ভারতের জন্য চাবাহার কি দুঃস্বপ্ন হতে চলেছে
- আপডেট সময় : ০২:৩৮:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
- / 55
আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের চাবাহার বন্দর। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত সমীকরণ এবং ওয়াশিংটনের অনড় অবস্থানে সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এখন গভীর সংকটের মুখে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় চাবাহার নিয়ে নয়াদিল্লির এক দশকব্যাপী বিনিয়োগ এবং মধ্য এশিয়ায় সরাসরি প্রবেশের স্বপ্ন এখন এক চরম অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ চাপ” (Maximum Pressure) অভিযানের মাধ্যমে ইরানের রাজস্ব প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা চাবাহারসহ ইরান-সম্পর্কিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞার ছাড় প্রত্যাহার করছে।
যদিও ভারত সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় এই ছাড়ের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে একটি নির্বিঘ্ন বাণিজ্য ও ট্রানজিট করিডোর তৈরির ভারতীয় আশার কেন্দ্রে থাকা এই প্রকল্পটি এখন সম্ভাব্য এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার সম্মম্মুখীন।
ভারতের জন্য চাবাহার কেন ‘লাইফলাইন? ভারতের বৃহত্তর প্রতিবেশী অঞ্চলে চাবাহার ছিল ভারতের জন্য একটি বিকল্প ও নিরাপদ প্রবেশদ্বার। এর গুরুত্ব মূলত তিনটি প্রধান দিকের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে:
১. পাকিস্তানকে এড়িয়ে বিকল্প পথ: ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান দীর্ঘকাল ধরে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের স্থলপথে পণ্য পাঠানোর ট্রানজিট আটকে রেখেছে।
চাবাহার বন্দর ভারতকে একটি সরাসরি সামুদ্রিক পথ ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়-যেখানে ইরানের ওমান উপসাগরীয় উপকূল থেকে সড়ক ও রেলপথে আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় পণ্য ট্রানজিট সম্ভব, গোয়াদর ও চীনের আধিপত্য রুখতে কৌশলগত ভারসাম্য: পাকিস্তানের গোয়াদরে চীনের অর্থায়নে নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দরটি ভারত ও ওমান উপসাগরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
২. গোয়াদর থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে চাবাহারে ভারতের উপস্থিতি মূলত চীনের নৌ-অভিযান ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করার একটি মোক্ষম চাল ছিল।
৩. আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর (INSTC): চাবাহার হলো ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আইএনএসটিসি’ করিডোরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার। এটি রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক, যা ইরান হয়ে রাশিয়া ও।
ভারতের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। মধ্য এশিয়ায় ভারতের সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টার জন্য এটি অপরিহার্য বলে মনে করেন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চফাউন্ডেশনের ফেলো কবির তানেজা।
বিনিয়োগের পাহাড় ও রাজনৈতিক উত্তাপ ভারত চাবাহারের শহীদ বেহেশতি টার্মিনাল আধুনিকায়ন করতে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান করা হয়েছে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে এই বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি ছিল, সেখানে কেন জনগণের করের টাকার বিশাল অংশ ইরান-কেন্দ্রিক এই প্রকল্পে ঢালা হলো?
ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ। তেহরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করায় ভারতের মতো জ্বালানি নির্ভরশীল দেশগুলো বিপাকে গড়েছে।
ভারত একদিকে যেমন আমেরিকার ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র হতে চাইছে, অন্যদিকে নিজের জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগের প্রয়োজনে ইরানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার নীতিই এখন চাবাহারকে বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর কাবুলের সাথে ইসলামাবাদের সম্পর্কের অবনতি চাবাহারের গুরুত্ব ভারতের কাছে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকলে এই প্রকল্প এখন বন্দি।
যদি ওয়াশিংটন তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে ভারতের কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙক্ষা কেবল এক নিষ্প্রাণ অবকাঠামোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাবাহার ভারতের জন্য ‘মুক্তির পথ’ হবে নাকি ‘কৌশলগত ভুল’, তার উত্তর এখন কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলেই লুকিয়ে আছে।
–আল জাজিরা অবলম্বনে।















