Bangladesh ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় ও পুনরুজ্জীবিত।

ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক রাজধানী ফরিদপুরের সমৃদ্ধ স্মৃতিকথা

অগ্নিপ্রহর প্রতিবেদন
  • আপডেট সময় : ০৭:১৬:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • / 47

প্রথম ছবিতে ফরিদপুর শহরের অম্বিকা হলের সাবেক ভবন এবং পাশের ছবিতে লেখক মাজেদুর রহমান। ছবি- অগ্নিপ্রহর

ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় ও পুনরুজ্জীবিত। সেই সোনালী সময়ে পাড়া মহল্লায় সংগীতানুষ্ঠান, খেলাধুলা, আনন্দ আর সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির এক অপূর্ব সহাবস্থান ছিল। সম্প্রতি আমেরিকা প্রবাসী মাজেদুর রহমান এক আবেগঘন স্মৃতিচারণে তৎকালীন ফরিদপুরের সেই গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। তার সেই স্মৃতিকথা অবলম্বনে ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি পূর্ণাঙ্গ খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, সেই সময়ে ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল প্রাণবন্ত। ষাটের দশকের আগে থেকেই অম্বিকা হলের অনুষ্ঠানে তৎকালীন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল কবির খানের গান এবং তার সাথে তবলায় সংগত করেছিলেন সবার প্রিয় ‘লালু ভাই’ খ্যাত লালে খান। সে সময় ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি মরহুম লিয়াকত হোসেন ভাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে প্রাণিত করতেন। কলকাতায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, আলপনা, লতা মঙ্গেশকর, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের নতুন গানের রেকর্ড পুজোর সময় প্রকাশিত হওয়ামাত্রই তা ফরিদপুরে পাওয়া যেতো এবং এখানকার শিল্পীরা অনুষ্ঠানে গাইতেন। এছাড়া প্যারাডাইস ক্লাবের সামনে পূজার পরের অনুষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি কোলকাতা থেকে আসা অতিথিরাও অংশ নিতেন।

অরোরা মিউজিক্যাল ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তৎকালীন ফরিদপুরে গান শেখার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছিল কিরণ বালা বসুর (কিরণ দি) ‘অরোরা মিউজিক্যাল’। এই স্কুল থেকে দোদুল, শামিমা, খুকু, এমিলি ও নিলুফারের মতো বহু গুণী শিল্পী তৈরি হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে গান শেখাতেন আলী ইমাম, সেলিম ও পান্না। অন্যদিকে, পবিত্র ভট্টাচার্য (খোকন দা) নাচ শেখাতেন এবং তার চমৎকার গীতিনাট্য দারুণ প্রশংসিত হতো। পরবর্তীতে ডিসি মুয়ীদ চৌধুরী শিল্পকলা একাডেমি সৃষ্টি করেন।

মাজেদুর রহমান তৎকালীন ফরিদপুরের যে সব প্রতিভাবান শিল্পীদের কথা স্মরণ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, এ. মজিদ খান ওরফে বাবু ভাই, যিনি চমৎকার গাইতেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা গিয়ে চলচ্চিত্রের শব্দগ্রাহক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ছিলেন অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী আলী ইমাম, যিনি ওস্তাদ সাদমানী সাহেবের সাথে ‘মিউজিক্যাল অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে নিউ ইয়র্কে গান শেখাচ্ছেন। দীপক ঘোষ ওরফে দীপু দা গান, নাচ ও নাটকে পারদর্শী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে কোলকাতায় গিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমারের সহকারী হন। ময়েজ মনজিলের বাবু চৌধুরীকে তিনি দীপক ঘোষের সাথে নাচতে দেখেছিলেন।

সুধাময় ঘোষ ছিলেন সতীনাথের মতো কণ্ঠের অধিকারী, যিনি ডা. জিতেন বাবুর মেয়ে ‘সাগতা’কে গান শেখাতেন। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সেলিম মজুমদার, পান্না (যার বাবা নুরুদ্দীন আহমেদ জাসু মিয়া ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী), অশোক দা’র (মন্টু দা) বোন তাপশের পিসি, অন্ধ শিল্পী তোথা (যিনি রেডিওতে গাইতেন) এবং বর্তমান সময়ের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও টিভি শিল্পী লবী আপা (জেল সুপারের মেয়ে) এবং সুলতানা আশরাফী বহিরাগতদের মধ্যে কলেজের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন।

সেসময়ে রাজেন্দ্র কলেজের ৮ নম্বর বড় রুমে নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। কলেজের শিল্পীদের মধ্যে আলী ইমাম, সেলিম মজুমদার, পান্না, কনক, জহুর, ফখরু, নিলু, পুলক (গিটার), জাসু এবং মেয়েদের মধ্যে কহিনুর বেগম, রওশন রব্বানী, শীপ্রাদী, নিলুফার, আভাদী, নমিতা প্রমুখ নিয়মিত অংশ নিতেন। সব অনুষ্ঠানে তবলায় সংগত করতেন মনা দা, করুণা অধিকারী এবং আরও একজন।

এছাড়া, বাস মালিক মালিক সিরাজ ভাইয়ের গণসংগীত এবং ব্যবসায়ী রহিম মিয়ার ম্যানেজার জলিল ভাই—যাঁর গলা ছিল তালাত মাহমুদের মতো, তাঁদের পরিবেশনা দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

জলিল ভাইকে এরপর আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দেন মাজেদুর রহমান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে গজল আর হিন্দি গান দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেত, চারদিক থেকে ভেসে আসত অজস্র প্রশংসা। সেই সাফল্যের রেশ ধরেই তাঁরা কলেজের অনুষ্ঠানগুলোকে চার দেয়ালের বাইরে—উন্মুক্ত মঞ্চে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, আমাদের প্রথম প্রয়াস ছিল কলেজের গাড়ি বারান্দায় ‘বর্ষবরণ’ উৎসব। জহুরকে সঙ্গে নিয়ে এবার একেবারে নতুন কিছু করার পরিকল্পনায় মাতলাম। পুরো স্টেজ অন্ধকার করে, ব্যাকগ্রাউন্ডে আলোর খেলা দিয়ে তৈরি করা হলো এক মায়াবী ছায়ানাট্য। সেই আলো-ছায়ার ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠল বাংলার ষড়ঋতু—কখনও বৈশাখী ঝড়, কখনও রিমঝিম বৃষ্টি, আবার কখনও বা শান্ত নদীতে বয়ে চলা নৌকা। গীতিআলেখ্য আর অভিনয়ের এমন যুগলবন্দী দর্শকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, চারদিকে প্রশংসার ধুম পড়ে গেল।

এই সাফল্য আমাদের সাহস আরও বাড়িয়ে দিল। এরপর কলেজের সদ্য নির্মিত শহীদ মিনারের পাদদেশে, একুশে ফেব্রুয়ারির সেই আবেগঘন রাতে আমরা আবারও একই পন্থায় ছায়ানাট্যের আয়োজন করলাম। অন্ধকার রাতে আলো-ছায়ার সেই গম্ভীর আর মর্মস্পর্শী উপস্থাপনা ভাষা দিবসের চেতনাকে যেন আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। আগের মতোই, এই অনুষ্ঠানটিও দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবনায় তখন নতুন কিছু করার জোয়ার। সেই ভাবনা থেকেই আমরা রামকৃষ্ণ মিশনের আমবাগানে আয়োজন করলাম রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর। তবে কোনো কৃত্রিম স্টেজ নয়, একেবারে প্রকৃতির কোলে। গাছের গুড়ি কেটে বানানো হলো বেদী, যেখানে শিল্পীরা আসন নিলেন। আর দর্শকদের বসার জন্য মাটিতে বিছিয়ে দেওয়া হলো ফরাশ।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, স্বয়ং পল্লীকবি জসীম উদদীন অনুষ্ঠানস্থলে পা রাখলেন। চারপাশের এই প্রাকৃতিক আর নান্দনিক পরিবেশ দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ আর অবাক হয়েছিলেন যে, ঢুকেই বলে উঠলেন—”তোমরা তো দেখি আস্ত একটা শান্তিনিকেতন বানিয়ে ফেলেছো!” কবির সেই একটি বাক্যই আমাদের সমস্ত পরিশ্রমকে এক মুহূর্তে সার্থক করে তুলেছিল।

ছকভাঙা এই অনুষ্ঠানটি সে সময় পুরো শহরে এক তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চারদিকে এত কথা হচ্ছিল যে, তৎকালীন খবরের কাগজগুলোতেও আমাদের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসের খবর ফলাও করে ছাপা হলো।

তখনকার দিনে প্রতি বছর শীতের সময়ে সিনেমা হলে বসত সাত দিনব্যাপী এক জমজমাট নাট্যোৎসব। সংস্কৃতির সেই সোনালী সময়ে টাউন থিয়েটারের সেক্রেটারি ছিলেন কিরণ লাহিড়ী । শুধু সংগঠক হিসেবেই নন, সুরের জগতেও তাঁর ছিল দারুণ দখল; চমৎকার ভায়োলিন বাজাতেন তিনি। শীতের নিস্তব্ধ মাঝরাতে প্রায়শই তাঁর বাসা থেকে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসত, যা রাতের নীরবতাকে এক মায়াবী রূপ দিত। আরেকজন ছিলেন রাধাগোবিন্দ সাহা, তিনিও অসম্ভব সুন্দর এস্রাজ বাজাতেন।

মায়া ভাদুরী, উমা ও শুক্লা চমৎকার নাচতেন। ঝিলটুলীর ফজলু মিয়া অসাধারণ বাঁশি বাজাতেন এবং রাজবাড়ীর বামুন দাস বাজাতেন জলতরঙ্গ। নাট্যাঙ্গনে মহি ভাই, ডা. ননী বাবু, এম. এ. মতিন, অনিল কুণ্ডু, সুধীর চক্রবর্তী, দ্বিজেন বাবু, জামিনী লাহিড়ী (শাহজাহান চরিত্রে বিখ্যাত), টগর, দীপুদা, তন্দ্রা ও নমিতা দাপটের সাথে অভিনয় করতেন। ‘রুমীর বৈশাখী’ ও ‘ফরিদের সুনীয়ম’-এর মতো নাট্যদলগুলো প্রতি রোববার টিকিট বিনিময়ের মাধ্যমে জসীমউদ্দীন হলে নাটক মঞ্চস্থ করতো।

এছাড়া মেলায় রত্নেশ্বরের যাত্রাভিনয় (ভাওয়াল সন্ন্যাসী) এবং গ্রামাঞ্চলে হালিম বয়াতি, রহমান বয়াতি ও হাজেরা বিবির বিচার গান তৎকালীন ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে রেখেছিল। মাজেদুর রহমানের এই স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে, ষাটের দশকের ফরিদপুর ছিল প্রকৃত অর্থেই এক প্রগতিশীল ও শিল্পমনস্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী।

দ্রষ্টব্য: লেখক মাজেদুর রহমান ফরিদপুরের একসময়ের খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও সাবেক ব্যাংকার। শহরের চরকমলাপুর মহল্লার এই সন্তান বর্তমানে আমেরিকার নিউইয়র্ক প্রবাসী। তিনি বিভিন্ন সময়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন পরিমণ্ডলের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে নিখুঁত বর্ণনায়

স্মৃতিচারণমুলক লেখালেখি করেন। যা পাঠকমহলে খুবই সমাদৃত হয়ে এসেছে। মাঝখানের সময়ে কিছুদিনের বিরতির পরে স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাতে তিনি ফেসবুকে তাঁর নিজস্ব প্রোফাইলে ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ পোস্ট করেন। তাঁর সেই লেখার ঈষৎ পরিমার্জন করে দৈনিক অগ্নিপ্রহরের পাঠকের জন্য এই প্রতিবেদনটিতে তাঁর সেই বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

 

 

শেয়ার করুন

ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় ও পুনরুজ্জীবিত।

ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক রাজধানী ফরিদপুরের সমৃদ্ধ স্মৃতিকথা

আপডেট সময় : ০৭:১৬:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় ও পুনরুজ্জীবিত। সেই সোনালী সময়ে পাড়া মহল্লায় সংগীতানুষ্ঠান, খেলাধুলা, আনন্দ আর সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির এক অপূর্ব সহাবস্থান ছিল। সম্প্রতি আমেরিকা প্রবাসী মাজেদুর রহমান এক আবেগঘন স্মৃতিচারণে তৎকালীন ফরিদপুরের সেই গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক দিনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। তার সেই স্মৃতিকথা অবলম্বনে ষাটের দশকের ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি পূর্ণাঙ্গ খণ্ডচিত্র পাওয়া যায়।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, সেই সময়ে ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল প্রাণবন্ত। ষাটের দশকের আগে থেকেই অম্বিকা হলের অনুষ্ঠানে তৎকালীন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল কবির খানের গান এবং তার সাথে তবলায় সংগত করেছিলেন সবার প্রিয় ‘লালু ভাই’ খ্যাত লালে খান। সে সময় ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সভাপতি মরহুম লিয়াকত হোসেন ভাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে প্রাণিত করতেন। কলকাতায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ, শ্যামল মিত্র, মান্না দে, আলপনা, লতা মঙ্গেশকর, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের নতুন গানের রেকর্ড পুজোর সময় প্রকাশিত হওয়ামাত্রই তা ফরিদপুরে পাওয়া যেতো এবং এখানকার শিল্পীরা অনুষ্ঠানে গাইতেন। এছাড়া প্যারাডাইস ক্লাবের সামনে পূজার পরের অনুষ্ঠানগুলোতে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি কোলকাতা থেকে আসা অতিথিরাও অংশ নিতেন।

অরোরা মিউজিক্যাল ও শিক্ষা-সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, তৎকালীন ফরিদপুরে গান শেখার স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছিল কিরণ বালা বসুর (কিরণ দি) ‘অরোরা মিউজিক্যাল’। এই স্কুল থেকে দোদুল, শামিমা, খুকু, এমিলি ও নিলুফারের মতো বহু গুণী শিল্পী তৈরি হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে গান শেখাতেন আলী ইমাম, সেলিম ও পান্না। অন্যদিকে, পবিত্র ভট্টাচার্য (খোকন দা) নাচ শেখাতেন এবং তার চমৎকার গীতিনাট্য দারুণ প্রশংসিত হতো। পরবর্তীতে ডিসি মুয়ীদ চৌধুরী শিল্পকলা একাডেমি সৃষ্টি করেন।

মাজেদুর রহমান তৎকালীন ফরিদপুরের যে সব প্রতিভাবান শিল্পীদের কথা স্মরণ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, এ. মজিদ খান ওরফে বাবু ভাই, যিনি চমৎকার গাইতেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা গিয়ে চলচ্চিত্রের শব্দগ্রাহক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ছিলেন অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী আলী ইমাম, যিনি ওস্তাদ সাদমানী সাহেবের সাথে ‘মিউজিক্যাল অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্তমানে নিউ ইয়র্কে গান শেখাচ্ছেন। দীপক ঘোষ ওরফে দীপু দা গান, নাচ ও নাটকে পারদর্শী ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে কোলকাতায় গিয়ে মহানায়ক উত্তম কুমারের সহকারী হন। ময়েজ মনজিলের বাবু চৌধুরীকে তিনি দীপক ঘোষের সাথে নাচতে দেখেছিলেন।

সুধাময় ঘোষ ছিলেন সতীনাথের মতো কণ্ঠের অধিকারী, যিনি ডা. জিতেন বাবুর মেয়ে ‘সাগতা’কে গান শেখাতেন। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সেলিম মজুমদার, পান্না (যার বাবা নুরুদ্দীন আহমেদ জাসু মিয়া ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী), অশোক দা’র (মন্টু দা) বোন তাপশের পিসি, অন্ধ শিল্পী তোথা (যিনি রেডিওতে গাইতেন) এবং বর্তমান সময়ের প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও টিভি শিল্পী লবী আপা (জেল সুপারের মেয়ে) এবং সুলতানা আশরাফী বহিরাগতদের মধ্যে কলেজের অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন।

সেসময়ে রাজেন্দ্র কলেজের ৮ নম্বর বড় রুমে নিয়মিত অনুষ্ঠান হতো। কলেজের শিল্পীদের মধ্যে আলী ইমাম, সেলিম মজুমদার, পান্না, কনক, জহুর, ফখরু, নিলু, পুলক (গিটার), জাসু এবং মেয়েদের মধ্যে কহিনুর বেগম, রওশন রব্বানী, শীপ্রাদী, নিলুফার, আভাদী, নমিতা প্রমুখ নিয়মিত অংশ নিতেন। সব অনুষ্ঠানে তবলায় সংগত করতেন মনা দা, করুণা অধিকারী এবং আরও একজন।

এছাড়া, বাস মালিক মালিক সিরাজ ভাইয়ের গণসংগীত এবং ব্যবসায়ী রহিম মিয়ার ম্যানেজার জলিল ভাই—যাঁর গলা ছিল তালাত মাহমুদের মতো, তাঁদের পরিবেশনা দর্শক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

জলিল ভাইকে এরপর আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দেন মাজেদুর রহমান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে গজল আর হিন্দি গান দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেত, চারদিক থেকে ভেসে আসত অজস্র প্রশংসা। সেই সাফল্যের রেশ ধরেই তাঁরা কলেজের অনুষ্ঠানগুলোকে চার দেয়ালের বাইরে—উন্মুক্ত মঞ্চে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, আমাদের প্রথম প্রয়াস ছিল কলেজের গাড়ি বারান্দায় ‘বর্ষবরণ’ উৎসব। জহুরকে সঙ্গে নিয়ে এবার একেবারে নতুন কিছু করার পরিকল্পনায় মাতলাম। পুরো স্টেজ অন্ধকার করে, ব্যাকগ্রাউন্ডে আলোর খেলা দিয়ে তৈরি করা হলো এক মায়াবী ছায়ানাট্য। সেই আলো-ছায়ার ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠল বাংলার ষড়ঋতু—কখনও বৈশাখী ঝড়, কখনও রিমঝিম বৃষ্টি, আবার কখনও বা শান্ত নদীতে বয়ে চলা নৌকা। গীতিআলেখ্য আর অভিনয়ের এমন যুগলবন্দী দর্শকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, চারদিকে প্রশংসার ধুম পড়ে গেল।

এই সাফল্য আমাদের সাহস আরও বাড়িয়ে দিল। এরপর কলেজের সদ্য নির্মিত শহীদ মিনারের পাদদেশে, একুশে ফেব্রুয়ারির সেই আবেগঘন রাতে আমরা আবারও একই পন্থায় ছায়ানাট্যের আয়োজন করলাম। অন্ধকার রাতে আলো-ছায়ার সেই গম্ভীর আর মর্মস্পর্শী উপস্থাপনা ভাষা দিবসের চেতনাকে যেন আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। আগের মতোই, এই অনুষ্ঠানটিও দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবনায় তখন নতুন কিছু করার জোয়ার। সেই ভাবনা থেকেই আমরা রামকৃষ্ণ মিশনের আমবাগানে আয়োজন করলাম রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর। তবে কোনো কৃত্রিম স্টেজ নয়, একেবারে প্রকৃতির কোলে। গাছের গুড়ি কেটে বানানো হলো বেদী, যেখানে শিল্পীরা আসন নিলেন। আর দর্শকদের বসার জন্য মাটিতে বিছিয়ে দেওয়া হলো ফরাশ।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, স্বয়ং পল্লীকবি জসীম উদদীন অনুষ্ঠানস্থলে পা রাখলেন। চারপাশের এই প্রাকৃতিক আর নান্দনিক পরিবেশ দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ আর অবাক হয়েছিলেন যে, ঢুকেই বলে উঠলেন—”তোমরা তো দেখি আস্ত একটা শান্তিনিকেতন বানিয়ে ফেলেছো!” কবির সেই একটি বাক্যই আমাদের সমস্ত পরিশ্রমকে এক মুহূর্তে সার্থক করে তুলেছিল।

ছকভাঙা এই অনুষ্ঠানটি সে সময় পুরো শহরে এক তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চারদিকে এত কথা হচ্ছিল যে, তৎকালীন খবরের কাগজগুলোতেও আমাদের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসের খবর ফলাও করে ছাপা হলো।

তখনকার দিনে প্রতি বছর শীতের সময়ে সিনেমা হলে বসত সাত দিনব্যাপী এক জমজমাট নাট্যোৎসব। সংস্কৃতির সেই সোনালী সময়ে টাউন থিয়েটারের সেক্রেটারি ছিলেন কিরণ লাহিড়ী । শুধু সংগঠক হিসেবেই নন, সুরের জগতেও তাঁর ছিল দারুণ দখল; চমৎকার ভায়োলিন বাজাতেন তিনি। শীতের নিস্তব্ধ মাঝরাতে প্রায়শই তাঁর বাসা থেকে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসত, যা রাতের নীরবতাকে এক মায়াবী রূপ দিত। আরেকজন ছিলেন রাধাগোবিন্দ সাহা, তিনিও অসম্ভব সুন্দর এস্রাজ বাজাতেন।

মায়া ভাদুরী, উমা ও শুক্লা চমৎকার নাচতেন। ঝিলটুলীর ফজলু মিয়া অসাধারণ বাঁশি বাজাতেন এবং রাজবাড়ীর বামুন দাস বাজাতেন জলতরঙ্গ। নাট্যাঙ্গনে মহি ভাই, ডা. ননী বাবু, এম. এ. মতিন, অনিল কুণ্ডু, সুধীর চক্রবর্তী, দ্বিজেন বাবু, জামিনী লাহিড়ী (শাহজাহান চরিত্রে বিখ্যাত), টগর, দীপুদা, তন্দ্রা ও নমিতা দাপটের সাথে অভিনয় করতেন। ‘রুমীর বৈশাখী’ ও ‘ফরিদের সুনীয়ম’-এর মতো নাট্যদলগুলো প্রতি রোববার টিকিট বিনিময়ের মাধ্যমে জসীমউদ্দীন হলে নাটক মঞ্চস্থ করতো।

এছাড়া মেলায় রত্নেশ্বরের যাত্রাভিনয় (ভাওয়াল সন্ন্যাসী) এবং গ্রামাঞ্চলে হালিম বয়াতি, রহমান বয়াতি ও হাজেরা বিবির বিচার গান তৎকালীন ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করে রেখেছিল। মাজেদুর রহমানের এই স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে, ষাটের দশকের ফরিদপুর ছিল প্রকৃত অর্থেই এক প্রগতিশীল ও শিল্পমনস্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী।

দ্রষ্টব্য: লেখক মাজেদুর রহমান ফরিদপুরের একসময়ের খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও সাবেক ব্যাংকার। শহরের চরকমলাপুর মহল্লার এই সন্তান বর্তমানে আমেরিকার নিউইয়র্ক প্রবাসী। তিনি বিভিন্ন সময়ে ফরিদপুরের বিভিন্ন পরিমণ্ডলের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে নিখুঁত বর্ণনায়

স্মৃতিচারণমুলক লেখালেখি করেন। যা পাঠকমহলে খুবই সমাদৃত হয়ে এসেছে। মাঝখানের সময়ে কিছুদিনের বিরতির পরে স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাতে তিনি ফেসবুকে তাঁর নিজস্ব প্রোফাইলে ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ পোস্ট করেন। তাঁর সেই লেখার ঈষৎ পরিমার্জন করে দৈনিক অগ্নিপ্রহরের পাঠকের জন্য এই প্রতিবেদনটিতে তাঁর সেই বর্ণনা তুলে ধরা হলো।