"সত্য উদ্ঘাটন ও প্রকাশই সাংবাদিকের প্রধান কাজ।" — সিমুর হার্শ, পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদক, নিউ ইয়র্ক টাইমস।
বিবেকের জাগরণ আর আমাদের ঘুমপাড়ানি গল্প
- আপডেট সময় : ১০:২৪:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
- / 32
১.
নৃবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার হিল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড টার্নড আপসাইড ডাউন: র্যাডিক্যাল আইডিয়াস ডিউরিং দ্য ইংলিশ রেভোলিউশন’-এর ভূমিকায় দেখিয়েছেন—১৬৪০ খ্রিস্টাব্দ ও তার পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট যে জনসমর্থন পেয়েছিল, তার সিংহভাগ সুফল ভোগ করেছে মূলত ভূস্বামী ও বণিকেরা। সমাজের প্রান্তিক নিম্নবর্গের মানুষের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। সমকালীন ‘নরক ও পাপ বিষয়ক’ সামাজিক ধারণা থেকে জানা যায়, যখন জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে একদল মানুষ সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং বাকিরা অধিকারবঞ্চিত হয়ে গৃহভৃত্যে পরিণত হয়, ঠিক তখন থেকেই মানুষের নৈতিক পতন শুরু।
সাধারণ মানুষ একসময় বুঝতে পারে—দরিদ্র ও মেহনতি জনতার কাছ থেকে চুরি করা ধনীর সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্যই মূলত তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রশক্তি, সেনাবাহিনী, আইন-আদালত, জেলখানা আর ফাঁসির কাঠ। আর এগুলো দিয়েও যখন জনরোষ সামাল দেওয়া যায় না, তখন লেলিয়ে দেওয়া হয় পেটোয়া ও ভাড়াটে খুনি বাহিনী। এসবের একমাত্র উদ্দেশ্য—ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ ও সম্পদের মালিকানা রক্ষা ও বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে শোষণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা যেকোনো প্রতিবাদ, চিন্তন ও দার্শনিকের মুক্ত ভাবনাকে নির্মমভাবে দমন করা।
আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর কালজয়ী ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে লিখেছেন:
“কোটি কোটি বাঙালি হাজার বছর ধরেই এক্সপ্লয়েটেড (শোষিত) হয়ে আসছে। মোঘল, পাঠান, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, ইংরেজ বা পাকিস্তানি শাসকেরা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে শাসন ও শোষণ করেছে। কিন্তু বাঙালি যখন নিজেই নিজের দেশের শাসক হবে, তখনও কি এই শোষণ বন্ধ হবে?”
ইলিয়াসের অমোঘ প্রশ্ন ছিল—বাঙালি সেনাবাহিনী হলেই কি বাঙালি মুক্তি পাবে? তখন বাঙালিই চেপে বসবে আরেক বাঙালির ওপর। নিজের জাত ছাড়া সে আর কার ওপর ক্ষমতা দেখাবে? পাকিস্তানি সৈন্যের উর্দু গালি শুনতে গায়ে লাগে; কিন্তু বাঙালি কর্নেল সাহেব যদি বাংলা ভাষায় কদর্য গালি দেন, তবে কি আমরা পরম আহ্লাদে তাঁর পা জড়িয়ে ধরে বলব—’আহা, আ মরি বাংলা ভাষা!’
ইংরেজদের বিদায়ের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও তাদের পূর্বসূরিদের মতোই একচেটিয়া আধিপত্য, শোষণ, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছিল। তৎকালীন দেশের সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছিল ২২টি পরিবার। আবেগতাড়িত বাঙালি ধর্মের ভিত্তিতে একটি পৃথক রাষ্ট্র পেলেও, সেটি যে মোটেও স্বাধীন ছিল না—তা বুঝতে তাদের সময় লাগেনি। ফলশ্রুতিতে, শোষকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যদিও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকেরা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে তাদের ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল।
বলতে দ্বিধা নেই, সে সময়েও পাকিস্তানি শাসকদের সাথে হাত মিলিয়েছিল এ দেশেরই একদল সুবিধাভোগী ও ক্ষমতালোভী শ্রেণী। তারা যেমন বুদ্ধিজীবী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের নিধনে ঘাতকদের সহায়তা করেছিল, মা-বোনদের সম্ভ্রম বিকিয়ে দিয়ে দালালি করেছিল; তেমনি স্বাধীনতার পরেও আমরা ক্ষমতার অলিন্দে থাকা সম্পদশালী সমাজপতিদের একইভাবে লুম্পেন ও লুটেরা হয়ে উঠতে দেখেছি। কারণ, শোষক ও দালালরা এ দেশের মাটির ভেতরেই রয়ে গেছে। তারা জমিতে আছে, রাস্তায় আছে, কলকারখানায় আছে, অফিস-আদালতে আছে, এমনকি সমাজ ও রাজনীতিতেও মিশে আছে।
ফলে, একসময় যিনি জোটবদ্ধ জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে ‘দেশপ্রেমিকের সনদ’ পেয়েছিলেন, আজ তিনিই হয়তো সবচেয়ে বড় শোষক বা জনতার শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আর অতীতে পাওয়া সেই দেশপ্রেমিকের সনদটিই এখন তাঁর অপকর্ম ঢাকার প্রধান হাতিয়ার।
এটি সম্ভব হয়েছে কারণ, এ দেশে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য করা হয়েছে শোষণ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও স্থায়ী করার জন্য, জনগণের কল্যাণ সেখানে গৌণ। ক্ষমতাসীনদের প্রধান আগ্রহ ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’ যেন তাদের ব্যক্তিগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত করা হয়। আর এ কারণে অন্য পক্ষের কাছে রাষ্ট্র একটি দানবীয় ব্যাপার।
এভাবেই তারা প্রান্তিক মানুষের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে উল্টো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও নগ্ন হস্তক্ষেপ করতে পারছে । এই অপরাধীদের হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
২.
সমাজবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন:
“খ্রিস্টপূর্ব প্রায় চার শতাব্দী আগে দার্শনিক সক্রেটিসকে যে কারণে হেমলক বিষ পানে মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য করেছিল তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র; ঠিক একই কারণে আজও রাষ্ট্রশক্তির হাতে বহু মানুষকে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।”
এ থেকে স্পষ্ট যে, হাজার বছর আগে রাষ্ট্রযন্ত্র শোষক ও নিপীড়ক গোষ্ঠীর যে হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, আজও তার চারিত্রিক কোনো বদল হয়নি। বিশ্ব আজও মানুষের জন্য অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। মানুষকে প্রতিনিয়ত এক অজানা আশঙ্কার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেছি, তাতে এটি পরিস্কার যে—একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে তৈরিই করা হয়েছিল বিনা বিচারে মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব নিখোঁজ ও খুনের বিষয়ে যখন সাধারণ মানুষের গোচরে এসেছে, তখন রাষ্ট্রের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা কোন অংশ সেই অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে তৎপর। যা একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম অশনিসংকেত।
৩.
ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—মিথ্যার দেয়াল তুলে কিংবা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে কোনো শোষক গোষ্ঠীই চিরকাল তাদের মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারেনি। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে নিজেই ভীতি উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ভেতরের সামাজিক চুক্তিটি ভেঙে পড়ে। গুম, খুন আর বিচারহীনতা কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থার লক্ষণ নয়; বরং তা রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষকে সাময়িকভাবে ‘উন্নয়ন’ কিংবা ‘নিরাপত্তার’ ঘুমপাড়ানি গল্প শুনিয়ে বিভোর রাখা যায়, কিন্তু চিরকালের জন্য তাদের বিবেককে বন্দি করা যায় না।
আজকের এই ক্রান্তিকালে আমাদের বোবা হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সক্রেটিসকে বিষ খাইয়ে মারলেও তাঁর দর্শনকে যেমন মুছে ফেলা যায়নি, তেমনি সত্য প্রকাশের কণ্ঠরোধ করে সত্যকে কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। সিমুর হার্শের সেই অমোঘ বাণীর মতোই—সত্যের উদঘাটন আজ আমাদের করতেই হবে। ঘুমপাড়ানি গল্পের মোহ থেকে জেগে উঠে আমাদের নিজেদের বিবেককে জাগ্রত করার সময় এসেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে মনে করিয়ে দিতে হবে, সে কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা ধনিক শ্রেণীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়; বরং এই ভূখণ্ডের প্রতিটি নগ্নপদের মেহনতি মানুষের রক্ত ও ঘামে তৈরি এক আমানত। যেদিন ক্ষমতার দম্ভ ছেড়ে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের এই সত্যটি উপলব্ধি করবে, সেদিনই কেবল একটি প্রকৃত স্বাধীন ও মানবিক সমাজের জন্ম হবে। অন্যথায়, ইতিহাসের আবর্তে আরও একটি পতনের গল্প তৈরি হওয়া কেবল সময়ের ব্যবধান মাত্র।













