ফররুখের কবরে কালো শেয়াল
- আপডেট সময় : ০১:৫৪:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
- / 6
কাল শেষ রাতে চাঁদ যখন উল্টে গিয়ে নৌকার মত
নিজের জোছনার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে,
আমি ফররুখ আহমদের কবর দেখতে গিয়েছিলাম।
আমার পরনে ছিল দু’টুকরো সাদা কাফন, হাতে ‘সোনালি কাবিন’।
আমি জেলে যাবার আগে তিনি আমাকে টেলিফোন করেছিলেন,
‘আসিস, তোর কবিতা নিয়ে কথা বলবো।’
আমি যাইনি।
যাইনি, কারণ ছন্দের আড়ালে আমি যে ছদ্মবেশ ধারণ করি,
সে আলখাল্লার বোতাম তিনি খুলে ফেলবেন, আমি জানতাম।
আমি নদীর সাথে নারীর,
শাকম্ভরী বাংলাদেশের সাথে আমার মায়ের
যে উপমা স্থাপন করেছিলাম
তিনি তসবী ঘোরাতে ঘোরাতে তাতে ফুঁ দিলে
মিকাইলের মুখ হয়ে যাবে। ভয়ে
আমি যাইনি।
আজ যখন তাঁর কবর দেখতে যাবার সময় যোগ্য পোশাক
খুঁজছিলাম, হঠাৎ মনে হলো, চিত্রিত শার্ট, সবুজ পাতলুন আর
আমার বাহারে জুতোয় তিনি পানের পিক ছিটিয়ে দেবেন।
ফররুখের সামনে দাঁড়াবার মত কোনো পোশাক
আমার আলমারিতে ছিল না। আলনার জামা-কাপড়
শ্মশান থেকে কুড়িয়ে আনা মড়ার আধপোড়া আচ্ছাদনের মত
দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগলো।
একবার ভাবলাম, আমি নেংটো হয়েই সেখানে যাই না কেন?
ফররুখ ভাইতো আমাকে একটা ‘লেংটা শিশু’ বলেই জানতেন।
আবার ভাবলাম, নিস্তব্ধ কবরগাহে নিমজ্জমান চাঁদতে
তিনি যদি আমার নগ্নতা দেখিয়ে দেন, আমি কোথায় পালাবো?
আমি নিয়ম-কানুন মানি না, কিন্তু বেশরা কবিতার জন্যে
তিনি যদি আমাকে নিসর্গরাজির সামনে বেয়াদব বলে গালি দেন,
আমি সইতে পারবো না।
শেষে আমি কাফনই পরে নিলাম।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের যে সব লোক
ঘরে কবরের কাপড় কিনে রেখেছেন, আমি তাদেরই একজন।
আমি যখন তার কবরে আমার উপস্থিতি ঘোষণা করে
লাব্বায়েক, লাব্বায়েক বলে উঠে দাঁড়ালাম,
ঠিক তখুনি তার কবর থেকে একটা মস্তবড়ো শেয়াল
লাফিয়ে সরে গেল। কবি বেনজীরের বাড়ির পাশ দিয়ে
শেয়ালটা পালিয়ে যাচ্ছে।
মনে হলো, শেয়ালটাকে আমি চিনি, আগে কোথাও দেখে থাকবো।
একবার বিদ্যাপতির স্মৃতি মন্দিরে অনেকগুলো শেয়াল দেখেছিলাম,
এ শেয়ালটা সেখানে ছিল না।
আমি লালন শাহের মাজারে এক মারফতির উৎসব শেষে
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,
ঘুমের মধ্যে দু’টি শেয়াল আমার দেহ শুঁকছিল,
এ শেয়ালটা সেখানেও ছিল না।
তবে শেয়ালটাকে আমি কোথায় দেখেছি?
কিছুতেই মনে পড়ছে না।
কবরের কাছে একটা কালো গাছের দিকে চোখ পড়তেই
আমার স্মৃতির ওপর বিদ্যুৎ বইল।
হ্যাঁ, পঁচাত্তরের চিত্র প্রদর্শনীতে এই শেয়ালটাকে আমি দেখেছিলাম,
কামরুলের কালোশিল্পের মধ্যে এই ধূর্ত লেজ উঁচিয়ে ছিল;
সেই কুটিল চোখ আর লোভাতুর মুখচ্ছবি আমার চেনা।
আমি ফররুখের কবর পেছনে রেখে,
একটা কালো শেয়ালকে তাড়াতে তাড়াতে
বাংলাদেশের মানচিত্রের উপর দিয়ে
আমার কাফন নিয়ে দৌড়াতে লাগলাম।

















