Bangladesh ০৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::

গন্তব্যহীন যাত্রার শিরোনামহীন লেখা

আলমগীর জয়
  • আপডেট সময় : ০১:২০:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / 44

মোটাদাগে যারা চশমা পরতে শুরু করেছেন, তারা ভালোভাবেই জানেন ও বোঝেন যে, চশমা খুললে এক রকম দেখা যায়, আবার চশমা পরে অন্য রকম দেখা যায়। কিন্তু আমার একটা ঝামেলা হয়। চশমা পরে দেখি খুব সুন্দর রূপ-মানুষ-প্রকৃতিসহ সব। আবার চশমা খুললেও ঝামেলা- আগে যাকে সুন্দর দেখলাম-এবার তাকে কুৎসিত, – কদাকার- প্রচণ্ড খরাসহ সব। হয়ত বলবেন এটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। আবার দু’চারজন ট্যারা চোখে পন্ডিতগিরি বলেও মন্তব্য করতে পারেন। যা হোক, এই দেখাদেখি করতেই অথবা যান্ত্রিকতায় আবদ্ধ থেকে বা বিক্ষুব্ধতায় কখনো কখনো আমাকে ছুটে চলতে হয় অজানা গন্তব্যে। গন্তব্য অজানা হলেও সমাপ্তিটা পরিচিতিতেই হয়-অবশ্য এটা নিয়তি।

নিমগ্ন ছিলাম বৃত্তিতে। পারিপার্শ্বিকতা ধর্তব্যে ছিল না। দৃষ্টিপাতে প্রকৃতি। প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম কেটে ভারী বৃষ্টিপাত শেষে শীতল পরিবেশ। মন চাইল না আর এই ইট-পাথরে দৃষ্টি দিতে। আধা পরিচিত চালককে বলতেই রাজি। প্রকৃতির নিদারুণ আকর্ষণে ছুটে চলা। শহরে কোলাহল পার করে গাছপালায় ঘেরা প্রশস্ত পিচঢালা পথে এগিয়ে চলা। ক্ষণে ক্ষণে হালকা বৃষ্টি আর শীতল বাতাস, ভিন্ন মাত্রার এক আবেশে চৈতন্যহীনভাবে চলা হঠাৎ থমকে গেল অটো চালকের গতি বন্ধ হওয়ায়। সম্মুখে দাঁড়ানো 8/10 বছরের বালক, মধ্য বয়সি নারী আর পুরুষ। একটি পরিবার মনে হল। মহিলার এক হাতে ৬/৭ শ গ্রাম ওজনের দুটো কুড়হ্যা (মোরগ-মুরগি), বাজারের ব্যাগ, আরেক হাতে সয়াবিন তেলের ৫ লিটার বোতলে ভরা গরুর দুধ। সামনেই যাবে, গাড়ি পাচ্ছিল না, তাই ইশারা করেছে। আমার সম্মতিতে চালক তাদের উঠাল- তাদের সাময়িক উপকারের আশায়। পুরুষ লোকটি পাশের সিটে আর বাচ্চা ও মহিলা অপজিট সিটে- সম্মুখে। 

গ্রামাঞ্চলে নববধূতো বটেই, বিয়ের বহুকাল পর্যন্ত মেয়েরা বাপের বাড়ি বা ভাইয়ের বাড়ি বেড়ানো শেষে স্বামীর বাড়িতে ফেরার সময় মা বা ভাবির দেওয়া মৌসুমি ফলমূল টুপলায় (কাপড় দিয়ে গোলাকৃতি করে বাঁধা) করে নিয়ে যেত। ছোট বা মাঝারি সাইজের এই টুপলাগুলো সাথে থাকা ছেলে বা মেয়েরা মাথায় করে বহন করে নিত। নানাবাড়ি হতে নিজেও যে বহুদিন নেইনি তা নয়। কখনো কখনো বেশ ভারী লাগত। নিতে চাইতাম না। নানি খালারা জোর করে দিতেন। 

বাপের বাড়ি থ্যে আনলেন?

– একগাল হাসি দিয়ে কইলেন, ম্যায়ার বাড়ি যাইতিছি। ও রোস্ট খাব্যের চাইছিল। তাই দুইড্যা কুড়হ্যা নিলাম। আম কাঠালে দিন- খালি আম নিলি ক্যেমন দেহ্যা যায়, তাই গাই’র দুধও নিলাম। ছোট এ্যাটা কাঁঠাল নিছি।

কুড়হ্যা, আর গাই’র দুধ বাড়ির?

 – হ, হগল বছরই কুড়হ্যা অয়। বড়ো অইতি না অইতি ই মইর‌্যা যায়। এইবার ১৪ ডা ডিম দ্যে মুরগি বসাইছিলাম। ১২ ডা বাইচ্চা অইছিল। -৯ ডা টিকছে। গাই তো ভালোই দুধ দেয়-কিন্তুক পাতলা- ঘাস খাওয়াইলি পাতলা অয়। অস্ট্রেলিয়ান জাত। ইটু দুধ বেশিই অয়। আম-কাঠালও গাছেরই।

গ্রামাঞ্চল; মেয়ে বিয়ে হয়েছে ছোট বেলায়ই, বাল্য বিয়েও বলতে পারেন। নতুন বউ হয়ে গিয়েছে। নতুন বাড়ি-নতুন পরিবেশ- নতুন সব লোকজন। তাদের সাথে খাপ খাইতে (মানিয়ে নেয়া) সময় নেয়। সম্মান-শ্রদ্ধা-ভয়-সংকোচ কত কিছুই কাজ করে। তাই মা ই নিরাপদ। মনে সুপ্ত একটু চাহিদা মাকে জানানোয় মা কত কিছু নিয়ে যাচ্ছে-মেয়েকে দেখতে। এ ই মা; অথবা ৩ বছরের সন্তানকে রেখে অন্যর হাত ধরে চলে যায়- সে ও মা! শক্তি- দাপট থাকতে সন্তানদের মধ্যে বিভেদ করে – দাপটহীনকালে কষ্ট ভোগ করে; সে ও মা। আধুনিক চাকচিক্যময় ফ্ল্যাটে ম‘রে পড়ে থাকতে থাকতে পচে যায়- সেও মা ই।

যাহোক, ঐযে কুড়হ্যা, গরুর দুধ, আম, কাঁঠালের কথাও আসল। বলতে গেলে মাথার চান্দি গরম হয়ে যায়, তাই বলতে চাই না, আবার না বললেও মাথার মধ্যে কুড়কুড় করতে থাকে। কি যে করি!

আবহমান ঐতিহ্যে ফরিদপুর তো বটেই, সারা বাংলাদেশেই সাংসারিক উপার্জনের পথ হিসেবে এক সময়ে একমাত্র কৃষি কাজই ছিল। এর মধ্যে যে শুধু ফসলের চাষাবাদ তাই নয়, গরু ছাগল, হাঁস, মুরগি লালন পালন, বাড়ির আঙিনা, ফাঁকা ভিটায় বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ খুব করেই প্রচলিত ছিল। শহর কিবা গ্রাম; এমন বাড়ি ছিল না যেখানে হাঁস-মুরগি বা ফলের গাছ ছিল না। গ্রামাঞ্চলে বলতে গেলে সব বাড়িতেই গরু আর ছাগল ছিল। কিন্তু এখন এসব খুঁজে পাওয়া দায়। প্রথমে শহর থেকে উধাও হয়েছে, তারপর উধাও হতে শুরু করে গ্রামে। গ্রাম প্রতি দু চারটে বাড়িতে যা ও আছে তা ও আবার মানহীন। ঐযে কুড়হ্যার কথা আসল-দেশি কুড়হ্যার স্থানে দখল করেছে হাইব্রিড, নানা জাতের মোরগ-মুরগি। একই অবস্থা ছাগল-গরুর ক্ষেত্রেও। বলতে পারেন গৃহস্থ একটু বেশি লাভের আশায় হাইব্রিড জাতে আগ্রহী হয়েছে। অথবা ভিনদেশিরা পরিকল্পিতভাবে ওসব জাত ঢুকিয়েছে। যা মন চায় বলুন। আমার আপত্তি নাই। তবে দেশি জাতের হাঁস-মুরগি, সেই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল-ছাগী আর দেশি লাল ষাঁড়ের মাংসের স্বাদ অথবা দেশি গাই’র চিতই পিঠার গোলানো গুড়ির মতো ঘন দুধ আজ আর পাবেন না। এই যে হাইব্রিড জাত-এটা টেকসই নয়, এক প্রজন্মের পর আরেকটা প্রজন্ম আর টিকে না। মানহীন হয়ে পড়ে। পুনঃ উৎপাদনে মান একেবারেই নেই বললে চলে।

এদিক থেকে সেদিক- সেদিক থেকে ওদিন- মন প্রতি মিনিটে কতবার চিন্তা বা কল্পনা বদলায়, তার উত্তর আমি মনে রাখিনি- তাই লিখতে পারছি না। লিখতে না পারলেও বদলায় তো!

২১ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ-বাংলায় বললে ৭ই আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; সকালে বেড়িয়েছিলাম ফুল হাতা পেরুন (জামা-শার্ট) গায়ে দিয়ে। প্রচণ্ড গরমের কাল-তাও আবার ভ্যাপসা গরম। যদিও ফুল হাতা তবে বেশ পাতলা। শুধু ঘামলে শরীরের সাথে লেপ্টে যায়। পকেটের এক কোনে সেলাই খুলে গেছে- ওনিয়ে মালুম করি না। সারাদিনই উৎতপ্ত আবহাওয়া পরিবেশ ছিল বেশ গরম। বিকেলে শুরু হওয়া অঝোর ধারা বৃষ্টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল আষাঢ়ের দিনতো এমনই। 

দুপাশে ঘনগাছপালা সূর্যহীন পড়ন্ত বিকেলকে রাত্রির আবহ দিয়েছে। দু চারটে অটোর গমনাগমন ছাড়া রাস্তা প্রায় ফাঁকা। এই পল্লি গায়ের ভেতর দিয়ে চলার সময় এখন যে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এখন শীতকাল। কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আবার কখনো অঝোর বৃষ্টি চলার পথের পরিবেশকে আরো সৌন্দর্যময় করে তুলছিল। গাছগাছালিতে ঘেরা পথে সরাসরি বৃষ্টির গুড়ি পরছে না। গাছের পাতায় পড়ে সেখান থেকে আবার মাটিতে পড়ছে। টুপটাপ শব্দ, সোঁদা মাটির গন্ধ আর শীতল বাতাস মিশে এক অপূর্ব প্রেমময় শান্ত অনুভূতির সৃষ্টি করছে। প্রকৃতই প্রকৃতির এই শীতল আমেজে নিজের একটা জাম্পারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত করাচ্ছিল। তীব্র গরমের দিনে বৃষ্টির পরে এই শীতল প্রবাহের ছোঁয়া বহু বছর পূর্বের কথা মনে করিয়ে দিল।

৯০-৯১ দিকের কথা। তখন আষাঢ় মাস মানে অরিজিনালই আষাঢ় মাস-শুধু দিনপঞ্জির পাতায় নয়। যে-কোনো সময় শুরু হয় অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বিশেষ করে বিকেলের দিকে অঝোর ধারার বৃষ্টির পর তৈরি হয় স্নিগ্ধ ও মায়াবী পরিবেশ। সূর্যের দেখা নাই- মেঘের চাদরে ঢাকা আকাশ। বৃষ্টি শুরু হলে প্রায় দিনই দাদি মাটির চুলোয় মাটির ভাঙা হাঁড়ি দিয়ে বানানো খাপড়া (তাওয়া-ফ্রাইপ্যান বলতে পারেন) চড়িয়ে দিতেন। একটু লবণ সামান্য একটু পানিতে গুলিয়ে কখনো ছোলা, কখনোবা গম আবার কখনো আমন চালের সাথে মিশিয়ে খোলায় দিতেন। এর সাথে দিতেন কুচিকুচি করে কাটা কাঁচা মরিচ – ছোট ছোট সাইজের দেশি রসুনের কোয়া। কোন তেলের বালাই ছিল না। খোলায়ই ভাজা হত সেসব। আবার কখনো লাল চালের ভাজা মুড়ির সাথে কাচা মরিচ-কাচা পেঁয়াজ কেটে, লবণ আর একটু সরিষার তেল মিশিয়ে মুড়ি ভর্তা বানাতেন। চাউল মাপার শের-এর ভেতরে দিয়ে বলতেন, ‘খা; খিরকির (জানালা) বাইরে হাত দিস না, ভিজে যাবি, মাথায় পানি লাগলি ঠান্ডা লাগবি।’ ঘুমানোর চৌকিতে জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতাম আর সেই ভাজা খেতে থাকতাম। আজও ভুলবার নয়, সেই কথামালা। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখার সে স্মৃতি শুধু ‘আহ্’ শব্দে স্মৃতিচারণ ছাড়া কিছুই নয়। 

নানা বিষয় ভাবতে ভাবতে যখন সম্বিৎ ফিরে এল, দেখলাম বহুপথ পেরিয়ে চালক বাড়ির গেটে অটোখানা দার করিয়েছে।

 

লেখক 

আলমগীর জয়

২৩ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

শেয়ার করুন

গন্তব্যহীন যাত্রার শিরোনামহীন লেখা

আপডেট সময় : ০১:২০:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

মোটাদাগে যারা চশমা পরতে শুরু করেছেন, তারা ভালোভাবেই জানেন ও বোঝেন যে, চশমা খুললে এক রকম দেখা যায়, আবার চশমা পরে অন্য রকম দেখা যায়। কিন্তু আমার একটা ঝামেলা হয়। চশমা পরে দেখি খুব সুন্দর রূপ-মানুষ-প্রকৃতিসহ সব। আবার চশমা খুললেও ঝামেলা- আগে যাকে সুন্দর দেখলাম-এবার তাকে কুৎসিত, – কদাকার- প্রচণ্ড খরাসহ সব। হয়ত বলবেন এটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। আবার দু’চারজন ট্যারা চোখে পন্ডিতগিরি বলেও মন্তব্য করতে পারেন। যা হোক, এই দেখাদেখি করতেই অথবা যান্ত্রিকতায় আবদ্ধ থেকে বা বিক্ষুব্ধতায় কখনো কখনো আমাকে ছুটে চলতে হয় অজানা গন্তব্যে। গন্তব্য অজানা হলেও সমাপ্তিটা পরিচিতিতেই হয়-অবশ্য এটা নিয়তি।

নিমগ্ন ছিলাম বৃত্তিতে। পারিপার্শ্বিকতা ধর্তব্যে ছিল না। দৃষ্টিপাতে প্রকৃতি। প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম কেটে ভারী বৃষ্টিপাত শেষে শীতল পরিবেশ। মন চাইল না আর এই ইট-পাথরে দৃষ্টি দিতে। আধা পরিচিত চালককে বলতেই রাজি। প্রকৃতির নিদারুণ আকর্ষণে ছুটে চলা। শহরে কোলাহল পার করে গাছপালায় ঘেরা প্রশস্ত পিচঢালা পথে এগিয়ে চলা। ক্ষণে ক্ষণে হালকা বৃষ্টি আর শীতল বাতাস, ভিন্ন মাত্রার এক আবেশে চৈতন্যহীনভাবে চলা হঠাৎ থমকে গেল অটো চালকের গতি বন্ধ হওয়ায়। সম্মুখে দাঁড়ানো 8/10 বছরের বালক, মধ্য বয়সি নারী আর পুরুষ। একটি পরিবার মনে হল। মহিলার এক হাতে ৬/৭ শ গ্রাম ওজনের দুটো কুড়হ্যা (মোরগ-মুরগি), বাজারের ব্যাগ, আরেক হাতে সয়াবিন তেলের ৫ লিটার বোতলে ভরা গরুর দুধ। সামনেই যাবে, গাড়ি পাচ্ছিল না, তাই ইশারা করেছে। আমার সম্মতিতে চালক তাদের উঠাল- তাদের সাময়িক উপকারের আশায়। পুরুষ লোকটি পাশের সিটে আর বাচ্চা ও মহিলা অপজিট সিটে- সম্মুখে। 

গ্রামাঞ্চলে নববধূতো বটেই, বিয়ের বহুকাল পর্যন্ত মেয়েরা বাপের বাড়ি বা ভাইয়ের বাড়ি বেড়ানো শেষে স্বামীর বাড়িতে ফেরার সময় মা বা ভাবির দেওয়া মৌসুমি ফলমূল টুপলায় (কাপড় দিয়ে গোলাকৃতি করে বাঁধা) করে নিয়ে যেত। ছোট বা মাঝারি সাইজের এই টুপলাগুলো সাথে থাকা ছেলে বা মেয়েরা মাথায় করে বহন করে নিত। নানাবাড়ি হতে নিজেও যে বহুদিন নেইনি তা নয়। কখনো কখনো বেশ ভারী লাগত। নিতে চাইতাম না। নানি খালারা জোর করে দিতেন। 

বাপের বাড়ি থ্যে আনলেন?

– একগাল হাসি দিয়ে কইলেন, ম্যায়ার বাড়ি যাইতিছি। ও রোস্ট খাব্যের চাইছিল। তাই দুইড্যা কুড়হ্যা নিলাম। আম কাঠালে দিন- খালি আম নিলি ক্যেমন দেহ্যা যায়, তাই গাই’র দুধও নিলাম। ছোট এ্যাটা কাঁঠাল নিছি।

কুড়হ্যা, আর গাই’র দুধ বাড়ির?

 – হ, হগল বছরই কুড়হ্যা অয়। বড়ো অইতি না অইতি ই মইর‌্যা যায়। এইবার ১৪ ডা ডিম দ্যে মুরগি বসাইছিলাম। ১২ ডা বাইচ্চা অইছিল। -৯ ডা টিকছে। গাই তো ভালোই দুধ দেয়-কিন্তুক পাতলা- ঘাস খাওয়াইলি পাতলা অয়। অস্ট্রেলিয়ান জাত। ইটু দুধ বেশিই অয়। আম-কাঠালও গাছেরই।

গ্রামাঞ্চল; মেয়ে বিয়ে হয়েছে ছোট বেলায়ই, বাল্য বিয়েও বলতে পারেন। নতুন বউ হয়ে গিয়েছে। নতুন বাড়ি-নতুন পরিবেশ- নতুন সব লোকজন। তাদের সাথে খাপ খাইতে (মানিয়ে নেয়া) সময় নেয়। সম্মান-শ্রদ্ধা-ভয়-সংকোচ কত কিছুই কাজ করে। তাই মা ই নিরাপদ। মনে সুপ্ত একটু চাহিদা মাকে জানানোয় মা কত কিছু নিয়ে যাচ্ছে-মেয়েকে দেখতে। এ ই মা; অথবা ৩ বছরের সন্তানকে রেখে অন্যর হাত ধরে চলে যায়- সে ও মা! শক্তি- দাপট থাকতে সন্তানদের মধ্যে বিভেদ করে – দাপটহীনকালে কষ্ট ভোগ করে; সে ও মা। আধুনিক চাকচিক্যময় ফ্ল্যাটে ম‘রে পড়ে থাকতে থাকতে পচে যায়- সেও মা ই।

যাহোক, ঐযে কুড়হ্যা, গরুর দুধ, আম, কাঁঠালের কথাও আসল। বলতে গেলে মাথার চান্দি গরম হয়ে যায়, তাই বলতে চাই না, আবার না বললেও মাথার মধ্যে কুড়কুড় করতে থাকে। কি যে করি!

আবহমান ঐতিহ্যে ফরিদপুর তো বটেই, সারা বাংলাদেশেই সাংসারিক উপার্জনের পথ হিসেবে এক সময়ে একমাত্র কৃষি কাজই ছিল। এর মধ্যে যে শুধু ফসলের চাষাবাদ তাই নয়, গরু ছাগল, হাঁস, মুরগি লালন পালন, বাড়ির আঙিনা, ফাঁকা ভিটায় বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ খুব করেই প্রচলিত ছিল। শহর কিবা গ্রাম; এমন বাড়ি ছিল না যেখানে হাঁস-মুরগি বা ফলের গাছ ছিল না। গ্রামাঞ্চলে বলতে গেলে সব বাড়িতেই গরু আর ছাগল ছিল। কিন্তু এখন এসব খুঁজে পাওয়া দায়। প্রথমে শহর থেকে উধাও হয়েছে, তারপর উধাও হতে শুরু করে গ্রামে। গ্রাম প্রতি দু চারটে বাড়িতে যা ও আছে তা ও আবার মানহীন। ঐযে কুড়হ্যার কথা আসল-দেশি কুড়হ্যার স্থানে দখল করেছে হাইব্রিড, নানা জাতের মোরগ-মুরগি। একই অবস্থা ছাগল-গরুর ক্ষেত্রেও। বলতে পারেন গৃহস্থ একটু বেশি লাভের আশায় হাইব্রিড জাতে আগ্রহী হয়েছে। অথবা ভিনদেশিরা পরিকল্পিতভাবে ওসব জাত ঢুকিয়েছে। যা মন চায় বলুন। আমার আপত্তি নাই। তবে দেশি জাতের হাঁস-মুরগি, সেই ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল-ছাগী আর দেশি লাল ষাঁড়ের মাংসের স্বাদ অথবা দেশি গাই’র চিতই পিঠার গোলানো গুড়ির মতো ঘন দুধ আজ আর পাবেন না। এই যে হাইব্রিড জাত-এটা টেকসই নয়, এক প্রজন্মের পর আরেকটা প্রজন্ম আর টিকে না। মানহীন হয়ে পড়ে। পুনঃ উৎপাদনে মান একেবারেই নেই বললে চলে।

এদিক থেকে সেদিক- সেদিক থেকে ওদিন- মন প্রতি মিনিটে কতবার চিন্তা বা কল্পনা বদলায়, তার উত্তর আমি মনে রাখিনি- তাই লিখতে পারছি না। লিখতে না পারলেও বদলায় তো!

২১ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ-বাংলায় বললে ৭ই আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; সকালে বেড়িয়েছিলাম ফুল হাতা পেরুন (জামা-শার্ট) গায়ে দিয়ে। প্রচণ্ড গরমের কাল-তাও আবার ভ্যাপসা গরম। যদিও ফুল হাতা তবে বেশ পাতলা। শুধু ঘামলে শরীরের সাথে লেপ্টে যায়। পকেটের এক কোনে সেলাই খুলে গেছে- ওনিয়ে মালুম করি না। সারাদিনই উৎতপ্ত আবহাওয়া পরিবেশ ছিল বেশ গরম। বিকেলে শুরু হওয়া অঝোর ধারা বৃষ্টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল আষাঢ়ের দিনতো এমনই। 

দুপাশে ঘনগাছপালা সূর্যহীন পড়ন্ত বিকেলকে রাত্রির আবহ দিয়েছে। দু চারটে অটোর গমনাগমন ছাড়া রাস্তা প্রায় ফাঁকা। এই পল্লি গায়ের ভেতর দিয়ে চলার সময় এখন যে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে এখন শীতকাল। কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আবার কখনো অঝোর বৃষ্টি চলার পথের পরিবেশকে আরো সৌন্দর্যময় করে তুলছিল। গাছগাছালিতে ঘেরা পথে সরাসরি বৃষ্টির গুড়ি পরছে না। গাছের পাতায় পড়ে সেখান থেকে আবার মাটিতে পড়ছে। টুপটাপ শব্দ, সোঁদা মাটির গন্ধ আর শীতল বাতাস মিশে এক অপূর্ব প্রেমময় শান্ত অনুভূতির সৃষ্টি করছে। প্রকৃতই প্রকৃতির এই শীতল আমেজে নিজের একটা জাম্পারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত করাচ্ছিল। তীব্র গরমের দিনে বৃষ্টির পরে এই শীতল প্রবাহের ছোঁয়া বহু বছর পূর্বের কথা মনে করিয়ে দিল।

৯০-৯১ দিকের কথা। তখন আষাঢ় মাস মানে অরিজিনালই আষাঢ় মাস-শুধু দিনপঞ্জির পাতায় নয়। যে-কোনো সময় শুরু হয় অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বিশেষ করে বিকেলের দিকে অঝোর ধারার বৃষ্টির পর তৈরি হয় স্নিগ্ধ ও মায়াবী পরিবেশ। সূর্যের দেখা নাই- মেঘের চাদরে ঢাকা আকাশ। বৃষ্টি শুরু হলে প্রায় দিনই দাদি মাটির চুলোয় মাটির ভাঙা হাঁড়ি দিয়ে বানানো খাপড়া (তাওয়া-ফ্রাইপ্যান বলতে পারেন) চড়িয়ে দিতেন। একটু লবণ সামান্য একটু পানিতে গুলিয়ে কখনো ছোলা, কখনোবা গম আবার কখনো আমন চালের সাথে মিশিয়ে খোলায় দিতেন। এর সাথে দিতেন কুচিকুচি করে কাটা কাঁচা মরিচ – ছোট ছোট সাইজের দেশি রসুনের কোয়া। কোন তেলের বালাই ছিল না। খোলায়ই ভাজা হত সেসব। আবার কখনো লাল চালের ভাজা মুড়ির সাথে কাচা মরিচ-কাচা পেঁয়াজ কেটে, লবণ আর একটু সরিষার তেল মিশিয়ে মুড়ি ভর্তা বানাতেন। চাউল মাপার শের-এর ভেতরে দিয়ে বলতেন, ‘খা; খিরকির (জানালা) বাইরে হাত দিস না, ভিজে যাবি, মাথায় পানি লাগলি ঠান্ডা লাগবি।’ ঘুমানোর চৌকিতে জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখতাম আর সেই ভাজা খেতে থাকতাম। আজও ভুলবার নয়, সেই কথামালা। জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখার সে স্মৃতি শুধু ‘আহ্’ শব্দে স্মৃতিচারণ ছাড়া কিছুই নয়। 

নানা বিষয় ভাবতে ভাবতে যখন সম্বিৎ ফিরে এল, দেখলাম বহুপথ পেরিয়ে চালক বাড়ির গেটে অটোখানা দার করিয়েছে।

 

লেখক 

আলমগীর জয়

২৩ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ