ফিফা ও মার্কিন সরকারের পর্বতসম প্রতিকূলতা ডিঙিয়েই শীর্ষস্থানে ইরান
- আপডেট সময় : ০২:০২:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
- / 38
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পরিখা থেকে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বপ্ন। ফরাসি মেশিনগান অফিসার জুল রিমে বিশ্বাস করতেন, মাঠের ফুটবল টুর্নামেন্ট বিশ্বজুড়ে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করবে, এক সুতোয় বাঁধবে বিবদমান দেশগুলোকে। শত বছর পর সেই স্বপ্ন আজ রূপ নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসবে—৪৮টি দেশের এক মহামিলনমেলা, যেখানে জড়িয়ে আছে ৮.৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। কিন্তু আজ যখন তিনটি দেশ মিলে এই উৎসবের আয়োজন করছে, তখন শান্তির সেই আদি বার্তা ঢাকা পড়ে গেছে যুদ্ধের দামামায়। চরম irony বা পরিহাস এটাই যে, টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে আয়োজক দেশগুলোর একটি খোদ জড়িয়ে পড়েছে এক প্রতিযোগী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।
ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রেই চড়া মূল্য দাবি করেনি, বরং খেলার মাঠের সমতাকেও করে দিয়েছে ক্ষতবিক্ষত। যেখানে বাকি ৪৭টি দল পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খেলছে, সেখানে ইরানের ‘টিম মেলি’কে লড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আর চরম অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে টিজুয়ানার বেস ক্যাম্পে তাদের প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে হচ্ছে।
অথচ এই পর্বতসম প্রতিকূলতা ডিঙিয়েই রবিবার বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১০ নম্বর দল বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ০-০ গোলে ড্র করেছে ইরান। তারা এখন শুধু নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার দৌড়েই নেই, বরং গ্রুপ ‘জি’-র শীর্ষস্থান দখলের অন্যতম দাবিদার। এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স যেমন রূপকথার মতো, তেমনই তা আঙুল তুলছে ফিফার সেই তথাকথিত ‘অরাজনৈতিক’ টুর্নামেন্টের দাবির দিকে। একই সাথে এই উদ্বেগও বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, আর মাত্র দুই বছর পর যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে অলিম্পিকের আসর বসবে, তখন বিশ্ব কি একই রকম একপেশে কূটনীতির সাক্ষী হবে?
একটি বড় প্রশ্ন: রাশিয়া ও কাতারের মতো দেশগুলো যদি আগের দুটি বিশ্বকাপে প্রতিটি দল ও ভক্তদের জন্য ভিসা নীতি শিথিল করতে পারে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হলো?
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কেবল ইরানের নাগরিকদেরই নয়, বরং হাইতি, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের মতো অংশগ্রহণকারী দেশের সাধারণ মানুষের ভিসাও স্থগিত করেছে। হয়রানির শিকার হতে হয়েছে ফুটবলারদেরও; ইরাকি স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে দীর্ঘ সাত ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত আর খেয়ালখুশি মতো চাপানো নিয়মটি খাটানো হয়েছে ইরানের ফুটবলারদের ওপর। তাদের ১৫ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তো দেশেই ঢুকতে দেওয়া হয়নি, আর মূল দলের সদস্যদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনই দেশ ছাড়ার। ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা আগে আসা যাবে কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা আগে নয়—এমন বৈষম্যমূলক নিয়ম যেকোনো দলের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
উইঙ্গার আলিরেজা জাহানবখশ ম্যাচ শেষে সাবলীল ইংরেজিতে বলছিলেন, “আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতি আমাদের আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। আজ মাঠে আমরা যে বুক চিতিয়ে লড়াইটা করেছি, তা আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকেই শক্তি পেয়েছে।”
কোচ আমির গালেনোই যেন এক দোভাষীর মাধ্যমে দলের সেই দীর্ঘ কষ্টের খতিয়ানই তুলে ধরলেন: “আমরা ছয় মাস ধরে যুদ্ধাবস্থার মধ্যে ছিলাম। দেশে কোনো লীগ ছিল না। ফিফা বাছাইপর্বের ম্যাচের জন্য আমাদের সড়কপথে টানা ৪০ ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়েছে। আমেরিকার ভিসা জটিলতা তো সবার জানা। দলের একভাগ খেলোয়াড় প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে থাকলেও অন্যভাগের ঘরোয়া লীগ যুদ্ধের কারণে বন্ধ ছিল। এমনকি আমাদের সাথে প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা থাকা দলগুলোও শেষ মুহূর্তে পিছু হটে। আমরা সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছিলাম। আমি চাই বিশ্ববাসী এটা জানুক—এই ছেলেরা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।”
কিন্তু ফিফা কী করছিল?
এই পুরো ঘটনাটি ফুটবলের মূল চেতনার ওপর এক বড় আঘাত। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ভুল করতে পারে, কিন্তু এই ‘সুন্দর খেলাটির’ (Beautiful Game) প্রাণশক্তিকে কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। তবে প্রশ্ন ওঠে ফিফাকে নিয়ে। সেই সর্বশক্তিমান সংস্থা—যাদের মূলমন্ত্রই হলো “ফুটবল বিশ্বকে এক করে”? গুগল বা অ্যাপল ম্যাপস থেকে সোফাই স্টেডিয়ামের নাম মুছে যারা নিজেদের বাণিজ্যিক ক্ষমতাবলে ‘লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম’ বসিয়ে দিতে পারে, সেই পরাক্রমশালী ফিফা ফুটবলের মর্যাদা রক্ষায় কী করল?
উত্তর হলো: প্রায় কিছুই না।
মার্কিন প্রশাসনের সামনে ফিফা কেবল তোষামোদ আর সৌজন্যের রাজনীতিই করে গেল। এই টুর্নামেন্টের গরিমা নষ্ট করার জন্য আয়োজক দেশকে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়নি। অথচ বাছাইপর্বে সমর্থকদের বর্ণবাদী আচরণের দায়ে ফিফা অতীতে ছয়টি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে জরিমানা করতে দ্বিধা করেনি। ১৯৮৮ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে অতিরিক্ত বয়সী খেলোয়াড় খেলানোর অপরাধে মেক্সিকোকে সব প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করেছিল এই ফিফাই। ২০০৬ সালেও, এশীয় বাছাইপর্বের ম্যাচে ইরানের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় মিয়ানমারকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
অথচ আজ যখন একটি দেশের ফুটবলকে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, তখন ফিফা রইল নীরব দর্শক। ফুটবলের এই মহোৎসবে বৈষম্যের এই কালো দাগ সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
তথ্য সূত্র: দ্য লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস।















