Bangladesh ০২:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আত্মহত্যা, কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও করণীয়

ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
  • / 158

আত্মহত্যা বা আত্মহনন হচ্ছে কোন ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়া বিশেষ। সহজ করে বললে, নিজেকে নিজে হত্যা করা। মানসিক রোগ বা অন্য কোনো কারণে নিজের জীবনকে শেষ করে দেয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের জীবনাবসান ঘটান। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ, ২০১৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে এবং ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর বিষণ্নতার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ আত্মহত্যা। বিভিন্ন গবেষকের প্রাপ্ত উপাত্ত মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার শিকার। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৮ জন। অনুমান করা হয় যে, আত্মহত্যার কারণে ঘটা প্রতিটি মৃত্যুর পাশাপাশি আরো ২০টি আত্মঘাতী প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু কেন তাঁরা আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেন? আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়ই বা কী?

কারণ:

কেন মানুষ নিজের জীবন নিজে নেয়? তার কি তখন মাথা ঠিক থাকে? সুস্থ মাথায় কি এটা করা সম্ভব? নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেখা যায়।

মনঃসমীক্ষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, যখন ভালোবাসার মানুষের প্রতি সৃষ্ট তীব্র রাগ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব নিজের প্রতি ধাবিত হয়, তখন মানুষ আত্মহত্যা করে। অন্যকে হত্যা করার সুপ্ত কামনা যখন অবদমিত হয়, তখন সেটা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। মানুষের মধ্যে একটি শক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, আরেকটি তাকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। এই ধ্বংসের শক্তির জন্যই মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকারীর মধ্যে হত্যার কামনা, নিহত হওয়ার কামনা ও মৃত্যুর কামনা লক্ষ্য করা যায়।

এতো গেলো মনোবিজ্ঞানীদের তত্ত্বের কথা। কিন্তু বিজ্ঞানের বাস্তবতায় বর্তমান পরিস্থিতি কী..

মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার খুব বেশি থাকে, গবেষণায় দেখা গেছে ৬০-৯৮% আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোন না কোন মানসিক রোগ দায়ী।

আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণায় যে বিষয়গুলো লক্ষ করা যায়, তা হলো:

চরম হতাশা ও হতাশাজনিত মানসিক রোগ,ব্যক্তিত্বের সমস্যা,মাদকাসক্তি,আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা,বংশগত কারণ অর্থাৎ যে বংশে বা পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস আছে সে বংশ বা পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।

যারা কোন কষ্ট পেলে নিজেকে আঘাত করে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের শরীরে ক্ষত করে, দেয়ালে মাথায় আঘাত করে, নির্বাচনে পরাজয় হওয়ার পর নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ।

আত্মহত্যার ধরন:

দুই ধরনের আত্মহত্যা ঘটনা ঘটে।

১. DECISIVE: আগে থেকে পরিকল্পনা করে, আয়োজন করে, সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন অনেকে।

২. IMPULSIVE: হুট করে আবেগের বশ টানতে না পেরে আত্মহত্যা করে ফেলেন অনেকে।

উল্লিখিত সুইসাইড যারা করেন, তারা আগে থেকেই কিছু আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। এ ধরণের মানুষ আত্মহননের আগে বেপরোয়া চেষ্টা প্রকাশ করেন, তার মধ্যে আছে তারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মৃত্যু আর আত্মহত্যা নিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আত্মহত্যা বা মৃত্যুবিষয়ক স্ট্যাটাস লেখেন, ফটো বা ভিডিও শেয়ার করেন। নিজের ক্ষতি করেন। প্রায়ই এরা নিজের হাত-পা কাটেন, বেশি বেশি ঘুমের ওষুধ খান।

ভ্রান্ত ধারণা:

যারা আত্মহত্যার হুমকি দেয় বা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা দেখায়, তারা কখনোই আত্মহত্যা করবে না।

যেসব পরিবারে কেউ আত্মহত্যা করেছে, এমন পরিবারে নিকটাত্মীয়রা শিক্ষা পেয়ে আর করবে না।অনেকেই ভাবেন যারা আত্মহত্যা করে তারা কোনো প্রমাণ বা সতর্কসংকেত রাখে না।অনেকেই ভাবেন যে, কেউ আত্মহত্যা হতে বেঁচে গেলে পরবর্তীতে আর করবে না।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করার মানে তার মাথায় আত্মহত্যার বীজ বুনে দেওয়া বা তাকে উৎসাহিত করা।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপরের প্রতিটি ধারণাই ভুল বা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিরোধের উপায়:

আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর হতে পারে:সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি,আত্মহত্যার উপকরণের,সহজপ্রাপ্যতা হ্রাস,ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি (যেমন- মাদকাসক্ত, নির্যাতনের শিকার, কারাবন্দি ইত্যাদি) বিশেষ সহায়তা,সামাজিক বন্ধন দৃঢ়করণ, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসন, কুসংস্কার দূর করে মানসিক শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা,প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিশেষ পরামর্শ সেবা,সার্বক্ষণিক টেলিফোন সহায়তা বা হেল্পলাইন।

আশার কথা ও আমাদের করণীয়:

আত্মহত্যা সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য। যখনই কারো মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা দেখা যাবে, আমাদের উচিত:তার পাশে থাকা এবং মনের কথা বা ব্যথা বোঝার চেষ্টা করা,তাকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা দেওয়া,বিষণ্ণতা বা মানসিক সমস্যা মনে হলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে সহায়তা করা।

মনে রাখতে হবে, ওষুধের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসায় মানুষ দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে এবং আত্মহত্যার চিন্তা মন থেকে চলে যায়।

 

শেয়ার করুন

আত্মহত্যা, কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও করণীয়

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

আত্মহত্যা বা আত্মহনন হচ্ছে কোন ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়া বিশেষ। সহজ করে বললে, নিজেকে নিজে হত্যা করা। মানসিক রোগ বা অন্য কোনো কারণে নিজের জীবনকে শেষ করে দেয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের জীবনাবসান ঘটান। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ, ২০১৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে এবং ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর বিষণ্নতার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ আত্মহত্যা। বিভিন্ন গবেষকের প্রাপ্ত উপাত্ত মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার শিকার। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৮ জন। অনুমান করা হয় যে, আত্মহত্যার কারণে ঘটা প্রতিটি মৃত্যুর পাশাপাশি আরো ২০টি আত্মঘাতী প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু কেন তাঁরা আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেন? আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের করণীয়ই বা কী?

কারণ:

কেন মানুষ নিজের জীবন নিজে নেয়? তার কি তখন মাথা ঠিক থাকে? সুস্থ মাথায় কি এটা করা সম্ভব? নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেখা যায়।

মনঃসমীক্ষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, যখন ভালোবাসার মানুষের প্রতি সৃষ্ট তীব্র রাগ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব নিজের প্রতি ধাবিত হয়, তখন মানুষ আত্মহত্যা করে। অন্যকে হত্যা করার সুপ্ত কামনা যখন অবদমিত হয়, তখন সেটা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। মানুষের মধ্যে একটি শক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, আরেকটি তাকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। এই ধ্বংসের শক্তির জন্যই মানুষ আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যাকারীর মধ্যে হত্যার কামনা, নিহত হওয়ার কামনা ও মৃত্যুর কামনা লক্ষ্য করা যায়।

এতো গেলো মনোবিজ্ঞানীদের তত্ত্বের কথা। কিন্তু বিজ্ঞানের বাস্তবতায় বর্তমান পরিস্থিতি কী..

মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার খুব বেশি থাকে, গবেষণায় দেখা গেছে ৬০-৯৮% আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোন না কোন মানসিক রোগ দায়ী।

আত্মহত্যার কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণায় যে বিষয়গুলো লক্ষ করা যায়, তা হলো:

চরম হতাশা ও হতাশাজনিত মানসিক রোগ,ব্যক্তিত্বের সমস্যা,মাদকাসক্তি,আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা,বংশগত কারণ অর্থাৎ যে বংশে বা পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস আছে সে বংশ বা পরিবারের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।

যারা কোন কষ্ট পেলে নিজেকে আঘাত করে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের শরীরে ক্ষত করে, দেয়ালে মাথায় আঘাত করে, নির্বাচনে পরাজয় হওয়ার পর নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ।

আত্মহত্যার ধরন:

দুই ধরনের আত্মহত্যা ঘটনা ঘটে।

১. DECISIVE: আগে থেকে পরিকল্পনা করে, আয়োজন করে, সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করেন অনেকে।

২. IMPULSIVE: হুট করে আবেগের বশ টানতে না পেরে আত্মহত্যা করে ফেলেন অনেকে।

উল্লিখিত সুইসাইড যারা করেন, তারা আগে থেকেই কিছু আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। এ ধরণের মানুষ আত্মহননের আগে বেপরোয়া চেষ্টা প্রকাশ করেন, তার মধ্যে আছে তারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মৃত্যু আর আত্মহত্যা নিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আত্মহত্যা বা মৃত্যুবিষয়ক স্ট্যাটাস লেখেন, ফটো বা ভিডিও শেয়ার করেন। নিজের ক্ষতি করেন। প্রায়ই এরা নিজের হাত-পা কাটেন, বেশি বেশি ঘুমের ওষুধ খান।

ভ্রান্ত ধারণা:

যারা আত্মহত্যার হুমকি দেয় বা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা দেখায়, তারা কখনোই আত্মহত্যা করবে না।

যেসব পরিবারে কেউ আত্মহত্যা করেছে, এমন পরিবারে নিকটাত্মীয়রা শিক্ষা পেয়ে আর করবে না।অনেকেই ভাবেন যারা আত্মহত্যা করে তারা কোনো প্রমাণ বা সতর্কসংকেত রাখে না।অনেকেই ভাবেন যে, কেউ আত্মহত্যা হতে বেঁচে গেলে পরবর্তীতে আর করবে না।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করার মানে তার মাথায় আত্মহত্যার বীজ বুনে দেওয়া বা তাকে উৎসাহিত করা।বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উপরের প্রতিটি ধারণাই ভুল বা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিরোধের উপায়:

আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো কার্যকর হতে পারে:সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি,আত্মহত্যার উপকরণের,সহজপ্রাপ্যতা হ্রাস,ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি (যেমন- মাদকাসক্ত, নির্যাতনের শিকার, কারাবন্দি ইত্যাদি) বিশেষ সহায়তা,সামাজিক বন্ধন দৃঢ়করণ, নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসন, কুসংস্কার দূর করে মানসিক শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা,প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিশেষ পরামর্শ সেবা,সার্বক্ষণিক টেলিফোন সহায়তা বা হেল্পলাইন।

আশার কথা ও আমাদের করণীয়:

আত্মহত্যা সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য। যখনই কারো মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা দেখা যাবে, আমাদের উচিত:তার পাশে থাকা এবং মনের কথা বা ব্যথা বোঝার চেষ্টা করা,তাকে পর্যাপ্ত সময় ও সহায়তা দেওয়া,বিষণ্ণতা বা মানসিক সমস্যা মনে হলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে সহায়তা করা।

মনে রাখতে হবে, ওষুধের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসায় মানুষ দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে এবং আত্মহত্যার চিন্তা মন থেকে চলে যায়।