কানের দুল বিক্রির টাকায় বাজিমাৎ আফরোজা বেগমের
কেঁচোসার উৎপাদনে ভাগ্যবদল
- আপডেট সময় : ০৮:৪৭:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- / 52
টাকার অভাবে ছেলের নবম শ্রেণীর রেজিস্ট্রেশন করতে না পেরে নিজের পালিত ছাগলটি বিক্রি করতে হয়েছিল। সেই চরম অভাব আর অসহায়ত্বের দিনগুলোই বদলে দিয়েছে ফরিদপুরের আফরোজা বেগমের জীবন। ঘুরে দাঁড়ানোর তীব্র জেদ থেকে নিজের কানের দুল বিক্রি করে শুরু করেছিলেন ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ বা কেঁচো সার উৎপাদন। আর তাতেই বাজিমাত! মাত্র দুই বছরে সমস্ত বাধা আর সামাজিক কটূক্তি পেরিয়ে আফরোজা এখন একজন সফল ও স্বাবলম্বী নারী উদ্যোক্তা।
ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের আইনুদ্দিন মোল্লার ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা আফরোজা বেগম। আজ শুধু নিজেই স্বাবলম্বী নন, তাঁর দেখাদেখি এলাকার অনেক নারীই এখন ঝুঁকছেন এই পরিবেশবান্ধব সার উৎপাদনে।
ইউটিউব থেকে উদ্যোক্তা
অভাবের সংসারে কিছু একটা করার তাড়না থেকে আফরোজা প্রথমে ইউটিউবে কেঁচো সার উৎপাদনের ভিডিও দেখেন। পরে ফরিদপুরের শোভারামপুরের সফল খামারি তানিয়া বেগমের প্রজেক্ট সরাসরি পরিদর্শনে যান। উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের কানের দুল বিক্রির জমানো টাকা দিয়ে দুটি হাউজ নিয়ে কাজ শুরু করেন।
শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। আফরোজা বেগম বলেন, গোবর আর কেঁচো নিয়ে কাজ করি বলে এলাকার মানুষ প্রথম প্রথম আমার সাথে ঠিকমতো কথাও বলত না। অনেকে আমাকে দেখে নাকে হাত দিয়ে পাশ কেটে চলে যেত। কিন্তু আমি দমে যাইনি। জানতাম, সততার সাথে কষ্ট করলে সাফল্য আসবেই।
যেভাবে তৈরি হয় ‘ভার্মি কম্পোস্ট’
দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিতে আজ আফরোজার বাড়ির পেছনে তৈরি হয়েছে বড় আকারের ৬টি হাউজ। প্রতিটি হাউজে ৪৫ মণ গোবর, শাকসবজির উচ্ছিষ্টাংশ ও কলাগাছের টুকরোর মিশ্রণ দিয়ে ২৫ কেজি কেঁচো ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর চটের বস্তা দিয়ে এক মাস ঢেকে রাখলেই তৈরি হয়ে যায় মূল্যবান জৈব সার।
বর্তমানে এই খামার থেকে প্রতি মাসে ৫-৬ টন সার উৎপাদিত হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি সার খুচরা ১৫ টাকা এবং পাইকারি ১২ টাকা দরে বিক্রি হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে আফরোজার প্রতি মাসে নিট লাভ থাকছে প্রায় ১ লাখ টাকা। স্ত্রীর এই সাফল্যে চার মাসের মাথায় প্রবাস জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছেন স্বামী চুন্নু শেখ। এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুজনে মিলে সামলাচ্ছেন খামার।
আফরোজার খামারের এক নজরে হিসাব:
-
হাউজ সংখ্যা: ৬টি বড় আকারের হাউজ
-
মাসিক উৎপাদন: ৫ থেকে ৬ টন সার
-
বিক্রয় মূল্য: খুচরা ১৫ টাকা, পাইকারি ১২ টাকা (প্রতি কেজি)
-
মাসিক আয় (নিট লাভ): প্রায় ১,০০,০০০ টাকা
এলাকায় ঘুচেছে বেকারত্ব
আফরোজার এই উদ্যোগে এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। খামারে কর্মরত রুহুল আমিন নামের এক যুবক বলেন, এখানে প্রতিদিন কাজ করে ১ হাজার টাকা পাই। মাস শেষে ৩০ হাজার টাকা আয় দিয়ে পরিবার নিয়ে খুব ভালো আছি।
অন্যদিকে, রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব ও চড়া দামের কারণে স্থানীয় কৃষকদের কাছেও এই সার এখন দারুণ জনপ্রিয়। স্থানীয় চাষি শাহিন শেখ জানান, রাসায়নিক সারের চেয়ে এই কেঁচো সারের দাম অনেক কম। এটি ব্যবহারে জমির উর্বরতা ও ফলন দুই-ই বাড়ে। আমরা এখন আফরোজার বাড়ি থেকেই নিয়মিত সার নিয়ে জমিতে ব্যবহার করছি।
পরবর্তী লক্ষ্য বায়োগ্যাস প্লান্ট
ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে উদ্যোক্তা আফরোজা বেগম জানান, সারের চাহিদা থাকায় তিনি দিন দিন উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। তবে খামারটি আরও বড় করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “সরকার যদি আমাকে একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে সহায়তা করে, তবে আমি খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে সহজ উপায়ে রান্নার গ্যাস সরবরাহ করতে পারব।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, রাসায়নিক সারের অতি ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমছে। সেখানে এই পরিবেশবান্ধব কেঁচো সার মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ও শক্তি বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এই সার উৎপাদন ও বিপণনে সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
ফরিদপুরে দিন দিন পরিবেশবান্ধব এই সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।










