পর্যাপ্ত সরবরাহ সরকারের
সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চড়া দামে বিক্রি, দিশেহারা কৃষক
- আপডেট সময় : ১০:৫৮:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 55
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ফরিদপুরে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, চাহিদা বাড়ার সুযোগে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশি দামে সার বিক্রি করছে।
দেশের কৃষকদের জন্য সরকার প্রণোদনা এবং ভর্তুকির মাধ্যমে এই সার বিক্রি করে ডিলারদের দিয়ে। মৌসুম অনুযায়ী ফসলের জন্য ফি’বছর প্রণোদনা দেয় সরকার। বাকিটুকু বিক্রি করে ভর্তুকি দামে। এই সারের সংকট দেখিয়ে কৃষকদের মাঝে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১,৩৫০ টাকা, টিএসপি ১,৩৫০ টাকা, ডিএপি ১,০৫০ টাকা এবং এমওপি ১,০০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হচ্ছে ডিএপি সারে—১,০৫০ টাকার সার বিক্রি হচ্ছে ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকায়। এছাড়া, অনেক জায়গায় সারের সঙ্গে জোরপূর্বক অপ্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
কৃষকদের পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতাদেরও দাবি, বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলাররা তাদের কাছ থেকেই বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি রাখছেন। ফলে খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, ডিলারদের একটি অংশ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন এবং সারের আঞ্চলিক গুদাম কর্মকর্তাদের দায়ী করে বলেছেন, গুদাম থেকে সার উত্তোলনের সময়ই রশিদের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।
সদর উপজেলার কানাইপুরের কৃষক লিয়াকত শেখ বলেন, আমরা জমিতে ফসল ফলাই, কিন্তু সার কিনতে গেলেই বাড়তি টাকার চিন্তা করতে হয়। সরকার যে দামে সার দেওয়ার কথা বলছে, সেই দামে যদি না পাই, তাহলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফসলের দাম কম হলে তখন লোকসান সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সালথা উপজেলার কৃষক মহসিন ব্যাপারী বলেন, সার ছাড়া চাষ করা সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজনের সময় বেশি দাম হলেও কিনতে বাধ্য হই। আমরা চাই, সরকারি দামে সার বিক্রি নিশ্চিত করা হোক। কৃষকের কষ্টের টাকা যেন কেউ অন্যায়ভাবে নিয়ে যেতে না পারে। বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর এলাকার কৃষক রুস্তুম শেখ অভিযোগ করেন, সাতৈর বাজারের মেসার্স স্বপ্ন কৃষি ভান্ডারে সার কিনতে গেলে একপ্রকার জিম্মি হয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
শুধু কৃষকরাই নন, কয়েকজন খুচরা সার ব্যবসায়ীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড়তি দামে সার কেনার অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, বিএডিসির ডিলারদের কাছ থেকে অনেক সময় বস্তাপ্রতি ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়। ফলে খুচরা পর্যায়ে সরকারি দামে সার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের কিছু বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলাররা তাঁদের কাছে সার নেই বলে জানালেও একই সার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন তারা। কোথাও কোথাও ডিলারের কাছ থেকে সার সংগ্রহের সময় কোনো রশিদ দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সার ক্রয়ের রশিদে সঠিক দাম উল্লেখ করা হলেও রশিদের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন অন্যান্য কৃষকেরা। ফলে ডিলারের কাছ থেকে সরকারি দামে সার না পেয়ে তাঁদের বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
এই সারের ডিলারেরা এতোই ক্ষমতাশালী যে, সরকার যায় সরকার আসে তাদের পরিবর্তন হ সরকারি ভর্তুকি সত্ত্বেও ফরিদপুরে মাঠপর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যে মিলছে না সার।
একজন খুচরা বিক্রেতা জানান, এই সারের ডিলারেরা এতোই ক্ষমতাশালী যে, তারা জেলার ডিসি-এসপিকেও বদলানোর ক্ষমতা রাখে! সরকার যায় সরকার আসে তাদের পরিবর্তন হয়না। সরকারি ভর্তুকি সত্ত্বেও ফরিদপুরে মাঠপর্যায়ে নির্ধারিত মূল্যে মিলছে না সার তাদের ব্যবসার কারণেই। এটি যদি সরাসরি বাজারের প্রকৃত বিক্রেতাদের দিয়ে বিক্রি করানো হয়, তাহলে রাষ্ট্রের এই মধ্যস্বত্বভোগীরা সুযোগ পাবেনা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
কয়েকজন ডিলার দাবি করেন, ভরা মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় কিছু সার তাঁরা যশোরের নওয়াপাড়া থেকে সংগ্রহ করেন। তাঁদের ভাষ্য, বাইরে থেকে সংগ্রহ করা সার পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচে বেশি পড়ে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই অজুহাত দেখিয়েও সরকারি দামের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
যদিও ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মিয়া (বাবু) অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমার জানামতে বর্তমানে কোনো সারের সংকট নেই। তার দাবি, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে; তবে পেঁয়াজ মৌসুমে একযোগে চাহিদা বাড়ায় সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়।
বিষয়টি নিয়ে বিএডিসির টেপাখোলা গোডাউনের উপসহকারী পরিচালক এম এ জাকির মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফোনে যোগাযোগ করা হলে সহকারী পরিচালক মো. কাইয়ুম মল্লিক তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেন।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান সারের সংকট অস্বীকার করে বলেন, মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং চলছে। নির্দিষ্ট কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে কৃষক অভিযোগ দিলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গুদাম থেকে সার উত্তোলন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির প্রতিটি ধাপে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে গুদাম থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত সার বিপণন ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি চাষি ও কৃষকের।


















