ট্রাইবুনালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম-খুনের রোমহর্ষক জবানবন্দী
- আপডেট সময় : ০৪:৫৬:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
- / 27
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কীভাবে বিনাবিচারে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, আর হত্যার পর পৈশাচিক কায়দায় কিভাবে লাশ গুম করা হয়, তার এক বীভৎস চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে। এর মধ্যে রয়েছে আলোচিত বিডিআর হত্যাকান্ড ও বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী হত্যা। আর ইলিয়াস আলী হত্যার ঘটনায় ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে (বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী) হাজির হয়ে এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দেন সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ইমরুল কায়েস ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত থাকাকালীন জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড বা রানার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০০১ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এই প্রত্যক্ষদর্শী সেনাসদস্য ট্রাইব্যুনালে সামরিক পোশাকে হাজির হয়ে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছেন।
তারেক সিদ্দিকী ও জিয়াউল আহসানের কুখ্যাত নেক্সাস: ইলিয়াস আলী গুমের নেপথ্য কাহিনী
জবানবন্দীর সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশ ছিল ২০১২ সালের এপ্রিলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ ও গুম করার ঘটনা। ইমরুল কায়েস জানান, ২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল জিয়াউল আহসান, মেজর নওশাদ ও স্কোয়াড্রন লিডার সাইফসহ একটি মাইক্রোবাসে করে মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে ওত পেতে ছিলেন। জিয়াউল আহসান অনবরত ফোনে ‘টার্গেট’ আসার খোঁজ নিচ্ছিলেন। সে রাতে অপারেশন সফল না হলেও, পরদিন থেকে ৯ দিনের ছুটিতে যান ইমরুল কায়েস এবং গণমাধ্যমে জানতে পারেন ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকেই অপহরণ করা হয়েছে।
২৩ এপ্রিল ছুটিতে ফিরে ইমরুল কায়েস দেখেন র্যাব সদরদপ্তরে থমথমে অবস্থা। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হন যে, অপারেশনের প্রমাণ মুছতে অস্ত্রাগারের অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ধ্বংস করেছেন জিয়াউল আহসান।
এর কিছুদিন পর জিয়াউল আহসানের একটি ফোনালাপের বিবরণ দিয়ে সাক্ষী বলেন, অন্য একটি কল এলে জিয়াউল তার আগের কলটি কেটে দিয়ে বলেন, ‘তুই রাখ, তারিক স্যার (তারেক আহমেদ সিদ্দিকী) ফোন দিয়েছেন।’
এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই প্রভাবশালী উপদেষ্টার সঙ্গে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে জিয়াউলকে বলতে শোনা যায়: “স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে! এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায় দেন, এটাই আমার ভালো।”
সাক্ষী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, তারেক সিদ্দিকীর মাধ্যমেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জিয়াউল আহসানের বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। এই প্রশ্রয়েই জিয়াউল যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তার গাড়ি ভর্তি অস্ত্র-গোলাবারুদ থাকলেও ক্ষমতার দাপটে তা কখনো তল্লাশি করা হতো না।
বিনাবিচারে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যা: বুড়িগঙ্গা ও সাগরে লাশ গুমের বীভৎস পদ্ধতি
সাক্ষী ইমরুল কায়েসের প্রত্যক্ষ বিবরণ অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের নির্দেশে ও উপস্থিতিতে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ জনকে বিনাবিচারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জিয়াউলের সরাসরি নেতৃত্বে অন্তত ২৫ জনকে গুলি করে নদীতে লাশ গুমের নিখুঁত বিবরণ দেন তিনি।
সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে গুম: ২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ চলাকালে ৮-১০ জন বিডিআর সদস্যকে ইনজেকশন দিয়ে অথবা পোস্তগোলা সেনা ক্যাম্পের ভেতর থেকে নৌকায় করে নদীতে নিয়ে হত্যা করা হয়। লাশ যেন ভেসে না ওঠে, সেজন্য নিচে একটি সিমেন্টের বস্তা, তার ওপর ভুক্তভোগী এবং ওপরে আরেকটি সিমেন্টের বস্তা রশি দিয়ে বেঁধে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। ২০১২ সালের শুরুতে একইভাবে পোস্তগোলা ক্যাম্প থেকে ১১ জন আসামিকে মাঝনদীতে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
লাশ দেখে হাসাহাসি: র্যাব-৪-এর সেফ হাউস থেকে আনা দুই আসামির একজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন জিয়াউল আহসান। বুলেটের আঘাতে ওই ব্যক্তির মাথায় আগুন ধরে গেলে উপস্থিত সবাই তা দেখে অমানবিক হাসাহাসি করেন।
রেললাইনে লাশ ফেলে নাটক: চাকরির শুরুর দিকে এক রাতে জিয়াউলের নির্দেশে টঙ্গীর আহসান উল্লাহ উড়ালসড়কের পাশে একটি রেলক্রসিংয়ে মাইক্রোবাসের ডিক্কি থেকে একটি বরফশীতল লাশ নামিয়ে রেললাইনের ওপর রাখা হয়, যেন একে দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়।
সাজানো ক্রসফায়ার ও সুন্দরবন-বলেশ্বর নদের হত্যাযজ্ঞ: সুন্দরবনে র্যাব-৮ কে সাথে নিয়ে সাজানো অভিযানের নামে জবানবন্দী অনুযায়ী দু-তিনজনকে হত্যা করা হয়। এছাড়া বরিশালের পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদ ও সাগরের মোহনায় নিয়ে একাধিকবার ২ থেকে ৪ জন করে ‘টার্গেট’কে সাগরে ডুবিয়ে মারা হতো। লাশ যেন ভেসে না ওঠে, সেজন্য সাগরে ফেলার আগে কমান্ডো নাইফ (চাকু) দিয়ে ভুক্তভোগীদের পেট চিরে দেওয়া হতো।
সীমান্তে বন্দী বিনিময় ও হত্যা: ২০১২ সালের মাঝামাঝি জাফলং সীমান্তে মধ্যরাতে ভারতীয় সীমান্ত থেকে আসা বেসামরিক পোশাকের ৪-৫ জনের সাথে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ‘বন্দী বিনিময়’ ঘটে। বাংলাদেশ থেকে দুজনকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে ভারত থেকে দুজনকে বুঝে নেন জিয়াউল আহসান। এরপর ঢাকা ফেরার পথে ২৫-৩০ কিলোমিটার ব্যবধানে ওই দুই আসামিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে রাস্তার পাশে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল।
“দেশকে ভালোবাসার শপথ নিয়েছিলাম, মানুষকে মারার জন্য নয়”
আদালতে জবানবন্দী দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এই সেনাসদস্য। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশের জন্য শপথ নিয়ে এবং প্রশিক্ষণ পেয়েও জিয়াউল আহসানের রানার হিসেবে তাকে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হতে হয়েছে। বিবেকের তাড়নায় এবং দেশে যেন আর কোনো সৈনিককে এমন পৈশাচিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই ন্যায়বিচারের স্বার্থেই তিনি এই সত্য প্রকাশ করেছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় বর্তমানে একমাত্র আসামি হিসেবে কারাবন্দী জিয়াউল আহসানকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।










