Bangladesh ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::

কীর্তিমান পিতার কালজয়ী সন্তান শিল্পী মুস্তাফা মানোয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / 34

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন নদীয়া জেলায় (বর্তমান মাগুরা) এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পিতা বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কবি গোলাম মোস্তফা এবং মাতা জমিলা খাতুন। তাঁর মাতুলালয় (জন্মস্থান) মাগুরার নাকোল গ্রামে হলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। শৈশব থেকেই পরিবারে সাহিত্য ও শিল্পের এক চমৎকার পরিবেশ পেয়েছিলেন তিনি।

তিনি প্রথমে কলকাতায় কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু মন টানত চারুকলার দিকে। তখন বিজ্ঞান ছেড়ে চারুকলা কলেজে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফা ছেলের এই শিল্পপ্রেমকে সানন্দে সমর্থন করেছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ার বলতেন, বাবার উদারতা এবং পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের আবহ সুপ্তাবস্থায় তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। পিতাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা কখনো তাঁর ওপর নিজের কোনো ইচ্ছা জোর করে চাপিয়ে দেননি।

কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ফাইন আর্টসে স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করার পর থেকেই তাঁর পেশাদার শিল্পযাত্রার শুরু। এরপর তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে, সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশে টেলিভিশন মাধ্যমের বিকাশে তিনি অগ্রণীয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক থাকাকালীন তিনি বহু কালজয়ী নাটক, নৃত্যনাট্য ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন।

মুস্তাফা মনোয়ারকে বলা হয় বাংলাদেশের “পাপেটের জনক”। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর এই পাপেট শিল্প এক অনন্য হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যুদ্ধের তীব্রতা, ঘরবাড়ি হারানোর বেদনা এবং অনাহার মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে। এই চরম মানসিক বিপর্যস্ততার সময়ে তিনি পাপেট বা পুতুলনাট্যকে বেছে নেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। কলকাতার শরণার্থী শিবিরগুলোতে তিনি পুতুলনাচ প্রদর্শনীর মাধ্যমে একদিকে যেমন যুদ্ধপীড়িত মানুষকে বিনোদন ও সাহস জুগিয়েছেন, অন্যদিকে বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এর আগে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান দিবসে বিটিভির ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে পাকিস্তানি পতাকা প্রদর্শন না করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুর দশকগুলোতে মুস্তাফা মনোয়ারের পরিবেশনাগুলো ছিল এদেশের শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও নীতিশিক্ষা দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। শৈশবের মনস্তত্ত্বকে বুঝে তিনি যেভাবে পাপেট ও রূপকথাকে টেলিভিশনের পর্দায় এনেছিলেন, তা আজ আমাদের সংস্কৃতির সোনালী ইতিহাস। বিটিভিতে তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ছিল ‘মনের কথা’, যা টানা ১২ বছর প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’-কে দেশের প্রতিটি শিশুর কাছে পরিচিত করে তোলেন। বাঘা দেখতে বাঘের মতো হলেও সে ছিল অত্যন্ত সরল, পরোপকারী এবং সত্যবাদী। বাঘার মুখের সরল কিন্তু গভীর সত্যের বাণী আজও এক প্রজন্মের স্মৃতিতে অমলিন।

মুস্তাফা মনোয়ার নিজে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। তিনি বাঘা এবং অন্যান্য পাপেট চরিত্রদের সাথে গল্প করতেন, ছবি আঁকতেন এবং তাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন। কোনো রকম কঠোর উপদেশ না দিয়ে পাপেটদের মজার সব কাণ্ডকীর্তি ও কথোপকথনের ছলে শিশুদের সততা, পরিবেশ সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পাঠ দেওয়া হতো।

একই সাথে বাঙালি শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি লোকগাথা ও বিশ্বখ্যাত রূপকথাগুলোকে পাপেট থিয়েটারের মাধ্যমে টেলিভিশনে রূপান্তর করেন। বিখ্যাত লোকগাথা ‘সাত ভাই চম্পা’ অবলম্বনে তিনি টিভিতে পাপেট শো নির্মাণ করেন, যেখানে পারুল ও তার সাত ভাইয়ের গল্পটি পাপেটের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য নাইটিঙ্গেল’ এবং ‘দ্য আগলি ডাকলিং’-এর মতো বিখ্যাত বিদেশী গল্পগুলোকেও তিনি দেশীয় আবহে পাপেট নাট্যের মাধ্যমে বিটিভিতে উপস্থাপন করেছিলেন।

টেলিভিশনে তাঁর অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি ক্যামেরার সামনে শিশুদের খুব সহজ পদ্ধতিতে কাগজের টুকরো কেটে ফুল, পাখি বা বিভিন্ন অবয়ব তৈরি করা শেখাতেন। জলরঙের সহজ ছোঁয়ায় কীভাবে একটি ক্যানভাসে গল্প তৈরি করা যায়, তা তিনি পর্দায় লাইভ করে দেখাতেন। এর ফলে আশির ও নব্বইয়ের দশকের শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতার এক বিপুল জোয়ার তৈরি হয়েছিল। “শিশুদের মন হলো কাদামাটির মতো, সেখানে শিল্পের ছোঁয়া দিলে তারা সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে”—মুস্তাফা মনোয়ারের এই দর্শনই প্রতিফলিত হতো তাঁর প্রতিটি টেলিভিশন পরিবেশনায়। তিনি তাঁর মায়াবী পাপেট ও বাউল গানের সুরের মাধ্যমে শিশুদের কল্পনার জগৎকে জীবন্ত করে তুলতেন।

শিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ার জলরঙের কাজে এক অসামান্য স্বকীয়তা তৈরি করেছেন। তাঁর চিত্রকর্মে বাংলাদেশের নদী, আকাশ, গ্রামীণ জীবন এবং মানুষের ভেতরের সহজ রূপটি বারবার উঠে এসেছে। শিল্পী হিসেবে তাঁর এই জলরঙের কাজ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত প্রশংসিত। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের (নিলী) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারসহ নানা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভোগার পর, সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কর্মমুখর দিন কাটিয়েছেন।  এরপর সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর প্রিয় চারুকলা অনুষদে, যেখানে তিনি একসময় শিক্ষকতা করেছিলেন।  শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

 

শেয়ার করুন

কীর্তিমান পিতার কালজয়ী সন্তান শিল্পী মুস্তাফা মানোয়ার

আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন নদীয়া জেলায় (বর্তমান মাগুরা) এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পিতা বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত কবি গোলাম মোস্তফা এবং মাতা জমিলা খাতুন। তাঁর মাতুলালয় (জন্মস্থান) মাগুরার নাকোল গ্রামে হলেও তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। শৈশব থেকেই পরিবারে সাহিত্য ও শিল্পের এক চমৎকার পরিবেশ পেয়েছিলেন তিনি।

তিনি প্রথমে কলকাতায় কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু মন টানত চারুকলার দিকে। তখন বিজ্ঞান ছেড়ে চারুকলা কলেজে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফা ছেলের এই শিল্পপ্রেমকে সানন্দে সমর্থন করেছিলেন। মুস্তাফা মনোয়ার বলতেন, বাবার উদারতা এবং পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের আবহ সুপ্তাবস্থায় তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। পিতাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা কখনো তাঁর ওপর নিজের কোনো ইচ্ছা জোর করে চাপিয়ে দেননি।

কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে ফাইন আর্টসে স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করার পর থেকেই তাঁর পেশাদার শিল্পযাত্রার শুরু। এরপর তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে, সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশে টেলিভিশন মাধ্যমের বিকাশে তিনি অগ্রণীয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক থাকাকালীন তিনি বহু কালজয়ী নাটক, নৃত্যনাট্য ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেন।

মুস্তাফা মনোয়ারকে বলা হয় বাংলাদেশের “পাপেটের জনক”। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর এই পাপেট শিল্প এক অনন্য হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যুদ্ধের তীব্রতা, ঘরবাড়ি হারানোর বেদনা এবং অনাহার মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে। এই চরম মানসিক বিপর্যস্ততার সময়ে তিনি পাপেট বা পুতুলনাট্যকে বেছে নেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। কলকাতার শরণার্থী শিবিরগুলোতে তিনি পুতুলনাচ প্রদর্শনীর মাধ্যমে একদিকে যেমন যুদ্ধপীড়িত মানুষকে বিনোদন ও সাহস জুগিয়েছেন, অন্যদিকে বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এর আগে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান দিবসে বিটিভির ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে পাকিস্তানি পতাকা প্রদর্শন না করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুর দশকগুলোতে মুস্তাফা মনোয়ারের পরিবেশনাগুলো ছিল এদেশের শিশু-কিশোরদের বিনোদন ও নীতিশিক্ষা দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। শৈশবের মনস্তত্ত্বকে বুঝে তিনি যেভাবে পাপেট ও রূপকথাকে টেলিভিশনের পর্দায় এনেছিলেন, তা আজ আমাদের সংস্কৃতির সোনালী ইতিহাস। বিটিভিতে তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ছিল ‘মনের কথা’, যা টানা ১২ বছর প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’-কে দেশের প্রতিটি শিশুর কাছে পরিচিত করে তোলেন। বাঘা দেখতে বাঘের মতো হলেও সে ছিল অত্যন্ত সরল, পরোপকারী এবং সত্যবাদী। বাঘার মুখের সরল কিন্তু গভীর সত্যের বাণী আজও এক প্রজন্মের স্মৃতিতে অমলিন।

মুস্তাফা মনোয়ার নিজে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। তিনি বাঘা এবং অন্যান্য পাপেট চরিত্রদের সাথে গল্প করতেন, ছবি আঁকতেন এবং তাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেন। কোনো রকম কঠোর উপদেশ না দিয়ে পাপেটদের মজার সব কাণ্ডকীর্তি ও কথোপকথনের ছলে শিশুদের সততা, পরিবেশ সচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধের পাঠ দেওয়া হতো।

একই সাথে বাঙালি শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি লোকগাথা ও বিশ্বখ্যাত রূপকথাগুলোকে পাপেট থিয়েটারের মাধ্যমে টেলিভিশনে রূপান্তর করেন। বিখ্যাত লোকগাথা ‘সাত ভাই চম্পা’ অবলম্বনে তিনি টিভিতে পাপেট শো নির্মাণ করেন, যেখানে পারুল ও তার সাত ভাইয়ের গল্পটি পাপেটের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘দ্য নাইটিঙ্গেল’ এবং ‘দ্য আগলি ডাকলিং’-এর মতো বিখ্যাত বিদেশী গল্পগুলোকেও তিনি দেশীয় আবহে পাপেট নাট্যের মাধ্যমে বিটিভিতে উপস্থাপন করেছিলেন।

টেলিভিশনে তাঁর অনুষ্ঠানগুলোতে তিনি ক্যামেরার সামনে শিশুদের খুব সহজ পদ্ধতিতে কাগজের টুকরো কেটে ফুল, পাখি বা বিভিন্ন অবয়ব তৈরি করা শেখাতেন। জলরঙের সহজ ছোঁয়ায় কীভাবে একটি ক্যানভাসে গল্প তৈরি করা যায়, তা তিনি পর্দায় লাইভ করে দেখাতেন। এর ফলে আশির ও নব্বইয়ের দশকের শিশুদের মধ্যে সৃজনশীলতার এক বিপুল জোয়ার তৈরি হয়েছিল। “শিশুদের মন হলো কাদামাটির মতো, সেখানে শিল্পের ছোঁয়া দিলে তারা সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে”—মুস্তাফা মনোয়ারের এই দর্শনই প্রতিফলিত হতো তাঁর প্রতিটি টেলিভিশন পরিবেশনায়। তিনি তাঁর মায়াবী পাপেট ও বাউল গানের সুরের মাধ্যমে শিশুদের কল্পনার জগৎকে জীবন্ত করে তুলতেন।

শিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ার জলরঙের কাজে এক অসামান্য স্বকীয়তা তৈরি করেছেন। তাঁর চিত্রকর্মে বাংলাদেশের নদী, আকাশ, গ্রামীণ জীবন এবং মানুষের ভেতরের সহজ রূপটি বারবার উঠে এসেছে। শিল্পী হিসেবে তাঁর এই জলরঙের কাজ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত প্রশংসিত। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের (নিলী) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্প-সংস্কৃতিতে অসামান্য ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারসহ নানা বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভোগার পর, সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কর্মমুখর দিন কাটিয়েছেন।  এরপর সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর প্রিয় চারুকলা অনুষদে, যেখানে তিনি একসময় শিক্ষকতা করেছিলেন।  শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।