০৪:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
ফরিদপুরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন মুম্বাই বিমানবন্দরে ১২ কোটি রুপির মাদকসহ সাবেক ‘মিসেস কেরালা’ প্রতিযোগী গ্রেপ্তার সকলকে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে -পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আগ্রহের কেন্দ্রে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতির নির্বাচন বিশ্বকাপে প্রথম খেলায় চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে কোরিয়ার জয় প্রতারক সন্দেহে খাসি ব্যবসায়ীকে বাড়িতে ডেকে মহিলাদের নির্যাতন, টাকা লুটের অভিযোগ লাল কার্ডের রেকর্ডেও উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের ধারায় মেক্সিকো দাঙ্গা আর মামলার ঝক্কি এড়িয়ে শান্তি ফিরবে কি অশান্ত সালথায়? নীরব ঘাতক ‘ফ্যাটি লিভার’: সচেতনতাই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি স্কুলের সামনে বিটুমিন পোড়ানোর ধোঁয়ায় অসুস্থ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা
সম্পাদকীয়

সোসাল মিডিয়ার কনটেন্ট যখন অশালীনতার হাতিয়ার

প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৪২:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • / 72

দেশে মিডিয়া জগতে এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এই সুযোগকে লুফে নিয়ে মোজো সাংবাদিকতার বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। তবে মোবাইল সাংবাদিকতার প্রচলনের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের। আর বর্তমানে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এক ভয়াবহ ও কদর্য প্রবণতার চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন জেলা শহর ফরিদপুরে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর্মকান্ড ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সারদা সুন্দরি কলেজের সামনে একনাগাড়ে দাড়িয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আবার সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেওয়ার পরপরই এবার সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যসূচক কনটেন্ট তৈরি করে সোসাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এনিয়ে সোসাল মিডিয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দাবি উঠেছে, এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কোন পক্ষ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগ না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে এসব।
মিডিয়ার বিস্তারের মূল লক্ষ্য যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা, সেখানে মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে ব্যবহার করে বর্তমানে এই অশালীনতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং বিশেষ করে নারীদের হেনস্তা করার এক অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

অথচ মোবাইল সাংবাদিকতার কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত ও বিস্তৃত সংবাদ প্রকাশ। কিন্তু বর্তমানে এটি অনেক ক্ষেত্রে কনটেন্ট তৈরির নামে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের অপ্রস্তুত মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার মাধ্যমে ভিউ পাওয়ার উপায়ে পরিণত হয়েছে।

তথাকথিত ‘নিউজ’ বা ‘টিভি’ নামধারী ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলগুলো ব্যক্তিগত অপমানকে ‘বিক্রির পণ্য’ বানাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে স্রেফ কৌতূহল বা শরীরী আকর্ষণের ভিডিও প্রচার করে এই নোংরা খেলায় শামিল হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি বা শাহবাগের মতো জনপরিসরে ক্যামেরা জুম করে নারীদের বিব্রত করা কিংবা পুলিশের তল্লাশি বা অভিযানের সময় মানুষকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় জনসমক্ষে উন্মোচিত করা হচ্ছে। এটি সাংবাদিকতা নয়, বরং ‘মিডিয়া ট্রায়াল’এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিদ্যমান আইনে নারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিচার থাকলেও, এর প্রয়োগ মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ। নারীর মর্যাদা বা নাজুক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় রাষ্ট্রের তৎপরতা খুবই নগণ্য। অনিবন্ধিত পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই ‘শিকারি লেন্স’সংস্কৃতি অবাধ তথ্য প্রবাহের সহজলভ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করছে। আবার সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। জনস্বার্থ আর ব্যক্তিগত অপমানকে গুলিয়ে ফেলার ফলে আমজনতা আস্থা হারাচ্ছে।

কারও ভয়, লজ্জা বা ব্যক্তিগত মুহূর্তকে ‘কনটেন্ট’ বানানো এক ধরনের নিপীড়ন। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুক্তির দোহাই দিয়ে এই কদর্য প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না; বরং নাগরিক মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায়, এটি সমাজের জন্য একটি সমস্যায় পরিণত হবে।

শেয়ার করুন

সম্পাদকীয়

সোসাল মিডিয়ার কনটেন্ট যখন অশালীনতার হাতিয়ার

আপডেট সময় : ০৩:৪২:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

দেশে মিডিয়া জগতে এক বিরাট পরিবর্তন এসেছে সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এই সুযোগকে লুফে নিয়ে মোজো সাংবাদিকতার বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। তবে মোবাইল সাংবাদিকতার প্রচলনের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের। আর বর্তমানে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এক ভয়াবহ ও কদর্য প্রবণতার চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন জেলা শহর ফরিদপুরে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর্মকান্ড ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সারদা সুন্দরি কলেজের সামনে একনাগাড়ে দাড়িয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আবার সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেওয়ার পরপরই এবার সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যসূচক কনটেন্ট তৈরি করে সোসাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এনিয়ে সোসাল মিডিয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দাবি উঠেছে, এদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কোন পক্ষ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য লিখিত অভিযোগ না করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে এসব।
মিডিয়ার বিস্তারের মূল লক্ষ্য যেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং জনস্বার্থ রক্ষা করা, সেখানে মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে ব্যবহার করে বর্তমানে এই অশালীনতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং বিশেষ করে নারীদের হেনস্তা করার এক অসুস্থ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

অথচ মোবাইল সাংবাদিকতার কিংবা কনটেন্ট ক্রিয়েটের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত ও বিস্তৃত সংবাদ প্রকাশ। কিন্তু বর্তমানে এটি অনেক ক্ষেত্রে কনটেন্ট তৈরির নামে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের অপ্রস্তুত মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দি করে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার মাধ্যমে ভিউ পাওয়ার উপায়ে পরিণত হয়েছে।

তথাকথিত ‘নিউজ’ বা ‘টিভি’ নামধারী ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলগুলো ব্যক্তিগত অপমানকে ‘বিক্রির পণ্য’ বানাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে স্রেফ কৌতূহল বা শরীরী আকর্ষণের ভিডিও প্রচার করে এই নোংরা খেলায় শামিল হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি বা শাহবাগের মতো জনপরিসরে ক্যামেরা জুম করে নারীদের বিব্রত করা কিংবা পুলিশের তল্লাশি বা অভিযানের সময় মানুষকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় জনসমক্ষে উন্মোচিত করা হচ্ছে। এটি সাংবাদিকতা নয়, বরং ‘মিডিয়া ট্রায়াল’এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন।

বিদ্যমান আইনে নারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিচার থাকলেও, এর প্রয়োগ মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ। নারীর মর্যাদা বা নাজুক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় রাষ্ট্রের তৎপরতা খুবই নগণ্য। অনিবন্ধিত পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই ‘শিকারি লেন্স’সংস্কৃতি অবাধ তথ্য প্রবাহের সহজলভ্যতাকে প্রশ্নের সম্মুখিন করছে। আবার সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। জনস্বার্থ আর ব্যক্তিগত অপমানকে গুলিয়ে ফেলার ফলে আমজনতা আস্থা হারাচ্ছে।

কারও ভয়, লজ্জা বা ব্যক্তিগত মুহূর্তকে ‘কনটেন্ট’ বানানো এক ধরনের নিপীড়ন। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুক্তির দোহাই দিয়ে এই কদর্য প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না; বরং নাগরিক মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায়, এটি সমাজের জন্য একটি সমস্যায় পরিণত হবে।