Bangladesh ০৯:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয়ের নতুন আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্বোধন আমাদের পথিকৃৎ সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুযোগ বাড়াতে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা অসহায় পরিবারের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের বাড়ির চাবি হস্তান্তর “মায়ের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যু হলে, সে মৃত্যুই পরম শ্রেয়” বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে ঐতিহাসিক ৪টি সিদ্ধান্ত এলো খাজা বড় চাচাজানের দিশারী বক্তব্য ফেসবুকে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ছড়িয়ে মানহানী : থানায় জিডি কনসার্টের উচ্চ শব্দে শিশুদের কষ্টের কথা জেনে ক্ষমা চাইলেন বিএনপি নেতা স্বপন সাংবাদিক আমির খসরু আর নেই শহর ফরিদপুর ও গণিকালয়ের ডেরা: কার কান্না কত ভারী?

শুরু হলো অমর একুশে: আত্মপরিচয়ের ফেব্রুয়ারি মাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০২:২৪:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 320

আজ ১ ফেব্রুয়ারি। শুরু হলো বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মাস। ১৯৫২ সালের ২১ মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। মাস জুড়ে দানা বেঁধে উঠেছিল এই আন্দোলন। দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অমর একুশে আজ বিশ্বপরিসরেও প্রতিষ্ঠিত এবং গুরুত্ব অর্জন করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া সেই মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রকাশ।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। মাঝখানে ভারতের বিশাল ভূখণ্ড থাকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে একসূত্রে বেঁধে রাখার জন্য একটি ‘সাধারণ যোগসূত্র’ খুঁজছিলেন পাকিস্তানের নেতারা। তারা মনে করেছিলেন একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য একটি সাধারণ ভাষা প্রয়োজন।

ভাষা নিয়ে এই বিতর্কের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যদি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হতো, তবে শিক্ষিত বাঙালিরা সরকারি চাকরিতে পিছিয়ে পড়ত। কারণ উর্দুই হতো দাপ্তরিক পরীক্ষার একমাত্র ভাষা। বাঙালির দীর্ঘদিনের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মুছে দিয়ে তাদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া ছিল এই ঘোষণার অন্যতম গূঢ় উদ্দেশ্য।

এই একতরফা ঘোষণার মাধ্যমেই মূলত বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো স্থান নেই। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়। ভাষা আন্দোলনের এই ইতিহাস কেবল একটি মাস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এর তিনদিন পর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন উৎসবেও তিনি একই কথা বলেন। তখন উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে ‘না না’ বলে প্রতিবাদ জানান।

জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন নতুন করে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে।” এই বক্তব্যের পর ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট ও গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আয়োজিত সভায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল বের করলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা ঢাকা শহর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাষা শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে ছাত্ররা প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গুঁড়িয়ে দেয়।

অমর একুশে উপলক্ষে প্রতিবছর মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমি এ বছর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি রোববার প্রতীকী বইমেলা বসছে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ চত্বরে। একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ এই মেলার আয়োজন করেছে। মেলায় অর্ধশত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠন অংশ গ্রহণ করেছে। মেলায় অমর একুশের গান, আবৃত্তি, নাটক, বক্তৃতার আয়োজন করা হয়।

ট্যাগ

শুরু হলো অমর একুশে: আত্মপরিচয়ের ফেব্রুয়ারি মাস

আপডেট সময় : ০২:২৪:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আজ ১ ফেব্রুয়ারি। শুরু হলো বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মাস। ১৯৫২ সালের ২১ মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। মাস জুড়ে দানা বেঁধে উঠেছিল এই আন্দোলন। দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অমর একুশে আজ বিশ্বপরিসরেও প্রতিষ্ঠিত এবং গুরুত্ব অর্জন করেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া সেই মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রকাশ।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। মাঝখানে ভারতের বিশাল ভূখণ্ড থাকায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে একসূত্রে বেঁধে রাখার জন্য একটি ‘সাধারণ যোগসূত্র’ খুঁজছিলেন পাকিস্তানের নেতারা। তারা মনে করেছিলেন একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য একটি সাধারণ ভাষা প্রয়োজন।

ভাষা নিয়ে এই বিতর্কের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যদি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হতো, তবে শিক্ষিত বাঙালিরা সরকারি চাকরিতে পিছিয়ে পড়ত। কারণ উর্দুই হতো দাপ্তরিক পরীক্ষার একমাত্র ভাষা। বাঙালির দীর্ঘদিনের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মুছে দিয়ে তাদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া ছিল এই ঘোষণার অন্যতম গূঢ় উদ্দেশ্য।

এই একতরফা ঘোষণার মাধ্যমেই মূলত বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির কোনো স্থান নেই। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়। ভাষা আন্দোলনের এই ইতিহাস কেবল একটি মাস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বলেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এর তিনদিন পর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন উৎসবেও তিনি একই কথা বলেন। তখন উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে ‘না না’ বলে প্রতিবাদ জানান।

জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন নতুন করে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে যাচ্ছে।” এই বক্তব্যের পর ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘট ও গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আয়োজিত সভায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল বের করলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা ঢাকা শহর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ভাষা শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে ছাত্ররা প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গুঁড়িয়ে দেয়।

অমর একুশে উপলক্ষে প্রতিবছর মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করা হয়। বাংলা একাডেমি এ বছর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি রোববার প্রতীকী বইমেলা বসছে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ চত্বরে। একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ এই মেলার আয়োজন করেছে। মেলায় অর্ধশত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠন অংশ গ্রহণ করেছে। মেলায় অমর একুশের গান, আবৃত্তি, নাটক, বক্তৃতার আয়োজন করা হয়।