Bangladesh ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::

পান্তা আর বাসি ভাতের কথা

আলমগীর জয়
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • / 65

আমি তখন খুব ছোট। বড় বোনের বড় ছেলে হিসেবে অথবা আমার নানাবাড়ির মা-খালা-মামাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম সন্তান হিসেবে মামা-খালারা আমাকে খুবই আদর-স্নেহ করতেন। পেয়ারা খালাম্মা আমাদের বাড়িতে অনেকদিন ছিলেন। এ সময় ওনাকে বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ধরনের আচার বানাতে দেখতাম। আচারগুলো খুবই সুস্বাদু ছিল। এছাড়া উনি হাতের কাজ জানতেন; কাপড়ে ফুলসহ বিভিন্ন নকশা আঁকতেন। তবে যে কারণে ওনার প্রসঙ্গ আসল, এবার সেটা বলি। ওনাকে প্রায়ই দেখতাম পড়ন্ত বিকেলের দিকে কাঁচা পেঁয়াজ ও শুকনা মরিচ চুলার আগুনে পুড়িয়ে, পান্তা ভাতে লবণ ও পানি মিশিয়ে খাচ্ছেন। আমি নিজেও দু-চারদিন এভাবে খাওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে আমার ভালো লাগত পান্তা ভাত, লবণ, পানি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে খেতে। ছোটবেলা থেকেই কাঁচা মরিচের ঝাল আমার খুব প্রিয়।

১৯৯৫-১৯৯৬ সালের দিকের কথা। বিকেলের দিকে ঘরের মেঝেতে বসে সাদা-কালো টিভি দেখছিলাম আর খাওয়ার জন্য থালার একপাশে পান্তা ভাত চাপিয়ে রেখে কাঁচা মরিচ ও লবণ দিয়ে ডলছিলাম। এভাবে অনেকগুলো মরিচ ডলতে দেখে দাদি ধমক দিয়ে বললেন, ‘ওই কত মরিচ ডলোস! চার গণ্ডা এ্যাটা অইছে। খাব্যের পারব্যি ন্যে, ঝালের জ্বালায়।’ অর্থাৎ লবণ-পানি মিশিয়ে এক প্লেট পান্তা ভাত খাওয়ার জন্য আমি ১৭টি কাঁচা মরিচ নিয়েছিলাম! এজন্যই দাদি বকছিলেন।

সকালের রান্না করা ভাত দুপুর পার হলে বা রাতে খাওয়ার পরে ভাতে পানি দিয়ে রাখলে সকালে ওই ভাতকে সাধারণত পান্তা ভাত বলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা পান্তা ভাত নয়—বরং বাসি ভাত বললেই সঠিক হয়। অবশ্য ভাতকে পান্তা ভাতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আর বাসি ভাতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটা কাছাকাছি। পান্তা ভাত প্রস্তুতের প্রক্রিয়া শুনেছিলাম আমার নানা শফিউদ্দিন বিশ্বাসের নিকট থেকে। যেটুকু মনে আছে, তাই বলার চেষ্টা করি।

ভাতের ভেতরে পানি ঢেলে দিলেই তা পান্তা ভাত হয় না। আবার গরমকাল ছাড়া শীতের দিনেও কখনো পান্তা ভাত হয় না। পান্তা ভাত শুধু গরমকালেই হয়ে থাকে। মাটির তইল্যেয় (হাঁড়িতে) কাঠের খড়ি, তুষ, ঘষি, বুন্দা বা গাছের শুকনো পাতা দিয়ে জ্বাল দিয়ে বিকেলের দিকে ভাত রান্না করা হয়। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত মাগরিবের পরপরই পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসে রাতের খাবার সম্পন্ন করে। কোনো কোনো দিন রান্নাকৃত ভাত খাওয়ার পর বেঁচে যায়। এই বেঁচে যাওয়া ভাত মাইটেলের (মাটির কলসি), কুয়ার বা টিউবওয়েলের পরিষ্কার পানি দিয়ে তইল্যের ভেতরেই ভিজিয়ে রাখা হয়। লক্ষ্য রাখতে হয়, ভাতে দেওয়া পানি যেন ভাতের একটু উপর পর্যন্ত থাকে। এ সময় তইল্যেকে সাধারণ ঢাকনা দিয়ে বা ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, ততক্ষণে এই ভাত আর গরম থাকে না, ঠান্ডা হয়ে যায়।

গরমের দিনগুলোতে রাত দীর্ঘ হয়। সারারাত প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা পানিতে ভেজানো থাকার পর সকালে এই ভাত পান্তা হয়ে যায়। এ সময় এটি থেকে হালকা টক স্বাদ ও সুগন্ধ আসে। কোনো কোনো পরিবার সকালে এই পান্তা খাওয়ার সময় ভেতরের পানি বদলে নতুন পানি মিশিয়ে খায়, আবার কেউ কেউ ওই পানির পান্তাই খেয়ে নেয়। শুধু পানি-পান্তা নয়, এর সাথে পোড়ানো শুকনা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, বেগুন ভর্তা, খোলায় ভাজা সরিষা বাটা, চিংড়ি বাটা, মাংস বা মাংসের ঝোল, মাছ রান্না বা ভাজা ইত্যাদি দিয়েও খাওয়া হয়। পান্তা যদি কম পড়ে, তবে এর সাথে মুড়ি মিশিয়েও খায় কেউ কেউ। বিচি কলা দিয়েও পান্তা খেতে দেখেছি। নানা বলতেন, ঘি ছাড়া পান্তা ভাতের সাথে সবই খাওয়া যায়। তবে একটি বিষয়—শুধু ভাত বাঁচলেই যে পান্তা করতে হয় এমনও নয়; কোনো কোনো সম্ভ্রান্ত বংশীয় পরিবার কখনো কখনো শখ করে পান্তা প্রস্তুত করত এবং আনন্দ-উৎসবের সাথে খেত।

আধুনিক সময়ে মানুষের ধারণা, আগের দিনে মানুষের বাসায় ফ্রিজ ছিল না, তাই পান্তা ভাত করতে হতো। আসলে তা নয়। ওই সময় ভাত বেঁচে গেলে পান্তা না করে এই বেঁচে যাওয়া ভাত দিয়ে আরও অনেক কিছু করা হতো। যেমন—রাতের এই বেঁচে যাওয়া ভাত সকালে হলুদ, লবণ ও অন্যান্য মসলা মিশিয়ে ভাত ভাজা করা হতো। এছাড়াও রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত পাটায় বেটে মরিচ-পেঁয়াজসহ অন্যান্য মসলা দিয়ে বড়া বানানো হতো।

তবে পান্তাকে অধিকাংশ সময় পান্তা হিসেবেই খাওয়া হতো; অন্য কিছু নয়।

 

েখক: প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

পান্তা আর বাসি ভাতের কথা

আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

আমি তখন খুব ছোট। বড় বোনের বড় ছেলে হিসেবে অথবা আমার নানাবাড়ির মা-খালা-মামাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম সন্তান হিসেবে মামা-খালারা আমাকে খুবই আদর-স্নেহ করতেন। পেয়ারা খালাম্মা আমাদের বাড়িতে অনেকদিন ছিলেন। এ সময় ওনাকে বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ধরনের আচার বানাতে দেখতাম। আচারগুলো খুবই সুস্বাদু ছিল। এছাড়া উনি হাতের কাজ জানতেন; কাপড়ে ফুলসহ বিভিন্ন নকশা আঁকতেন। তবে যে কারণে ওনার প্রসঙ্গ আসল, এবার সেটা বলি। ওনাকে প্রায়ই দেখতাম পড়ন্ত বিকেলের দিকে কাঁচা পেঁয়াজ ও শুকনা মরিচ চুলার আগুনে পুড়িয়ে, পান্তা ভাতে লবণ ও পানি মিশিয়ে খাচ্ছেন। আমি নিজেও দু-চারদিন এভাবে খাওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে আমার ভালো লাগত পান্তা ভাত, লবণ, পানি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে খেতে। ছোটবেলা থেকেই কাঁচা মরিচের ঝাল আমার খুব প্রিয়।

১৯৯৫-১৯৯৬ সালের দিকের কথা। বিকেলের দিকে ঘরের মেঝেতে বসে সাদা-কালো টিভি দেখছিলাম আর খাওয়ার জন্য থালার একপাশে পান্তা ভাত চাপিয়ে রেখে কাঁচা মরিচ ও লবণ দিয়ে ডলছিলাম। এভাবে অনেকগুলো মরিচ ডলতে দেখে দাদি ধমক দিয়ে বললেন, ‘ওই কত মরিচ ডলোস! চার গণ্ডা এ্যাটা অইছে। খাব্যের পারব্যি ন্যে, ঝালের জ্বালায়।’ অর্থাৎ লবণ-পানি মিশিয়ে এক প্লেট পান্তা ভাত খাওয়ার জন্য আমি ১৭টি কাঁচা মরিচ নিয়েছিলাম! এজন্যই দাদি বকছিলেন।

সকালের রান্না করা ভাত দুপুর পার হলে বা রাতে খাওয়ার পরে ভাতে পানি দিয়ে রাখলে সকালে ওই ভাতকে সাধারণত পান্তা ভাত বলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা পান্তা ভাত নয়—বরং বাসি ভাত বললেই সঠিক হয়। অবশ্য ভাতকে পান্তা ভাতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আর বাসি ভাতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটা কাছাকাছি। পান্তা ভাত প্রস্তুতের প্রক্রিয়া শুনেছিলাম আমার নানা শফিউদ্দিন বিশ্বাসের নিকট থেকে। যেটুকু মনে আছে, তাই বলার চেষ্টা করি।

ভাতের ভেতরে পানি ঢেলে দিলেই তা পান্তা ভাত হয় না। আবার গরমকাল ছাড়া শীতের দিনেও কখনো পান্তা ভাত হয় না। পান্তা ভাত শুধু গরমকালেই হয়ে থাকে। মাটির তইল্যেয় (হাঁড়িতে) কাঠের খড়ি, তুষ, ঘষি, বুন্দা বা গাছের শুকনো পাতা দিয়ে জ্বাল দিয়ে বিকেলের দিকে ভাত রান্না করা হয়। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত মাগরিবের পরপরই পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসে রাতের খাবার সম্পন্ন করে। কোনো কোনো দিন রান্নাকৃত ভাত খাওয়ার পর বেঁচে যায়। এই বেঁচে যাওয়া ভাত মাইটেলের (মাটির কলসি), কুয়ার বা টিউবওয়েলের পরিষ্কার পানি দিয়ে তইল্যের ভেতরেই ভিজিয়ে রাখা হয়। লক্ষ্য রাখতে হয়, ভাতে দেওয়া পানি যেন ভাতের একটু উপর পর্যন্ত থাকে। এ সময় তইল্যেকে সাধারণ ঢাকনা দিয়ে বা ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, ততক্ষণে এই ভাত আর গরম থাকে না, ঠান্ডা হয়ে যায়।

গরমের দিনগুলোতে রাত দীর্ঘ হয়। সারারাত প্রায় ১২-১৩ ঘণ্টা পানিতে ভেজানো থাকার পর সকালে এই ভাত পান্তা হয়ে যায়। এ সময় এটি থেকে হালকা টক স্বাদ ও সুগন্ধ আসে। কোনো কোনো পরিবার সকালে এই পান্তা খাওয়ার সময় ভেতরের পানি বদলে নতুন পানি মিশিয়ে খায়, আবার কেউ কেউ ওই পানির পান্তাই খেয়ে নেয়। শুধু পানি-পান্তা নয়, এর সাথে পোড়ানো শুকনা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, বেগুন ভর্তা, খোলায় ভাজা সরিষা বাটা, চিংড়ি বাটা, মাংস বা মাংসের ঝোল, মাছ রান্না বা ভাজা ইত্যাদি দিয়েও খাওয়া হয়। পান্তা যদি কম পড়ে, তবে এর সাথে মুড়ি মিশিয়েও খায় কেউ কেউ। বিচি কলা দিয়েও পান্তা খেতে দেখেছি। নানা বলতেন, ঘি ছাড়া পান্তা ভাতের সাথে সবই খাওয়া যায়। তবে একটি বিষয়—শুধু ভাত বাঁচলেই যে পান্তা করতে হয় এমনও নয়; কোনো কোনো সম্ভ্রান্ত বংশীয় পরিবার কখনো কখনো শখ করে পান্তা প্রস্তুত করত এবং আনন্দ-উৎসবের সাথে খেত।

আধুনিক সময়ে মানুষের ধারণা, আগের দিনে মানুষের বাসায় ফ্রিজ ছিল না, তাই পান্তা ভাত করতে হতো। আসলে তা নয়। ওই সময় ভাত বেঁচে গেলে পান্তা না করে এই বেঁচে যাওয়া ভাত দিয়ে আরও অনেক কিছু করা হতো। যেমন—রাতের এই বেঁচে যাওয়া ভাত সকালে হলুদ, লবণ ও অন্যান্য মসলা মিশিয়ে ভাত ভাজা করা হতো। এছাড়াও রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত পাটায় বেটে মরিচ-পেঁয়াজসহ অন্যান্য মসলা দিয়ে বড়া বানানো হতো।

তবে পান্তাকে অধিকাংশ সময় পান্তা হিসেবেই খাওয়া হতো; অন্য কিছু নয়।

 

েখক: প্রাবন্ধিক।