ছোট গল্প
এক মুঠো জোনাকি নীরব বারান্দায়
- আপডেট সময় : ০২:২২:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 28
আলী আকবার রাহাদের জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হতো একটা চাপা হুংকার দিয়ে। সেটা তার নিজের ভেতরে নয়, তার পত্রিকার হেডলাইনে।
চল্লিশোর্ধ্ব এই জীবনে সে এখন আর সাধারণ কোনো রিপোর্টার নয়; বরং সিস্টেমের কাঁটা, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অনৈতিকতা, দুর্নীতি আর গডফাদারদের মূল প্রতিপক্ষ সে।
তার তীক্ষ্ণ লেখনী শহরের কর্তাবাবু থেকে শুরু করে বড় অফিসার আর প্রভাবশালী ঠিকাদারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও, গোপন ফিসফিসানি আর ঈর্ষা তার পিছু ছাড়ে না। সাংবাদিকতার ভেতরের মহলও তাকে হিংসা করে—কেউ কেউ তো সরাসরি শত্রু।
তবু রাহাদ থামে না, থামতে পারেও না। তার প্রেরণা আসে সেই ‘মানুষের জিম্মা’ থেকে, যাদের জন্য সে লড়ে যায়।
তার এই কণ্টকাকীর্ণ পথ বড় পিচ্ছিল। মাঝে মাঝে যখন চারপাশের সব বন্ধুত্বের মুখোশ খসে পড়ে, তখন আরও শক্তি জুগিয়ে এগোতে থাকে।
মাঝেমধ্যে নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগে। তখন তার হৃদয় একটু উষ্ণতা খুঁজে ফেরে, যে অনুভব তার পথচলার সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নিমিষেই।
এজন্য মনের প্রশান্তি পেতে রাহাদ কখনো তার স্রষ্টার দরবারে নীরবে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। গভীর আকুতি নিয়ে প্রার্থনা করে; পালনকর্তার কাছে নিজেকে মেলে ধরে মন হালকা করে নেয়। তা না হলে বইপত্রের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করে।
বর্তমানের ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের যুগে পেশাগত কারণেই তাকে ফেসবুকে নজর রাখতে হয়। সেখানেই একদিন তার চোখ আটকে যায় একটি পোস্টে। মনে হচ্ছিল—ওই পোস্টের শব্দগুচ্ছের ভারী আর মোলায়েম সৃজন যেন তারই ভেতরের ক্ষোভ আর নীরবতার প্রতিধ্বনি। এমন কিছুই কি খুঁজছিল সে মনে মনে?
তাহমিনা জেরান তখন থেকেই তার কাছে যেন নীরবতার আলপনা হয়ে উঠেছে। যার লেখার ব্যাপ্তি হিমালয়ের মতো উঁচু, কিন্তু সেখানে যেন এক শান্ত ও একাকী অবয়বের ছায়া। ঠিক ঠাউরে উঠতে পারে না তাকে।
তাহমিনার মধ্যে এক ধরনের স্থিতিশীলতা থাকলেও রয়েছে অজানা শূন্যতা। প্রেম আর অপ্রাপ্তির মিশেলের এই বহিঃপ্রকাশ অবশ্য পাঠকের কাছে বেশ সমাদৃত; কিন্তু কী যেন একটা অপূর্ণতা রয়েছে তাতে। তাহমিনা জেরানের এই দুর্বোধ্যতা রাহাদের কাছে এক বন্ধ দরজার রহস্যের মতো হয়ে ওঠে।
প্রথম দিনেই তাহমিনার লেখা পড়ে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল রাহাদ। শব্দের এমন গভীর আর গম্ভীর বুনন সচরাচর পরিচিত কারও মাঝে দেখেনি সে। তবে সংকোচ থেকে সেখানে কোনো মন্তব্য করতে পারেনি সেদিন। এর কিছুদিন পর একদিন তাহমিনার লেখার নিচে মন্তব্যের ঘরে দু’লাইনের একটি অনুভূতি লিখে দেওয়ার পর প্রথম সেই জড়তা কাটল।
মনে হলো—এই প্রত্যুত্তরেরই যেন অপেক্ষা ছিল। তাহমিনা সেই মন্তব্য পড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি রিঅ্যাক্ট দিল। সেই থেকে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অদেখা যোগাযোগ। রাহাদের বিপদসংকুল, একঘেয়ে জীবনে এই প্রাপ্তিটুকু প্রশ্রয় পেয়ে ভালোলাগার একটা নিরাপদ বারান্দা হয়ে উঠল। যেখানে রয়েছে উপমা আর ইঙ্গিতের নীরব বর্ণমালা।
একদিন রাহাদ লিখল: “যে আলোটুকু ছুঁতে বারণ, সেটুকু দেখাই জীবনের শেষ বিলাসিতা।”
তাহমিনার জবাব এল: “আপনার কাব্য-কুসুমগুলো এমন এক দুর্লভ বাগানে ফোটে, যার চাবি আপনার কাছে থাকলেও দরজায় তালা দেওয়া।”
রাহাদ বুঝল, তাহমিনা তার জীবনের ঝুঁকি ও একাকীত্বকেই ইঙ্গিত করছে।
সে জবাব দিল: “আমি হলাম সেই পুরোনো সেতুর মতো, তাহমিনা, যার নিচে জলের ধারা বয়ে গেলেও ওপরে শুধু দায়িত্বের ভার।”
তাহমিনা জানত, রাহাদের এই ভার আসলে তার জীবনের আপসহীন লড়াই। তাই মনে মনে রাহাদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয় এক অদৃশ্য উদ্বেগ।
একরাতে, রাহাদ তার পত্রিকার অফিস থেকে বেরিয়ে বাসার পথে হাঁটছিল। হাতে সদ্য ছাপা হওয়া একটি পত্রিকার কপি।
হেঁটে যেতে যেতে বাসার কাছের মোড়টি ঘুরতেই, মোটরসাইকেলে চড়ে হেলমেট পরা দুই হামলাকারী আকস্মিক তার কাছাকাছি চলে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার ঘাড়ের পেছনে সজোরে কিছু দিয়ে আঘাত করল। তীব্র যন্ত্রণায় রাহাদের পা টলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই এলো দ্বিতীয় আঘাত।
সারাদিনের ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীর নিয়ে ভারসাম্য রাখতে না পেরে রাহাদ রাস্তার পাশে নর্দমার ওপর গড়িয়ে পড়ল। এরপর চলল বেধড়ক মারধর। তার শরীর যেন নিথর হয়ে এলো। আঘাত করার পর হামলাকারীরা যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
আচমকা এমন আক্রমণের শিকার রাহাদ বেশ কিছুক্ষণ রাস্তায় পড়ে রইল। কিছু সময় পর কোনোমতে ধাতস্থ হলো। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে নিজেকে টেনে তুলল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাসার সামনে গিয়ে পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুলল। এক গ্লাস পানি খেয়ে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
শুয়ে পড়ার সময় যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল তার শরীর। আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। সে দ্রুত বন্ধু মানুকে ফোন করল। বিপদের বন্ধু মানু এসে সব দেখে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার তাগিদ দিল। কিন্তু রাহাদ রাজি না হওয়ায় মানু আপাতত তাকে পোশাক বদলে সাহায্য করল, আঘাতের স্থানে বরফ ও ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে দিল। ফ্রিজে রাখা খাবার গরম করে খাইয়ে, ব্যথার ওষুধ দিয়ে আপাতত সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিল।
ঘর আবার নিঃশব্দ হয়ে এলো। এত রাতে আর কাউকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হলো না রাহাদের। বিছানায় শুয়ে রইল, কিন্তু শ্বাস নেওয়াটা কঠিন ঠেকছে। শরীরে আঘাতের স্থানগুলো তীব্র ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই একাকী মুহূর্তে সে যেন এক মমতার আশ্রয় খুঁজতে চাইল। মোবাইলটা হাতে নিতেই মনে পড়ল তাহমিনার কথা। জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তের স্বীকারোক্তিটুকু আপন মনেই বেরিয়ে এল তার আঙুলের স্পর্শে।
রাহাদ মেসেজে লিখল: “আমার পথে আজ রক্তের দাগ, তাহমিনা। আজ মনে হচ্ছে, এই যাত্রাপথে ফিরে আসার কোনো রাস্তা আর অবশিষ্ট রইল না!”
তাহমিনা গভীর রাতেও জেগে ছিল। মেসেজটি দেখা মাত্রই রাহাদের জীবনের ঝুঁকি আর এই মুহূর্তে তার অবস্থা কল্পনা করে শিউরে উঠল সে।
তাহমিনা কিছুটা সামলে নিয়ে লিখল: “আপনার পথে অনেক আঘাত আসে, তা জানি। এই জীবন কি কখনও আপনাকে থামতে বলে না?” এটুকু কথাতেই শব্দের আড়ালে সে ঢেলে দিল গভীর ভালোবাসা ও উদ্বেগ।
রাহাদ দুর্বল হাতে অক্ষর টিপে লিখল: “থামতে বললেও থামি না। কারণ, যে পথে সত্যের ইশারা আছে, সে পথে থামলেও পথ ফুরায় না। এই পথ তো আমি শুধু ‘মানুষের জিম্মায়’ পেয়েছি।”
সে আরও লিখল: “আমি শুধু লিখে যাই। মনে হয়—এই কঠিন যাত্রা শেষে কোথাও একটা নিরাপদ ‘বারান্দা’ আছে, যেখানে অপেক্ষমাণ কোনো চোখ আমাকে দেখে; যা আমাকে শক্তি জোগায়।”
মেসেজটি পড়ে তাহমিনার চোখ জলে ভরে এল।
সে রাহাদের জবাবে লিখল: “এই পথে অনেক বাধা আছে জানি। কিন্তু আপনিও আপস করতে জানেন না, আপনাকে লড়তেই হয়। আমি আপনার বারান্দায় এক মুঠো জোনাকি রেখে গেলাম। কখনও পথ খুব অন্ধকার হলে, তা দিয়ে আলো খুঁজে নেবেন।”
রাহাদ ভালোবাসার রিঅ্যাক্ট দিয়ে সেই বার্তার নীরবতা গ্রহণ করল।
তার মনে হলো—এই এক মুঠো জোনাকি যেন একটি অপ্রকাশিত আশ্বাস, যা তার শরীরের আঘাতের চেয়েও প্রবল হয়ে তাকে বেঁচে থাকার সাহস জোগায়।
আর তাহমিনা জানল, রাহাদের এই নীরব বারান্দা হলো এক অব্যক্ত জগৎ, যা তাঁদের নিজ নিজ জীবনের কঠিন বাস্তবতার বাইরে এসে মুক্তভাবে শ্বাস নিতে শেখায়।
(ডিসক্লেইমার: গল্পের সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল থাকলে তা নেহাতই কাকতালীয়।)



















