৭ বছরের বঞ্চনা আর বাড়তি করের বোঝা ফরিদপুরবাসীর কাঁধে
ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন আর কত দূর?
- আপডেট সময় : ১০:৫৭:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / 16
বিধিমালা অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার সবগুলো শর্ত পূরণ করার পরেও গত সাত বছর ধরে আটকে আছে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রস্তাবনা। এর ফলে একদিকে, এখানকার নাগরিকেরা পৌরসভার বাসিন্দা হয়েও সিটি কর্পোরেশনের অনুরুপ উচ্চ হারে কর প্রদান করছেন। অন্যদিকে, বর্ধিত এলাকা নিয়ে পৌরসভার সীমানা গঠনের পর বেশিরভাগ এলাকাতেই প্রয়োজনীয় নাগরিকসেবা মিলছে না। এতে বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন এই অঞ্চলের সাড়ে পাঁচ লাখ বাসিন্দা। বিগত সরকারের পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের কারণে এই স্থবিরতা তৈরি হলেও, সম্প্রতি বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন পাওয়ার পরে ফরিদপুরবাসীর মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে।
জানা গেছে, ১১ বছর আগে ২০১৫ সালে সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলে ফরিদপুর পৌরসভার সাধারণ নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ২০১৮ সালের ২ আগস্ট প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রারম্ভিক সচিব কমিটি তথা প্রি-নিকারের বৈঠকে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা ২০১০ অনুযায়ী বিদ্যমান পৌরসভা সম্প্রসারিত এলাকা নিয়ে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এক নম্বর এজেন্ডায় রেখে নিকারের ১১৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আর ওই বৈঠকে তিনটি বিধি-বহির্ভূত শর্ত জুড়ে দিলে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হয়ে যায়। ওই বৈঠককের পর জানানো হয়, বিদ্যমান পৌরসভা এবং সম্প্রসারিত এলাকা নিয়ে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন প্রদান করা হলো। তবে এখন থেকে কেবল বিভাগীয় সদর দপ্তরে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা যাবে এবং ফরিদপুর বিভাগ স্থাপন সাপেক্ষে সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার উল্লেখিত প্রস্তাব কার্যকর হবে। যদিও ‘স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা, ২০১০’ অনুযায়ী বিভাগ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে কোনো সিটি কর্পোরেশন গঠনের কথা উল্লেখ নেই।
বিভাগীয় সদর দপ্তর ছাড়া সিটি কর্পোরেশন হবে না—২০১৯ সালে ফরিদপুরের বেলায় এই শর্ত জুড়ে দিলেও সম্প্রতি কোনো বিভাগীয় সদর দপ্তর না হওয়া সত্ত্বেও দ্রুততম সময়ে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর ফলে ফরিদপুরের প্রতি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, ফরিদপুরের ক্ষেত্রে ওই শর্তগুলো ছিলো জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকারের একটি রাজনৈতিক চাল। এতে ফরিদপুর পৌরসভার কোনো প্রশাসনিক পূনর্বিন্যাস না হলেও পৌরসভার পরিধি ও করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় জনগণের ঘাড়ে। সিটি কর্পোরেশন গঠনের লক্ষ্যে সাত বছর আগে ফরিদপুর পৌরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ৯টি থেকে বাড়িয়ে ২৭টি করা হয় এবং আয়তন ও জনসংখ্যা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে মর্যাদা না বাড়ায় চরম সংকটে পড়েছে এই ‘এ’ শ্রেণির পৌরসভাটি।
৬৬.৫৪ বর্গকিলোমিটার ও সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ফরিদপুর পৌরসভার জন্য বার্ষিক বরাদ্দ মাত্র ৭৮ থেকে ৮০ লাখ টাকা। অথচ মাত্র ৪.৮৬ বর্গকিলোমিটার ও ৩৭ হাজার ৮০২ জন জনসংখ্যার ৯ ওয়ার্ডের গোয়ালন্দ পৌরসভার বরাদ্দও একই। টাকার অভাবে রাস্তাঘাট সংস্কার হচ্ছে না, মশক নিধন কার্যক্রম বন্ধের মুখে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। শহরে সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, স্ট্রিট লাইট জ্বলছে না এবং জমি কেনা থাকলেও ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা যাচ্ছে না। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্যানিটেশন ব্যবস্থাও হুমকির মুখে।
এ অবস্থায় গত ১৭ এপ্রিল ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত “ফরিদপুরে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের উপস্থিতিতে ফরিদপুর অঞ্চলের সংসদ সদস্য ও নেতৃবৃন্দ ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়নের দাবিটি পুনরায় উত্থাপন করেন।
ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বলেন, যেকোনো মূল্যে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়ন করতে হবে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিয়ে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদি সংকটে ফেলেছে। আমার প্রত্যাশা, বর্তমান জননন্দিত গণতান্ত্রিক সরকার ফরিদপুরবাসীর এই ন্যায্য দাবি দ্রুত পূরণ করবে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী বলেন, ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ ঝুলিয়ে রাখায় পৌরসভার যাবতীয় কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। একদিকে ট্যাক্স বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিক সুবিধা উধাও। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের বিধিমালা অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন গঠনের আটটি শর্তের সবকটিই পূরণ করেছে ফরিদপুর। ওই বিধিমালায় ন্যূনতম ৪ লাখ জনসংখ্যা থাকার কথা বলা হলেও ফরিদপুরের বর্তমান জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩ হাজার মানুষের বসবাসের শর্ত থাকলেও ফরিদপুরে এই ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮ হাজার। বার্ষিক স্থানীয় আয়ের উৎস ন্যূনতম ৫ কোটি এবং পৌরসভার নিজস্ব আয় ১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও, ফরিদপুরের ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ২০ কোটি এবং ৫১ কোটি টাকা। ন্যূনতম ২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শর্তের বিপরীতে ফরিদপুর পৌরসভার বর্তমান আয়তন ৬৬ বর্গকিলোমিটার। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকার শর্ত রয়েছে, যেখানে ফরিদপুরে ছোট-বড় ২২৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল আছে। ভবিষ্যতে সম্প্রসারণযোগ্য ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধা এবং সিটি কর্পোরেশন গঠনের পক্ষে অনুকূল স্থানীয় জনমত—যার দুটি শর্তই ফরিদপুরে বিদ্যমান।
এব্যাপারে ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সভাপতি আওলাদ হোসেন বাবর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই অঞ্চলের বাসিন্দা হয়েও ফরিদপুরের মানুষকে বঞ্চিত করেছেন। এই ঐতিহাসিক পৌরসভার বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়ন করার জোর দাবি জানান তিনি।
ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, দুর্বোধ্য এক কারণে আমাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। ফরিদপুর পৌরসভা ১৮৬৯ সালে স্থাপিত হয়। সিটি কর্পোরেশন না হওয়ায় এখানকার অধিবাসীরা তাদের প্রাপ্য নাগরিক সেবা ও সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সকল শর্ত পূরণ করার পরেও ফরিদপুরবাসী কেনো বৈষম্যের শিকার হবে? এই প্রশ্ন রেখে অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, আশা করি বর্তমান সরকার এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।

















