মারিনেলা সেনাতোরে : অন্যদের এগিয়ে দিয়ে জেগে উঠেন যেই শিল্পী
- আপডেট সময় : ০২:২৯:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬
- / 95
শিল্পকলা কি কেবল গ্যালারির চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি কোনো বিষয়? নাকি শিল্প হতে পারে রাজপথের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বর্তমানে যে বিশ্বখ্যাত শিল্পীর নাম সবার আগে আসবে, তিনি হলেন ইতালীয় মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি শিল্পী মারিনেলা সেনাতোরে। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে সমসাময়িক শিল্পকলায় তাঁর ‘পার্টিসিপেটরি আর্ট’ বা অংশগ্রহণমূলক শিল্পকর্ম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
মারিনেলা সেনাতোরে একজন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর এবং একাধারে সঙ্গীত, নৃত্য এবং আলোকসজ্জার কারিগর। শিল্পের উপকরণ হিসেবে রঙতুলির চেয়ে বরং মানুষকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস- সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিল্প পূর্ণতা পায় না।
এজন্য তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্মে স্থানীয় জনতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে নাচ, গান বা অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেদের অধিকার ও সংহতির কথা জানায়।
মারিনেলার কাজের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো তাঁর বিশাল আকারের আলোর স্থাপনা বা ‘লুমিনারিয়া’। দক্ষিণ ইতালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবের আলোকসজ্জাকে তিনি নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর তৈরি করা বিশালাকার সব তোরণ ও আলোক সজ্জায় ফুটে ওঠে অনুপ্রেরণামূলক বিভিন্ন স্লোগান। বিশেষ করে তাঁর একটি জনপ্রিয় উক্তি এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের মুখে মুখে— “We Rise by Lifting Others” অন্যদের এগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই আমরা জেগে উঠি।
২০২০ সালে বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস ‘ডিওর’ (Dior)-এর একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে তাঁর এই আলোক স্থাপনাগুলো বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়, যেখানে ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল। ১৯৭৭ সালে ইতালির কাভা দে তিরেনিতে তাঁর জন্ম।
তিনি এমন এক বহুমুখী শিল্পরীতির চর্চা করেন, যা সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সামাজিক আচার এবং অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতির নান্দনিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে। তাঁর সৃজনশীল গবেষণার পরিধি বিশাল; যার মধ্যে রয়েছে ইনস্টলেশন, ট্যাপেস্ট্রি, কোলাজ, চলচ্চিত্র এবং দলগত পারফরম্যান্স। সম্প্রদায়-ভিত্তিক উদ্যোগ এবং গণ-অংশগ্রহণের মাধ্যমেই তাঁর কাজগুলো পূর্ণতা পায়। যেখানে সাধারণ পাঠ্য, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প, লোকজ সংস্কৃতি, কোরিওগ্রাফি, শব্দ, স্থাপত্য এবং আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় জনপরিসরকে উজ্জীবিত করতে। তাঁর শিল্পকর্ম বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্য রোধ, শ্রমিক অধিকার এবং সামাজিক সমতার প্রশ্নে অত্যন্ত জোরালো বার্তা দেয়।
২০১২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য স্কুল অফ ন্যারেটিভ ডান্স’ (SOND)—যা একটি মুক্ত, ভ্রাম্যমাণ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম। ক্ষমতায়ন এবং সম্মিলিত গল্প বলার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত বিশ্বের ২৩টি দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। এতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, এক্টিভিস্ট, কারিগর এবং অপেশাদার শিল্পীরা একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান।
মারিনেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি এই ‘দ্য স্কুল অব ন্যারেটিভ ড্যান্স’। এটি একটি ভ্রাম্যমাণ প্ল্যাটফর্ম। যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনের গল্পগুলো নাচের মাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ পায়। ইতালি থেকে শুরু করে লন্ডন, এমনকি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও এই স্কুলের মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেন।
মারিনেলা সেনাতোরে মনে করিয়ে দেন যে, সাফল্য বা উত্থান কখনো একার হওয়া উচিত নয়। তাঁর প্রতিটি কাজে একতার প্রতিফলন দেখা যায়, যা বর্তমান অস্থির বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর দর্শনে— শিল্প মানেই হলো একে অপরের হাত ধরে উপরে ওঠা।
ইতালির ভেনিস শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান সেন্ট মার্কস স্কয়ার (Piazza San Marco)-এ তিনটি বিশাল সংযুক্ত দালান নিয়ে স্থাপিত এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা প্রোকুরাতি। এখানে গত ৭ মে থেকে শুরু হয়েছে ৬১তম দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনী । প্রদর্শনী চলবে ১১ মে পর্যন্ত। যাদের লক্ষ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে বসবাসকারী মানুষের সম্ভাবনাকে উন্মোচন করা, যাতে তারা তাদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের জীবন পরিবর্তন করতে পারে।
২৫টি দেশে সামাজিক উদ্যোগসহ ৯৮টি অংশীদারের একটি নেটওয়ার্ক নিয়ে সক্রিয় ‘দ্য হিউম্যান সেফটি নেট’ এই বিয়েনালের কাজ করছে। ভেনিসের এই বিয়েনাল সহ বিশ্বের বড় বড় সব আর্ট উৎসবে মারিনেলা সেনাতোরের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে।
প্যারিসের সেন্টার পম্পিদু ও পালে দ্য টোকিও, জুরিখ কুন্সথাউস, শিকাগো মিউজিয়াম অফ কনটেম্পরারি আর্ট এবং বার্লিনিশে গ্যালারির মতো নামকরা জাদুঘরে তাঁর কাজ নিয়মিত প্রদর্শিত হয়। এছাড়া ভেনিস, সাও পাওলো এবং চীনের চেংডু বিয়েনালের মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক শিল্প উৎসবেও তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।সেনাতোরের শিল্পকর্ম বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

















