এলো আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাহে রমাদ্বান
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 107
তারাবিহ ও সেহরির মাধ্যমে শুরু হলো সিয়াম সাধনা। কুরআন ও হাদিসের আলোকে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং জীবন পরিবর্তনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
শান্তি ও রহমতের বার্তা নিয়ে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে এলো পবিত্র মাহে রমাদ্বান। বুধবার রাতে তারাবিহ নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি।
এই মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র কুরআন। এ মাসের প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়। বিশেষ করে ‘লাইলাতুল কদর’ নামক রাতটি এই মাসকে করেছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। রমাদ্বান কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের এক মহিমান্বিত সুযোগ।
ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম এই রোজা সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)।
এই আয়াতের মর্মার্থ অনুযায়ী, রোজার মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। রোজা একজন মুমিনকে শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করতে শেখায় না, বরং মিথ্যা, গীবত, হিংসা ও ক্রোধের মতো অভ্যন্তরীণ ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেয়।
এই ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতিই হলো ইসলামের মূল শিক্ষা। তাকওয়া মানে হলো জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা এবং তাঁর অসন্তুষ্টির ভয়ে অন্যায় থেকে বিরত থাকা। রমজানের দীর্ঘ এক মাস ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে মুমিনের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত হয় যে, যে আল্লাহ আমাকে নির্জনেও পানাহার করতে নিষেধ করেছেন, তিনি আমার প্রতিটি কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন।
রোজার মাধ্যমে মানুষ তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। যদি আল্লাহর নির্দেশে আমরা দিনের বেলা হালাল খাবার ত্যাগ করতে পারি, তবে সারাজীবন হারাম থেকে বিরত থাকা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার পরও যখন আমরা সামনে খাবার থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে তা স্পর্শ করি না, তখন আমাদের ইচ্ছা শক্তি (Will Power) শক্তিশালী হয়।
এই প্রশিক্ষণ আমাদের শেখায় যে, আমরা যদি আল্লাহর আদেশে হালাল ও বৈধ জিনিস সাময়িকভাবে ত্যাগ করতে পারি, তবে সারাজীবনের জন্য মিথ্যা, গীবত, সুদ, ঘুষ ও হারামের পথ ত্যাগ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব নয়। এছাড়া রোজা ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়। সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার ফলে একজন বিত্তবান ব্যক্তি দরিদ্র মানুষের ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করতে পারেন, যা সমাজে সহমর্মিতা ও দান-সদকার মানসিকতা বৃদ্ধি করে।
রমাদ্বানের পুরো সময়টি আমাদের একটি সুশৃঙ্খল রুটিনে বেঁধে দেয়। সেহরি, ইফতার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং তারাবিহর নির্দিষ্ট সময় আমাদের সময়ানুবর্তিতা ও ধৈর্য শিক্ষা দেয়। রমাদ্বান মাসের এই দীর্ঘ ৩০ দিনের প্রশিক্ষণ যদি আমাদের পরবর্তী ১১ মাসের জীবনে প্রভাব না ফেলে, তবে তা কেবল উপবাসই থেকে যাবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—রোজার মাধ্যমে অর্জিত ধৈর্য, সংযম এবং হালাল-হারামের বাছবিচার যেন সারা বছর আমাদের চলার পথের পাথেয় হয়। রমাদ্বানের এই শুভলগ্নে আমাদের শপথ হোক—হিংসা, দ্বেষ ও অন্যায়ের পথ ত্যাগ করে একটি মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।
“রোজা শুধু উপবাস নয়—এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সাধনা। রমাদ্বান হোক আমাদের জীবন পরিবর্তনের শুরু।”














