সম্পাদকের কলাম
“মায়ের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যু হলে, সে মৃত্যুই পরম শ্রেয়”
- আপডেট সময় : ১১:০৫:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 87
প্রিয় সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ীগণ,
গত পরশু রাত থেকে যেভাবে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আপনারা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সত্যের পক্ষে ও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন—আপনাদের কাছে এই ঋণ আমার মায়ের বুকের দুধের ঋণের মতোই অপরিশোধ্য।
শুধু ‘ধন্যবাদ’ বা ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করে এই ভালোবাসার মূল্য দেওয়া সম্ভব নয়।
আপনারা আমার কাজকে চেনেন, ভালোবাসেন এবং প্রতিনিয়ত সাহস জোগান। আর সেই শক্তিতেই শত প্রতিকূলতা, রক্তচক্ষু ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আমি আমার সাধ্যমতো লড়াই চালিয়ে যেতে পারি।
তবে এই পথে সবাই যে শুধুই বাহ্বা দেবেন—এমনটা আমি কখনো আশা করি না। আমার সত্যনিষ্ঠ লেখালেখি যাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত হানে, তারা স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক মন্তব্য করবে বা ষড়যন্ত্র সাজাবে। তবে তা যদি গঠনমূলক বা যুক্তিযুক্ত হয়, তবে নিজের ভুল স্বীকার করে নিতে আমি কখনো কুণ্ঠাবোধ করিনি, আজও করি না।
কালের আবর্তে আমাদের সাংবাদিকতা পেশা অনেক কারণে কলুষিত হয়েছে। একদিকে এই অবক্ষয় দেখে যেমন আফসোস হয়, অন্যদিকে মিথ্যা আর ছদ্মবেশে ঢাকা এই নোংরা রূপটিকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করার তীব্র তাগিদও বোধ করি।
উত্তর-ফ্যাসিস্ট যুগেও এই পচনকে যেন আমাদের গা-সওয়া বানিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এই চরম হতাশাতেও কিছু অদম্য মানুষের কারণে সংবাদমাধ্যম আজও সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করেছি এই পেশায় ঘাপটি মেরে থাকা কিছু ভয়ংকর ও নোংরা দুর্বৃত্তের বিষদাঁত ও আসল মুখোপাশ উন্মোচন করতে। কখনো সরাসরি, আবার কখনো উপমা বা পরোক্ষ ইঙ্গিতে নিজের বিবেককে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনাদের মতো সচেতন পাঠকদের এই যে মূল্যায়ন—এটাই আমার আজ পর্যন্ত টিকে থাকার মূল রসদ। আপনারা আমার সাহসের সবচেয়ে বড় উৎস।
পাঁচই আগস্টের পর যখন দু-একটি ব্যতিক্ৰম ছাড়া পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতবিক্ষত ও নগ্ন চেহারা জাতির সামনে উন্মোচিত হলো—একজন সংবাদকর্মী হিসেবে তীব্র অপরাধবোধ ও বিবেকের তাড়নায় ভেঙে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম একা আমি আর কী-ই বা করতে পারব! পরিবারের স্বচ্ছলতা ও মানসিক শান্তির জন্য পেশা বদলে অন্য কিছু করার কথাও ভাবতে বাধ্য হয়েছিলাম।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো—এই গৎবাঁধা ও তোষামোদি খবর পরিবেশনের চেয়ে নিজের অবস্থান থেকে গণমাধ্যমে জেঁকে বসা এই নোংরা ব্যাধি নিরাময়ের লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই তো আমার আসল দায়িত্ব!
গত বছরের এই সময়ে যখন প্রাণের প্রিয় প্রেসক্লাবে যেতে মন চাইতো না, বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিতাম, তখনো একদিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু ভাইদের ত্যাগ আর অন্যদিকে ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’র সম্ভাবনাময় তরুণদের হাতছানি আমাকে চুপ থাকতে দেয়নি।
সেই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের এই দুষ্টক্ষতের বিপরীতে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভীক নিউজ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রেরণা থেকেই জন্ম নেয়—‘দৈনিক অগ্নিপ্রহর’।
অগ্নিপ্রহরের যাত্রা শুরু হতেই আমাদের মুখোমুখি হতে হলো এক নোংরা ও ভয়ংকর শত্রুর। যে আদতে এই শহরের গরিব, অসহায় ও নিরাপত্তাহীন মানুষের বুকের ওপর চেপে বসা এক সাবেক গুন্ডা; আর আজ সন্ত্রাসের সিঁড়ি বেয়ে সে এক ‘হোয়াইট কলার’ মাফিয়া।
‘দৈনিক অগ্নিপ্রহর’-এর এই নতুন লড়াইয়ের প্রতিক্রিয়াতেই এলো তাদের প্রকাশ্য ও নোংরা প্রত্যাঘাত—ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া সেই বিকৃত ও ভূয়া ছবি। এআই (AI) দিয়ে তৈরি সেই ফেক ছবি ছড়িয়ে ওরা আমাদের স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাদের সেই অপচেষ্টা উল্টো বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে গেছে। ধরা খেয়ে গিয়ে নিজেরাই এখন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের মিথ্যাচারের অভ্যাস স্বীকার করে নিচ্ছে। সত্যের আঘাতে ওদের মিথ্যার বেদি এখন তছনছ; দিগ্বিদিক হারিয়ে এখন নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে নতুন নতুন কুৎসিত পথ খুঁজছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শিগগিরই আপনাদের সামনে নিয়ে আসব। আজ শুধু আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর চরম কষ্টের জায়গাটি জানিয়ে শেষ করতে চাই।
এআই দিয়ে বানানো যে ছবিটিকে ওরা আমার অনৈতিক কর্মকাণ্ড বলে দাবি করেছিল—সেটি আসলে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রেরণা, আমার আদরের ছোট্ট মেয়েটির সাথে তোলা একটি স্মৃতি। পহেলা বৈশাখের এক সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ওর পছন্দের খাবারের অর্ডার দিয়ে টেবিলে বসে দুজনে অপেক্ষা করছিলাম—ঠিক তখনই তোলা ছবি এটি।
আমার কলিজার টুকরো মেয়ের সাথে তোলা সেই নিষ্পাপ ছবিটির এই বিকৃত রূপ দেখে আমার হৃদয় চুরমার হয়ে গেছে। এই কষ্ট আমাকে একটাই বার্তা দিয়ে গেছে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে মৃত্যুই হতে পারে আমার একমাত্র থামা বা শেষ গন্তব্য। এর নিচে কোনো আপস নেই।
আমি জানি, সৃষ্টির শুরু থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের যে চিরন্তন সংগ্রাম চলছে—আমার এই লড়াই তারই একটি ছোট্ট অধ্যায়। যারা এই পথচলায় যে যেভাবে পেরেছেন শামিল হয়েছেন, তারা কেউই কোনো ব্যক্তিগত লোভ, হিংসা বা স্বার্থের জন্য তা করেননি। আর তাই, সত্য ও ন্যায়ের জন্য করা কোনো লড়াই-ই কখনো বৃথা যেতে পারে না।
কালজয়ী কবি খলিল জিবরানের ‘দ্য প্রফেট’ থেকে দুটি চরণ উদ্ধৃত করে আজ শেষ করছি—
“…কিন্তু তুমি যদি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তোমার ভালোবাসায় শুধুই শান্তি ও সুখ সন্ধান করো, তবে তোমার জন্য শ্রেয় নিজের নগ্নতা ঢেকে ভালোবাসার মাড়াই-প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যাওয়া; এমন এক ঋতুহীন শান্ত জগতে প্রবেশ করা— যেখানে তুমি হয়তো হাসবে, কিন্তু সে হাসিতে প্রাণ থাকবে না; তুমি হয়তো কাঁদবে, কিন্তু সে কান্নায় বুক হালকা হবে না।”













