেঙে পড়ত। ফলে ১৯৯০–এর দশকে দ্বিতীয় ‘এআই উইন্টার’ শুরু হয়।
স্ট্যাটিস্টিক্যাল লার্নিং থেকে ডিপ লার্নিং: আধুনিক বিপ্লব
দ্বিতীয় এআই উইন্টার কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল পরিসংখ্যানগত বা স্ট্যাটিস্টিক্যাল পদ্ধতির ব্যবহার। গবেষকরা বুঝতে পারেন যে, মানুষের মতো হাতে কলমে নিয়ম লিখে বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা অসম্ভব। এর পরিবর্তে বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে প্যাটার্ন বা ধরন খুঁজে বের করার মাধ্যমে যন্ত্রকে শেখানো (Machine Learning) অনেক বেশি কার্যকর। ১৯৯৭ সালে আইবিএম–এর ‘ডিপ ব্লু’ (Deep Blue) দাবা খেলায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে পরাজিত করে প্রমাণ করে যে, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তায় যন্ত্র মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে এআই এক বৈপ্লবিক রূপ লাভ করে: বিগ ডেটা, শক্তিশালী জিপিইউ (Graphics Processing Unit) এবং উন্নত অ্যালগরিদম। ২০১২ সালে ‘ইমেজনেট’ (ImageNet) প্রতিযোগিতায় ‘অ্যালেক্সনেট’ (AlexNet) নামক একটি ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক অন্য সব পদ্ধতিকে বিশাল ব্যবধানে পেছনে ফেলে জয়ী হয়। এটিই ছিল আধুনিক ‘ডিপ লার্নিং’ বিপ্লবের সূচনা। নিউরাল নেটওয়ার্কের বহু স্তর বা ‘লেয়ার’ ব্যবহারের মাধ্যমে ছবি শনাক্তকরণ, ভাষা অনুবাদ এবং কন্ঠস্বর শনাক্তকরণে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়। ২০১৬ সালে গুগল ডিপমাইন্ডের ‘আলফাগো’ (AlphaGo) বিশ্বের কঠিনতম বোর্ড গেম ‘গো’-তে বিশ্বসেরা লি সেডলকে পরাজিত করে দেখিয়ে দেয় যে, ডিপ লার্নিং মানুষের স্বজ্ঞা বা ইনটুইশনকেও অনুকরণ করতে সক্ষম।
২০১৭ সালে গুগলের গবেষকরা ‘ট্রান্সফর্মার’ (Transformer) নামক একটি নতুন আর্কিটেকচার প্রস্তাব করেন। এই প্রযুক্তিটি বাক্যের প্রতিটি শব্দের সাথে অন্য সব শব্দের সম্পর্ক বা ‘অ্যাটেনশন’ বুঝতে পারে, যা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ে (NLP) বিপ্লব ঘটায়। এই ট্রান্সফর্মার আর্কিটেকচারই আজকের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (যেমন GPT) এবং জেনারেটিভ এআই–এর মূল ভিত্তি।
বর্তমান অবস্থা (২০২৪–২০২৫): লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ও রিজনিংয়ের যুগ
২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অভূতপূর্ব স্তরে উপনীত হয়েছি। এআই এখন কেবল একটি টুল নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন বুদ্ধিমান এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান যুগের এআই–এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘রিজনিং’ বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা। ওপেনএআই–এর ‘ও১’ (o1) এবং ‘ও৩’ (o3) সিরিজের মডেলগুলো ‘ইনফারেন্স–স্কেলিং’ (inference-scaling) নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মতো ধাপে ধাপে চিন্তা করতে সক্ষম।























