হিমালয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ : সাহায্য নয়, ক্ষতিপূরণ দাবি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 45
উষ্ণায়নের কবলে পড়ে হিমালয়ের বরফ গলছে দ্রুতগতিতে, যার সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ রূপ দেখল বিশ্ব। হিমবাহ ধসে নেপাল এবং চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ঘটা আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে, যা সময়ের সাথে সাথে আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুমানে দেখা গেছে, এই একক বিপর্যয়েই নেপালের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। অন্নপূর্ণা অঞ্চলের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি কেবল একটি স্থানীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং বিশ্ব জলবায়ু সংকটের এক মারাত্মক ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
হিমালয় অঞ্চলের এই বরফ ও হিমবাহ গলে গড়ে ওঠা নদীগুলোর ওপর পানীয় জল, কৃষি ও শিল্পের জন্য নির্ভরশীল এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। ফলে এখানে যে কোনো বিপর্যয় পুরো অঞ্চলের জীবন ও জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিচ্ছে।
অসম দায় এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই ঘটনার পর জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো করেছেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ যে গ্রীনহাউস গ্যাস, তাতে নেপালের অবদান ১ শতাংশেরও কম। অথচ এর বিপরীতে ১৮৫০ সাল থেকে হিসাব করলে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো:
যুক্তরাষ্ট্র: ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৫ হাজার কোটি (৪৫০ বিলিয়ন) টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন: উভয়ই পৃথকভাবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) টনের বেশি নির্গমন করেছে।
ভারত: দ্রুত শিল্পায়নের কারণে তালিকায় থাকলেও ঐতিহাসিক নির্গমনে পিছিয়ে।
উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (LDC) স্পষ্ট বক্তব্য—যে বৈশ্বিক ঋণের বোঝা এবং পরিবেশগত ক্ষতি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা অনুদান বা সাহায্য হিসেবে নয়, বরং ‘জলবায়ু ঋণ’ (Climate Debt) ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে শোধ করা উচিত।
আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (UNFCCC) ২০৩৫ সালের মধ্যে ২.১ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনে সম্মত হলেও বাস্তবায়ন ধীরগতির। বিশেষ করে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষয়ক্ষতি সহায়তা প্রদান এবং প্রস্তাব অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কার্যকর পদক্ষেপকে ব্যাহত করছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বাজেটের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যেখানে বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেট বরাদ্দ থাকছে সামরিক খাতে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সংযোগ
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু তহবিলে অর্থ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হলে এটি কেবল ‘নৈতিক দায়িত্ব’ হিসেবে না দেখে তাদের নিজস্ব ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার’ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
জলবায়ু বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে যে গণ-অভিবাসন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তা পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে। দুবাই কপ সম্মেলনে “লস অ্যান্ড ড্যামেজ” তহবিলের পাশাপাশি জলবায়ু নিরাপত্তা ও শান্তির ওপর গৃহীত যৌথ ঘোষণা প্রমাণ করে যে, এই দুই সংকট গভীরভাবে সম্পর্কিত।
হিমালয়ের এই জলবায়ু বিপর্যয় পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে—উষ্ণায়ন থামানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো কেবল একটি মানবিক আহ্বান নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।
সূত্র: আলজাজিরা অবলম্বনে।

















