গৌরবের ১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশের অস্তিত্বের আঁতুরঘর
- আপডেট সময় : ০৩:০৭:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / 27
প্রতিবছর ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালিত হয়। এই বিশেষ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই বিদ্যাপীঠের গৌরবময় যাত্রার কথা। ২০০৫ সালে ফরিদপুর মুসলিম মিশন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। সে সময় ঢাকায় আমার কোনো পরিচিতজন না থাকায় ভর্তি পরীক্ষার দিন শাহবাগের একটি ফুলের দোকানে ব্যাগ রেখে কলাভবনের ২২৫ নং কক্ষে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হতে পারার আনন্দ ছিল বাঁধভাঙা। কিন্তু ক্যাম্পাসে আসার পর এক অথই সাগরে পড়ে গেলাম। হলে সিট না পাওয়া, আবাসিক সংকট এবং সেই সময়ের লেজুরবৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির বেড়াজালে আটকা পড়ে জীবন যেন থমকে গিয়েছিল।
ফরিদপুরের এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় শহীদুল্লাহ হলের ৩২৭ নং কক্ষে গেস্ট হিসেবে মানবেতর জীবন শুরু করি। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত জসীমউদ্দীন হলের গেস্টরুমে ছাত্রনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। তিন মাস এভাবে চলার পর শেষ পর্যন্ত জসীমউদ্দীন হলের ৪২৫ নং কক্ষে থাকার সুযোগ পাই। শুরু হয় আমার জীবনযুদ্ধ। প্রফেসর এম এ সামাদের সৌজন্যে তমদ্দুন মজলিসে পার্টটাইম কাজ শুরু করি। সেই উপার্জনে নিজের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে মায়ের জন্য টাকা পাঠাতাম। ছুটিতে বাড়ি ফেরার খবর পেলে মা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন আমাকে দেখার অপেক্ষায়। সেই আবেগ ছিল পরম প্রাপ্তির। তবে কর্মজীবনে প্রবেশের মাত্র দুই বছরের মাথায় মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। মায়ের সেই স্মৃতি এখনো আমাকে ব্যথিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণায় আজও আমার জীবনের অসংখ্য স্মৃতি মিশে আছে।
এ বছর ১০৬ বছরে পদার্পণ করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দেশের জ্ঞান, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে এই বিদ্যাপীঠ। যদিও ঐতিহ্যের ধারক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মহিমা বর্তমানে কিছুটা ম্লান হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। শুরুর দিকে জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান ও সামাজিক গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রগণ্য। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অবদান। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ২০২৪ সালের সরকার পতন—সব ঐতিহাসিক পট পরিবর্তনের সূতিকাগার এই ক্যাম্পাস। তাই বলাই যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাঙালির আত্মবিকাশ ও অস্তিত্বের আঁতুরঘর।
তবে ১০৬ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হলো, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়েছে। বিভাগ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি এখন দলীয় লেজুরবৃত্তির বৃত্তে আটকা পড়েছে। এছাড়া নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও নিয়মিত শোনা যায়। আবাসন সংকট, শ্রেণিকক্ষের অভাব এবং হলের খাবারের নিম্নমান শিক্ষার্থীদের জন্য এক চিরস্থায়ী দুর্ভোগ। হলগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য ও শিক্ষার্থীদের নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের পুরনো সমস্যা। এসবের সমাধান বা কার্যকর উদ্যোগ সেভাবে চোখে পড়ে না।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আজও বড় ভরসার জায়গা। স্বল্প খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকায় এটি এখনো অনেকের স্বপ্নের ঠিকানা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রতিকূলতার পাহাড় টপকে যারা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়, তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকতর সফল ও টেকসই অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। কারণ, এই ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের লড়াই করা শেখায়।
পরিশেষে প্রত্যাশা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও গবেষণাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত আশ্রয়স্থল হয়ে উঠুক। শিক্ষার্থীরা চায় আধুনিক ল্যাব, যুগোপযোগী পাঠদান, মানসম্মত আবাসন ও পর্যাপ্ত বাজেট। ক্যাম্পাসে রাজনীতির ভীতির বদলে জ্ঞানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হোক। গেস্টরুমের বদলে গ্রন্থাগার হোক শিক্ষার্থীদের প্রধান নির্ভরতার জায়গা। এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও এশিয়া তথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় নিজের আসন সুদৃঢ় করবে।










