বুকের ভেতর ক্ষোভের পাহাড়, মুখে শান্তির বাণী:
প্রতিশোধের বৃত্ত ভাঙার এক মানবিক উপাখ্যান
- আপডেট সময় : ০১:০৫:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
- / 236
রাজনীতির মঞ্চে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় মেলে চরম সংকটে এবং বিজয়ের মুহূর্তে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর, বাংলাদেশ যখন এক নতুন দিগন্তে পা রাখে, তখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পরিবর্তনের সুর ধ্বনিত হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে, যা আজ জুলাই বিপ্লবের বর্ষপূর্তিতে আরও একবার দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হলো।
সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ যে বক্তব্যটি দিলেন, তা কেবল ইমপ্রেসিভই ছিল না, বরং তা ছিল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক যুগান্তকারী রূপরেখা। ক্ষমতার অপব্যবহার বা অতীতের অন্যায়ের পাল্টা আঘাত নয়, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা এই মুহূর্তে দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়াকে ধারণ করে।
তিনি তাঁর বক্তব্যে নিজের আবেগঘন ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার পরিচয় দিয়ে বলেন, বিগত সাতটি বছর তাঁর পরিবার ও দলের ওপর যে অবর্ণনীয় জুলুম-নির্যাতন চলেছে, ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পর তিনি যদি আজ তাঁর মা খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চাইতেন—এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়া উচিত কি না? তবে তিনি নিশ্চিত, তাঁর মা কখনই প্রতিশোধের পথে হাঁটার পরামর্শ দিতেন না। একইভাবে, অকালে চলে যাওয়া তাঁর ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর ওপর যে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তার বিচার বা প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে যদি তিনি প্রশ্ন করতেন, তবে কোকোও বলতেন ব্যক্তিগত ক্ষোভ ভুলে দেশকে গড়ে তোলাই এখন প্রধান দায়িত্ব।
নেতৃত্বের এই উদারতার বীজ কিন্তু বপন করা হয়েছিল আরও আগেই। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ৫ আগস্টের পর যখন গোটা দেশ এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাসপাতালের শয্যায় থেকেও বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীকে শান্ত থাকার বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি প্রতিশোধের রাজনীতিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার ডাক দেন। তরুণ প্রজন্ম বুক পেতে দিয়ে যে স্বাধীনতা এনেছে, তার মর্যাদা রক্ষায় সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি।
এমনকি গত বছর জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত বিশেষ কর্মসূচিতেও ভিডিও বার্তায় বেগম জিয়া যে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা ছিল এক রাষ্ট্রনায়কোচিত রূপরেখা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন:
নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই সুযোগকে কোনোভাবেই নষ্ট করা যাবে না।
বিগত সরকারের আমলে যারা গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
শহীদ ও আহত পরিবারের পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা আবশ্যক।
জনগণের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যেকোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, বেগম খালেদা জিয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে যে নিষ্ঠুর আচরণের মুখোমুখি হয়েছেন, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। পরিত্যক্ত কারাগারে অবরুদ্ধ রাখা, উন্নত চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং প্রতিনিয়ত নানামুখী অপপ্রচারের শিকার হওয়ার পরও, ক্ষমতা বদলের পর তিনি একটি বারের জন্যও প্রতিহিংসামূলক বা কুরুচিপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ করেননি। রাজনৈতিক বৈরিতার ঊর্ধ্বে উঠে এমন মার্জিত ও দূরদর্শী আচরণ কেবল একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার পক্ষেই সম্ভব।
আজকের সম্মেলনে তারেক রহমানের কণ্ঠে মায়ের সেই আদর্শেরই প্রতিধ্বনি শোনা গেল। এই বক্তব্য প্রমাণ করে, অতীতের রক্তক্ষয়ী ও প্রতিহিংসার বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ এখন এক পরিপক্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির দিকে এগিয়ে যেতে চাইছে।



















