হিমালয়ের নিচে লুকানো রাশিয়ার এক পারমাণবিক বোমা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ, যা ধ্বংস করে দিতে পারে গোটা বিশ্বকে। সেই মারাত্মক অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার গোপন মিশনে নেমেছে বাংলাদেশের অকুতোভয় গোয়েন্দা মেজর সিনহা। রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অন্ধকারের এই মরণপণ লড়াইয়ে সে কি পারবে বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে?
ডেড জোন
- আপডেট সময় : ০৩:৪৩:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- / 460
বাতাসটা শুধু ঠান্ডা নয়, ছুরির ফলার মতো ধারালো। ঝড়ের ঝাপটায় মাইনাস পচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের হিমশীতল হাওয়া যখন রেনকোটের সামান্য ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকছে, তখন মনে হচ্ছে কেউ চামড়া কেটে নুন ছিটিয়ে দিচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে, এভারেস্টের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই ডেড জোনে সাধারণ মানুষের ফুসফুস জবাব দিয়ে দেয়। কিন্তু মেজর সিনহা সাধারণ মানুষ নয়।
সাদা স্নো-ক্যামোফ্লেজ জ্যাকেটের হুডটা মাথায় টেনে, চোখের প্রটেক্টিভ গগলসের ওপর জমে থাকা বরফ বাম হাতের গ্লাভস দিয়ে মুছে নিল সে। ঠিক পাঁচশো গজ নিচে, বরফাবৃত পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন তিব্বতি মঠ ‘তাশি চো জং’-এর সোনালী চূড়াটা দেখা যাচ্ছে। ওই মঠের ঠিক নিচেই আছে চার দশক ধরে বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকা সোভিয়েত বাঙ্কার—‘অবজেক্ট-৮৮’।
“সিনহা, শুনতে পাচ্ছ?”
কানের ভেতর গোঁজা মাইক্রো-রিসিভারে সোহেলের গলা ভেসে এল। মাঝখানের স্যাটেলাইট স্ট্যাটিকের খড়খড়ে আওয়াজ। ঢাকা থেকে সিআইটি (CIT) টেক-ল্যাব থেকে লাইভ ট্র্যাকিং করছে ও।
“শুনছি, সোহেল। আপডেট বলো,” মেজর সিনহার কণ্ঠস্বর শান্ত, বরফের চেয়েও শীতল।
“সময় ফুরিয়ে আসছে, সিনহা। বাঙ্কারের অটো-মেল্টডাউন প্রোটোকল সচল হয়ে গেছে। তোমার হাতঘড়িতে এখন ঠিক ৪৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় বিপদ—আমাদের স্যাটেলাইট ফিড বলছে, ক্রিস্টোফ কোভাচেকের অ্যাডভান্সড টিম অলরেডি মঠের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ওদের কাছে ভারী অস্ত্র আর থার্মাল ড্রিল আছে।”
“কোভাচেক নিজে এসেছে?”
সিনহা এক পা বাড়িয়ে বরফের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
“কনফার্মড। ইন্টারন্যাশনাল টেরর সিন্ডিকেটের এই মাথা কোনো চুনোপুঁটি মিশন নিজে হ্যান্ডেল করে না। ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’ সাইবার-কোডটা ওর চাই-ই চাই। সিনহা, মঠের ভেতর কোনো ফায়ারআর্মস ব্যবহার করা যাবে না। প্রাচীন কাঠের স্ট্রাকচার, একটা ভুল গুলি পুরো মঠ ধসিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া ওখানে নিরীহ লামারা আছেন।”
“বুঝেছি। আউট।”
মেজর সিনহা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল। পাহাড়ের শেষ প্রান্তটায় এসে সে দেখল, মঠের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে দুজন পাহারা দিচ্ছে। সাদা উইন্ডব্রেকার পরা, হাতে রাশিয়ান একে-১২ অ্যাসাল্ট রাইফেল। কোভাচেকের ভাড়াটে সেনা।
মেজর সিনহা নিঃশব্দে বরফের ওপর দিয়ে স্লেজ কুকুরের মতো পিছলে নেমে এল ঠিক পেছনের গার্ডটার পিঠ বরাবর। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিনহার ডান হাত সাপটে ধরল তার মুখ, আর বাম হাতের একটা নিখুঁত ‘কারাতে চপ’ আঘাত করল তার ঘাড়ের নার্ভ-সেন্টারে। টু শব্দ না করে লোকটা বরফের ওপর গড়িয়ে পড়ল।
দ্বিতীয় গার্ডটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল না। সিনহা স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠে তার চোয়াল লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল এক রিভার্স-রাউন্ডহাউজ কিক। বুটের শক্ত সোলের আঘাতে লোকটার rifle ছিটকে গেল হাত থেকে, সে নিজেই ছিটকে আছড়ে পড়ল মঠের পাথুরে দেয়ালে। অজ্ঞান।
মেজর সিনহা নিচে পড়ে থাকা রাইফেল দুটো টেনে নিয়ে বরফের নিচে লুকিয়ে ফেলল। তারপর মঠের কাঠের ছোট দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে ঘুটঘুট অন্ধকার আর তিব্বতি ধূপের কড়া গন্ধ। কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মঠের মূল হলরুম থেকে ভেসে আসছে চিল্কার আর ভারী বুটের আওয়াজ।
মেজর সিনহা দেয়াল ঘেঁষে বিড়ালের মতো পা ফেলে এগিয়ে গেল। হলরুমের দরজার আড়াল থেকে যা দেখল, তাতে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
হলরুমের মাঝখানে প্রায় কুড়িজন প্রবীণ তিব্বতি লামাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের সামনে রিভলভার হাতে দাঁড়িয়ে আছে স্কারফেস ক্রিস্টোফ কোভাচেক। লম্বা চওড়া শরীর, চোখে এক নিষ্ঠুর চাতুর্য।
“আমি শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি, ওল্ড ম্যান,” কোভাচেক মঠের প্রধান লামার কপালে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে ভাঙা ইংরেজিতে বলল, “বাঙ্কারে ঢোকার সিক্রেট প্যাসেজটা কোথায়? আর এক মিনিট, তারপর প্রতি দশ সেকেন্ডে একটা করে লাশ পড়বে।”
বৃদ্ধ লামা চোখ বন্ধ করে মন্ত্র জপছেন। তাঁর মুখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই।
কোভাচেক তার রিভলভারের হ্যামারটা পেছনে টানল। ক্লিক!
ঠিক সেই মুহূর্তে হলের কোণার একটা বিশাল তিব্বতি ব্রোঞ্জের ঘণ্টা বিকট শব্দে বেজে উঠল। পুরো হলের অন্ধকার ফুঁড়ে প্রলয়ের মতো আছড়ে পড়ল একটা ছায়ামূর্তি।
মেজর সিনহা অ্যাকশনে নেমে পড়েছে।
কপালে ঠান্ডা ঘাম আর হাতের পেশি শক্ত করে কোভাচেক ঘুরে তাকানোর আগেই, হলের বাতিগুলো এক এক করে নিভে যেতে শুরু করল। শুরু হলো অন্ধকার ঘরের ভেতর এক দুর্ধর্ষ স্পাই আর একদল আধুনিক সন্ত্রাসীর মরণপণ যুদ্ধ।
[অসমাপ্ত]



















