গল্প
চুঙ্কার বনে
- আপডেট সময় : ০৫:৩৩:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
- / 70
চুঙ্কার বনের বড় সিংহটা যেদিন একটি দুর্ঘটনায় মারা গেল, বনের অধিপতি সেই কেশর-ফোলানো সিংহের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বনের হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল। কিন্তু শোকের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল এক অদ্ভুত শূন্যতা। একটা ব্যাপারে কারোরই নজর এড়ালো না—এতদিন ওরা যেটাকে সিংহের অভয়ারণ্য বলে জানত, সেখানে সিংহের দলে শুধু শিয়াল কিংবা হাতিরাই নয়, বানর আর বাদরের সাথে ছুঁচোর মতো প্রাণীগুলোর উপদ্রবও বাড়তে লাগল। তারা এখন নিজেদের সিংহের উত্তরাধিকারী দাবি করে।
যেই বনে একসময় সিংহের গর্জন শোনা যেত, সেখানে এখন চামচিকা আর ইঁদুরের চিকিচিকি শব্দের বাড়তি বিরক্তি। পাখিদের কিচিরমিচির সেই শব্দে আস্তে আস্তে ম্লান হতে লাগল। এসব দেখে বিষণ্ণ নিরীহ প্রাণীগুলো।
‘হায়! কী হলো এসব? আমরা বুঝি অভিভাবকহীন হয়ে গেলাম!’—ময়ূরের হৃদয় থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চিরচেনা সেই বন এখন তার কাছে অচেনা কোনো খাঁচার মতো লাগতে শুরু করল।
সিংহের অবর্তমানে তার পরিবারের যারা ছিল, ওরা তখন ছোট ছোট। কেউই বাবার মতো গর্জন করতে জানে না। সভাসদের অন্যরাও রাজার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলো। তবে যেহেতু বনের রাজা বলতে সিংহকেই বোঝায়, রাজার অবর্তমানে তারাই তখন সিংহের বেশ ধরে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেল। কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদেরও রাজা হওয়ার সাধ জাগল মনে। দশাসই হাতির যেন তর সইছিল না।
‘আমাদের একটা সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা দিয়েই না হয় বন চালাব।’—মনে মনে নিজেকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র বাসনা থেকে অস্ফুটভাবে একদিন হাতিটি বলেই ফেলল।
হাতির প্রস্তাব শুনে বনের শান্ত দিঘির পাড়ে জমা হওয়া পশুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। শিয়াল, যে কি না মনে মনে নিজেকে সিংহের চেয়েও ধুরন্ধর ভাবে, সে তার ঝোপালো লেজটি নাড়িয়ে সামনে এগিয়ে এল।
‘অতীত দিয়ে কি পেট ভরে গজরাজ?’—শিয়াল বিদ্রূপের সুরে বলল। ‘সিংহের গর্জন ছিল সাহসের প্রতীক, আর আপনার এই বিশাল শরীর তো কেবল ভারী কাজের জন্য। এখন সময় কৌশলের। এই যে চামচিকা আর ইঁদুরে শব্দ করছে, এদের দমানোর জন্য গর্জন নয়, দরকার চাণক্য বুদ্ধি।’
বানরগুলো গাছের ডাল থেকে ঝুলে ভেঙচি কাটতে লাগল। তাদের মতে, বন চালানো মানেই হলো চপলতা আর সবার সাথে সদ্ভাব রাখা। বনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী কে, তা নিয়ে যখন তুমুল তর্কাতর্কি চলছে, তখন বনের এক কোণে বসে থাকা বৃদ্ধ পেঁচা চোখ মেলল।
ধীরকণ্ঠে সে বলল, ‘তোমরা রাজপোশাক পরতে পারো, সিংহের মতো কেশরও হয়তো নকল করতে পারবে, কিন্তু সিংহের সেই ন্যায়বিচার আর গাম্ভীর্য কোথায় পাবে? মনে রেখো, সিংহাসন কাউকে রাজা বানায় না, রাজকীয় গুণই একজনকে সিংহাসনের যোগ্য করে তোলে। আজ তোমরা যারা উত্তরাধিকার দাবি করছো, তারা বনের ভালোর চেয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণেই বেশি ব্যস্ত।’
একথা শুনে ময়ূরটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘একদিন এই বনে শৃঙ্খলা ছিল। আজ সবাই রাজা হতে চায়! অথচ এখন কেউই নিরাপদ নয়। চামচিকার শব্দে পাখির গান যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, বনের আত্মাই হারিয়ে যাবে না তো?’—মনের মধ্যে অজানা এক শঙ্কা দানা বাঁধে তার।
হাতি, শিয়াল আর অন্য প্রাণীরা মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, সিংহের অভাব তাদের আস্থার বিনাশ ঘটিয়েছে। বনের ভবিষ্যৎ এখন কোনো একজন ‘রাজা’র হাতে নয়, বরং তারা কীভাবে এই অনৈক্য সামাল দেবে—তার ওপর ঝুলে রইল।
পুরো বনজুড়ে এই নিয়ে এক চরম বিশৃঙ্খলা দানা বাঁধল। সিংহের মতো সেই চারিত্রিক দৃঢ়তা কিংবা ব্যক্তিত্ব কারোরই ছিল না; ফলে প্রকাশ্য জনমতে কেউই ‘রাজা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেল না। অগত্যা তারা কেবল পোশাকি পরিচয় আর পদের মোহে নিজেদের আবদ্ধ রাখল। এতে তাদের ব্যক্তিগত অহংবোধ তৃপ্ত হলেও, বনে নেমে এল চরম নৈরাজ্য।
সিংহের শূন্যতায় বনের নিয়ন্ত্রণ যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে—এই রূঢ় সত্যটুকু উচ্চারণ করার মতো সাহস বা সততাও কারও অবশিষ্ট থাকল না। বরং এই অরাজকতার সুযোগ নিয়ে প্রত্যেকেই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং নিজেকে স্বঘোষিত রাজা হিসেবে জাহির করতে লাগল। নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে প্রত্যেকের চারপাশে জুটে গেল একদল ধূর্ত চাটুকার, যারা মিথ্যে প্রশংসার স্তুতি গেয়ে এই বিশৃঙ্খলাকে আরও উসকে দিতে থাকল।
এই আত্মকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ে বনের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, তা কেউই বলল না। একসময়ের সেই অভয়ারণ্য এখন আর নিরাপদ নেই। বনের সীমানায় শুরু হলো বহিরাগত ছিঁচকে জানোয়ারদের উপদ্রব; সুযোগ পেলেই তারা বনের দুর্বল পশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। এই অনাসৃষ্টি আর বিশৃঙ্খলা দেখে সাধারণ প্রাণীদের মনে হাহাকার বাড়ল। তবে যোগ্য রাজার অভাবে তাদের সেই কষ্ট লাঘব করার কেউ ছিল না।
বনের শান্তি ধুলোয় মিশে গেল। এককালে প্রতিবেশী বনের কাছে যে মর্যাদা ছিল, তা-ও ম্লান হয়ে এল। আর এভাবেই একসময় সিংহের বনের রাজকীয় ঐতিহ্যের চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটল। এমনকি সিংহের যে উত্তরাধিকারী ছিল, পরিস্থিতির চাপে পড়ে সে-ও নিজের বংশপরিচয় ভুলে বিড়াল গোত্রীয় প্রাণীদের দলে নাম লেখাল। জন্মসূত্রে সিংহের রক্ত বইলেও, পরিবেশ আর চাটুকারিতার প্রভাবে তার ভেতরকার সেই তেজ আর বীরত্ব হারিয়ে গেল। বনের রাজা হওয়ার পরিবর্তে সে কেবল একটি সাধারণ প্রাণীতে পরিণত হলো, যার মধ্যে সিংহের কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই।
সময়ের স্রোতে একসময় বনের বাসিন্দারা ভুলেই গেল যে, এই জনপদ একদা প্রতাপশালী সিংহের ছিল। রাজসভার জৌলুস হারিয়ে তখন এক ভগ্ন দশা। দূর-দূরান্তের বন থেকে অন্য পশুরা আসত সেই হারানো ঐতিহ্য পরখ করতে, কিন্তু শূন্য সিংহাসন আর শিয়াল-বাঁদরের হট্টগোল দেখে তারা বিমর্ষ মুখে ফিরে যেত।
ঠিক এমন এক ক্রান্তিকালে ভিনদেশি এক জনপদ থেকে উদয় হলো প্রকাণ্ড এক মুচো বিড়াল। তার অবয়ব অনেকটা সিংহের মতো, আর কণ্ঠস্বরে সে নকল করে এনেছে কৃত্রিম এক হুঙ্কার। সে শিয়াল আর বাঁদরের দলকে ফলমূল আর উপাদেয় খাবারের লোভ দেখিয়ে নিজের বশে আনল। তবে বনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে তার দরকার ছিল এমন একজন প্রধান রক্ষক, যার পেশিবহুল শক্তির কাছে সবাই নত থাকবে।
এরপর বিড়ালটি বুদ্ধি করে বনের এক অন্ধকার প্রান্তে, যেখানে দিনের আলোও প্রবেশ করে না, সেখানে পাথরের আড়ালে ওত পেতে থাকা হায়েনাকে খুঁজে বের করল। বিড়ালটি এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। তার মুখে এক লোভমাখা হাসি।
—‘কী খবর টারজান ভাই? আপনার মতো এমন সাহসী জন থাকতে নাকি এই বনে রাজা হওয়ার যোগ্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এতো দেখি নিদারুণ দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।’
বিড়ালের মুখে ‘টারজান’ সম্বোধন শুনে পশুটি ভীষণ খুশি হলো। বিড়াল তাকে বোঝাল, এই অন্ধকার গর্তে পচে মরেই কি সে জীবন পার করবে? সে বলল, ‘আপনার মতো এমন তুখোড় শিকারি কেন এভাবে একাকী রয়ে গেছেন, সেটা ভেবে আমি অবাক হই।’ টারজান তার ধারালো দাঁত বের করে একটা বিকট শব্দ করল।
—‘আমাদের মতো হিংস্র প্রাণীদের জন্য তো অন্ধকারই ভালো। বনের তথাকথিত ‘ভদ্র’ পশুরা আমাদের নাম শুনলেই কাছে আসতে ভয় পায়। আমাদের সেখানে সুবোধের কোনো পরিচয় নেই, কোনো অবস্থানও নেই।’
বিড়ালটি আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘অবস্থান কেউ কাউকে সাজিয়ে দেয় না, ওটা তৈরি করে নিতে হয়। আমি আপনাকে সেই পথটাই করে দিতে এসেছি।’ এরপর কিছুটা কাঁচুমাচু হয়ে সে জানাল তার মনের গভীরে থাকা একান্ত অভিব্যক্তি। সে বলল, ‘আসলে এমন একটা ঐতিহ্য ছিল এই বনের, কিন্তু এখন পুরোটাই দুর্নাম হতে চলেছে। নিরীহ জন্তুগুলোও কেমন নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। এই বনের বাসিন্দা হিসেবে আপনারও তো একটা কর্তব্য আছে।’
এটুকু বলে সে থামল। তারপর বলল, ‘আসলে আমি এই বনের হাল ধরতে চাইছি। এজন্য আপনাকেই আমার বড় দরকার।’
টারজান লোভাতুর দৃষ্টিতে মুচোর দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত চকমকি খেলে গেল। ক্ষমতার লোভে তার জিভ দিয়ে নাল নেমে এল।
—‘তাহলে আমাকে কী করতে হবে?’—জানতে চাইল সে।
মুচো বলল, ‘খুব সামান্য কাজ। আমাকে আপনি পরামর্শ দেবেন কীভাবে বনে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়।’
মুচো টারজানের ক্ষিপ্রতার কথা শুনেছে। তাই সে তাকে বেশ তোয়াজ করে কথাগুলো বলতে লাগল, যাতে লোভটা গেলানো যায়। টারজানের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় প্রস্তাব। নিজেকে প্রকৃতই ‘টারজান’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে সে—যাকে এতদিন সকলে শুধু শিকারি জন্তু হিসেবেই জেনে এসেছে!
একদিন তারা দুজনে বনে এক বড় ভোজসভার আয়োজন করল। সুস্বাদু সব উপাদেয় খাবার দিয়ে সেই ভোজসভায় বাহারি চমক তৈরি করা হলো। বনের অন্যান্য প্রাণীগুলো অনেকে কখনো এসব চোখেও দেখেনি। তারা সেই ভোজসভার নিমন্ত্রণ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতে লাগল। সভায় উপস্থিত হয়ে তারা একে অপরের সাথে এসব খাবার কে কবে খেয়েছে, সেই খোশগল্পে মেতে উঠল। আর বিড়াল ও টারজানের রুচির ভারী প্রশংসা করতে লাগল।
একেবারে শেষ সময়ে বিড়ালটি সেই অন্ধকারের পশুকে পাশে বসিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটু গলা ঝেড়ে কেশে নিল। তারপর বনের অতীত ঐতিহ্য বর্ণনার সাথে বর্তমান দুর্দশার চিত্রও তুলে ধরল। মুচো বিড়ালটি মনের মাধুরী মিশিয়ে তখন তার পাশে বসা অন্ধকারের পশুর প্রশংসা করতে লাগল।
সে বলল, ‘প্রিয় বনবাসী, এই মুহূর্তে আমাদের দরকার একজন সাহসী সেনাপতি। আর অনেক ভেবেচিন্তে এজন্য টারজানের বিকল্প কাউকে আমি পেলাম না। আপনারা অনেকেই তাকে হিংস্র আর শিকারি বলেই জানেন! তবে তার মতো দয়ালু আর পরোপকারী এই বনে এই সময়ে আর দ্বিতীয়টি নেই—একথা আমি হলফ করে বলতে পারি।’
টারজান তখন জাদুময়ী ভঙ্গিতে মন ভোলানো এক অদ্ভুত হাসি দিল। অন্যকে মতিভ্রম করার এক বিশেষ বিদ্যা তার শেখা আছে। সেই কায়দাটাই আরেকটু ঝালাই করে সে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরকে উদ্দীপ্ত করে তোলার মতো অসাধারণ এক বক্তব্য রাখল। তার এই বক্তব্য শুনে বনের পশুরা ভাবল, ‘আরে, এই তো দেখি আমাদের মসিহা! আমরা তো তাকেই চাই!’
বনের রাজসভায় আবার বাতি জ্বলল। বিড়ালের ইশারায় টারজান সবাইকে বোঝাতে শুরু করল যে, সিংহাসনে যিনি বসে আছেন তিনি প্রকৃতই সিংহ। দুই-একজন তার মতলব ধরতে পারলেও ভয়ে কিছু বলল না।
এক হরিণ কানে কানে অন্যকে বলল, ‘ওর চোখে যে ক্ষুধার আগুন জ্বলছে, তা কি কেউ দেখতে পাচ্ছ না?’ জবাবে অন্যজন ফিসফিস করে বলল, ‘চুপ থাকো! নিজের ঘাড় বাঁচাতে চাইলে হায়েনার গুণগান করো।’
কিন্তু রহস্যটা ফাঁস হলো আরও পরে। টারজান আসলে ছিল স্রেফ এক ‘বানর’ প্রজাতির স্বার্থপর প্রাণী। এর মধ্যেই বনের এক শিক্ষিত শিয়াল, যার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি পুরো তল্লাটে, সে প্রথম এই গুপ্ত চালটি ধরতে পারল। সে তার বক্তব্যে ইনিয়ে-বিনিয়ে এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল, যাতে কেউ ধরতে পারল না আসলে সে এই নতুন রাজাদের সমর্থন দিয়েছে কি না।
আসলে সিংহের সাম্রাজ্যে এই জ্ঞানী শিয়ালের তেমন কদর ছিল না। সে ভাবল, মুচো বিড়ালের রাজত্বে তার কদর হচ্ছে। নিজের জ্ঞান ফলিয়ে বিড়ালের রাজত্বকে সে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিতে শুরু করল। আর মনে মনে ভাবল, সিংহ নেই তো কী হয়েছে, এই মুচো বিড়ালের সাম্রাজ্যে পণ্ডিত হিসেবে আমার একটা কদর তো পাচ্ছি! একপর্যায়ে বনের রক্ষণশীলরা যখন শিয়ালের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল, তখন শিয়াল বড় বিপদে পড়ে গেল। নাজেহাল শিয়াল তখন নিজের পিঠ বাঁচাতে সেই মুখোশধারী মুচো বিড়ালের দলে ভিড়ে গেল। একদিন যে সত্যের জন্য ডাক তুলত, আজ নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে সেই মিথ্যার পায়ে মাথা নোয়াল। শিয়াল বিড়বিড় করে বলল—‘রাজা যেই হোক, আমার টিকে থাকাটাই এখন আসল কর্ম।’
চুঙ্কার বনে এভাবে আবার মেকি ব্যস্ততা ফিরে এল। রাজসভায় বাতি জ্বলল, নিয়মিত বিরতিতে সেখানে আবার রাজকীয় ভোজের আয়োজন হলো। ভোজসভার শেষে সেই টারজানের মুখে কৌশলী আর প্রশস্তিমূলক বুলিতে মুচো বিড়ালের ক্ষমতার বৈধতা ঘোষণা হলো। সাধারণ পশুরা সেই জাঁকজমক দেখে ভাবত, বন বুঝি আবার আগের চেহারায় ফিরে গেল।
কিন্তু সমস্যা বাধল মুচো বিড়ালের অতি লোভ আর ক্ষমতার দাপটে। তার দুর্নাম এতই বাড়ল যে শিয়ালের দেওয়া ‘সুনামের প্রলেপ’ আর কাজে এল না। বিড়ালটি এই অঞ্চলের না হওয়ায় বনের মাটির প্রতি তার অন্তরের প্রকৃত টান ছিল না। অন্যদিকে, ক্ষমতার স্বাদ টারজানকে লোভী করে তুলল। কিছুদিন যেতেই তার মনে বনের রাজা হওয়ার তীব্র লালসা জাগল। সে আর মুচো বিড়ালের ‘পাহারাদার’ হয়ে থাকতে চাইল না। অত্যন্ত কুটিল চালে সে মুচো বিড়ালের অনুসারীদের মধ্যে ফাটল ধরাল; ‘বিড়াল বড়ই অনাসৃষ্টি করছে। সে আসলে এই বনের কেউ নয়, বহিরাগত’—একথা রটিয়ে সে কূটচালের ঘুঁটি চালল।
অবশেষে এবার তার পালা এল। আবার এক আড়ম্বরপূর্ণ ভোজসভার আয়োজন করা হলো। সুস্বাদু খাবারের লোভে বনের সব পশুরা যখন কোন খাবারটি সে আগে ক’বার খেয়েছে সেই আলাপে মত্ত, ঠিক তখন সিংহাসন হাতবদলের নাটকীয় মুহূর্ত এল। বনের পশুরা তাতে যেন বরং আহ্লাদে মেতে উঠল। ‘টারজান’ আবার তার মনভোলানো কথা দিয়ে সবাইকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করল আর একদলকে চরম ক্ষেপিয়ে তুলল মুচোর বিরুদ্ধে। সেইবার টারজান নিজেই বনের রাজা হয়ে গেল ষড়যন্ত্রের চালে সাজানো নিয়মে।
তবে বনের রাজ্যে রাজার পালাবদল হলেও তাদের প্রাণের হারানো স্পন্দন তারা ফিরে পেল না। বরং বনটি যেন আরও ক্ষিপ্র শিকারিদের জন্য খেকো হয়ে উঠল। বনের এই ঘোর অমানিশার মাঝে, এখন সেই মায়াবী হরিণটির দিন কাটে বিষণ্ণতায়। তার সজল কালো চোখে আগের ঘাসফুলের আনন্দ নেই। বনের সেই ঘ্রাণ, যা একসময় তাকে প্রাণশক্তি জোগাত, আজ সেখানে লালার উৎকট গন্ধ আর চাটুকারদের পদলেহনের আওয়াজ।
চুঙ্কার বনের আত্মাটা যেন তিল তিল করে মরে যেতে লাগল। রাশভারী সিংহের সেই প্রতাপশালী চুঙ্কার বনে বিষণ্ণ আওয়াজ চাকচিক্যের নীরবতায় মিলিয়ে গেছে। তবে সেই কথাটি এখন অনেককে বিশ্বাস করানোই কষ্টকর।

















