Bangladesh ০৩:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ>>

ইসলামে নারীর পর্দা বিধান কেন কতটুকু?

অগ্নিপ্রহর ডেস্ক:
  • আপডেট সময় : ১১:৪৪:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • / 97

ইসলামে নারীর পর্দা বা হিজাবের বিধান কেবল একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এটি নারীর সুরক্ষা, মর্যাদা এবং শালীনতা রক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট ও কল্যাণকর ব্যবস্থা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা নারীর পোশাক ও আচরণের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পর্দার বিধানের মূল উদ্দেশ্য

পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন মুমিন নারীর শালীনতা বজায় রাখা এবং তার সৌন্দর্যকে সুরক্ষিত রাখা। এটি সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে এবং নারীকে অহেতুক উত্যক্তকারীদের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূর এর ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

‘‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে এবং নিজেদের সাজসজ্জার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রকাশ না করে, তবে যতটুকু প্রকাশ হওয়া আবশ্যক তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়নার কিছু অংশ নিজেদের বক্ষের উপর জড়িয়ে নেয়…’’

এই আয়াতে ঈমানদার নারীদের দৃষ্টি নত রাখা এবং নিজেদের সৌন্দর্য গোপন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি নারীর ব্যক্তিগত সম্মান ও গাম্ভীর্য রক্ষার একটি স্পষ্ট নীতিমালা।

পোশাক ও ওড়নার ব্যবহার (খিমার)

তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বা স্কার্ফ (খিমার) দ্বারা বক্ষদেশ আবৃত করে রাখে। কুরআনে ওড়না বা ‘খিমার’ ব্যবহারের মাধ্যমে বক্ষদেশ ঢেকে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে:

‘‘ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, যা সাধারণত প্রকাশ থাকে। তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বা স্কার্ফ (খিমার) দ্বারা বক্ষদেশ আবৃত করে রাখে।’’

বাইরে বের হওয়ার পোশাক (জিলবাব)

নারীরা যখন ঘরের বাইরে বের হবেন, তখন তাদের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:

‘‘হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের (জিলবাবের) একাংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’’

এখানে ‘জিলবাব’ বলতে এমন একটি লম্বা চাদর বা বাইরের পোশাককে বোঝানো হয়েছে, যা সাধারণ পোশাকের ওপর দিয়ে পরা হয়। এর মাধ্যমে নারীদের পরিচয় যেমন স্পষ্ট থাকে, তেমনি তারা অহেতুক উত্যক্তকারীদের হাত থেকে নিরাপদ থাকেন।

পর্দা কাদের জন্য এবং কাদের সামনে শিথিলযোগ্য?

ইসলামে পর্দার বিধান সর্বজনীন হলেও কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে এর প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারীরা তাঁদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবেন কেবল তাদের:

  • স্বামী
  • পিতা বা স্বামীর পিতা
  • পুত্র বা স্বামীর পুত্র
  • ভাই বা ভাইয়ের পুত্র ও বোনের পুত্র
  • অন্যান্য নারী
  • নিজের অধিকারে থাকা দাসী
  • এমন পুরুষ পরিচারক যাদের কোনো দৈহিক কামনা নেই
  • এবং এমন শিশু যারা নারীদের গোপনীয়তা সম্পর্কে এখনো অবগত নয়।

অর্থাৎ, এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সব পরপুরুষের সামনে পর্দা করা মুমিন নারীর জন্য বাধ্যতামূলক। এছাড়া, নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য পায়ের নুপুরের শব্দ বা অন্য কোনো উপায়ে আকর্ষণ সৃষ্টি না করেন।

বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা

সূরা আন-নূর এর ৬০ নম্বর আয়াতে বয়স্ক বা এমন নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতার কথা বলা হয়েছে, যারা বিবাহের আশা বা আকর্ষণীয় বয়স পার করে ফেলেছেন। তবে সেখানেও সাবধানতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:

‘‘আর বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য দোষ নেই যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বস্ত্র খুলে রাখে; তবে তাদের জন্য এটি থেকে বিরত থাকাই উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’

পর্দা ইসলামে নারীর অবদমন নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রতীক। কুরআনের এই বিধানগুলো পালনের মাধ্যমেই একজন মুমিন নারী নিজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারেন এবং সফলকাম হতে পারেন।

শেয়ার করুন

ইসলামে নারীর পর্দা বিধান কেন কতটুকু?

আপডেট সময় : ১১:৪৪:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ইসলামে নারীর পর্দা বা হিজাবের বিধান কেবল একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এটি নারীর সুরক্ষা, মর্যাদা এবং শালীনতা রক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট ও কল্যাণকর ব্যবস্থা। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা নারীর পোশাক ও আচরণের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পর্দার বিধানের মূল উদ্দেশ্য

পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন মুমিন নারীর শালীনতা বজায় রাখা এবং তার সৌন্দর্যকে সুরক্ষিত রাখা। এটি সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধ করে এবং নারীকে অহেতুক উত্যক্তকারীদের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নূর এর ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

‘‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থান রক্ষা করে এবং নিজেদের সাজসজ্জার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রকাশ না করে, তবে যতটুকু প্রকাশ হওয়া আবশ্যক তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের ওড়নার কিছু অংশ নিজেদের বক্ষের উপর জড়িয়ে নেয়…’’

এই আয়াতে ঈমানদার নারীদের দৃষ্টি নত রাখা এবং নিজেদের সৌন্দর্য গোপন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি নারীর ব্যক্তিগত সম্মান ও গাম্ভীর্য রক্ষার একটি স্পষ্ট নীতিমালা।

পোশাক ও ওড়নার ব্যবহার (খিমার)

তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বা স্কার্ফ (খিমার) দ্বারা বক্ষদেশ আবৃত করে রাখে। কুরআনে ওড়না বা ‘খিমার’ ব্যবহারের মাধ্যমে বক্ষদেশ ঢেকে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে:

‘‘ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে, যা সাধারণত প্রকাশ থাকে। তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বা স্কার্ফ (খিমার) দ্বারা বক্ষদেশ আবৃত করে রাখে।’’

বাইরে বের হওয়ার পোশাক (জিলবাব)

নারীরা যখন ঘরের বাইরে বের হবেন, তখন তাদের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:

‘‘হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের (জিলবাবের) একাংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’’

এখানে ‘জিলবাব’ বলতে এমন একটি লম্বা চাদর বা বাইরের পোশাককে বোঝানো হয়েছে, যা সাধারণ পোশাকের ওপর দিয়ে পরা হয়। এর মাধ্যমে নারীদের পরিচয় যেমন স্পষ্ট থাকে, তেমনি তারা অহেতুক উত্যক্তকারীদের হাত থেকে নিরাপদ থাকেন।

পর্দা কাদের জন্য এবং কাদের সামনে শিথিলযোগ্য?

ইসলামে পর্দার বিধান সর্বজনীন হলেও কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির সামনে এর প্রয়োগে শিথিলতা রয়েছে। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারীরা তাঁদের সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারবেন কেবল তাদের:

  • স্বামী
  • পিতা বা স্বামীর পিতা
  • পুত্র বা স্বামীর পুত্র
  • ভাই বা ভাইয়ের পুত্র ও বোনের পুত্র
  • অন্যান্য নারী
  • নিজের অধিকারে থাকা দাসী
  • এমন পুরুষ পরিচারক যাদের কোনো দৈহিক কামনা নেই
  • এবং এমন শিশু যারা নারীদের গোপনীয়তা সম্পর্কে এখনো অবগত নয়।

অর্থাৎ, এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সব পরপুরুষের সামনে পর্দা করা মুমিন নারীর জন্য বাধ্যতামূলক। এছাড়া, নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য পায়ের নুপুরের শব্দ বা অন্য কোনো উপায়ে আকর্ষণ সৃষ্টি না করেন।

বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা

সূরা আন-নূর এর ৬০ নম্বর আয়াতে বয়স্ক বা এমন নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতার কথা বলা হয়েছে, যারা বিবাহের আশা বা আকর্ষণীয় বয়স পার করে ফেলেছেন। তবে সেখানেও সাবধানতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:

‘‘আর বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, তাদের জন্য দোষ নেই যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে তাদের বহির্বস্ত্র খুলে রাখে; তবে তাদের জন্য এটি থেকে বিরত থাকাই উত্তম। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’

পর্দা ইসলামে নারীর অবদমন নয়, বরং নারীর নিরাপত্তা ও সম্মানের প্রতীক। কুরআনের এই বিধানগুলো পালনের মাধ্যমেই একজন মুমিন নারী নিজের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারেন এবং সফলকাম হতে পারেন।