০৪:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
ফরিদপুরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন মুম্বাই বিমানবন্দরে ১২ কোটি রুপির মাদকসহ সাবেক ‘মিসেস কেরালা’ প্রতিযোগী গ্রেপ্তার সকলকে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকতে হবে -পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আগ্রহের কেন্দ্রে ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতির নির্বাচন বিশ্বকাপে প্রথম খেলায় চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে কোরিয়ার জয় প্রতারক সন্দেহে খাসি ব্যবসায়ীকে বাড়িতে ডেকে মহিলাদের নির্যাতন, টাকা লুটের অভিযোগ লাল কার্ডের রেকর্ডেও উদ্বোধনী ম্যাচে জয়ের ধারায় মেক্সিকো দাঙ্গা আর মামলার ঝক্কি এড়িয়ে শান্তি ফিরবে কি অশান্ত সালথায়? নীরব ঘাতক ‘ফ্যাটি লিভার’: সচেতনতাই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি স্কুলের সামনে বিটুমিন পোড়ানোর ধোঁয়ায় অসুস্থ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীরা

নীরব ঘাতক ‘ফ্যাটি লিভার’: সচেতনতাই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি

ডা. এম. এম. শাহিন-উল-ইসলাম
  • আপডেট সময় : ১১:০০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
  • / 602

আজ ১১ ই জুন, ‘বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস’। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে যকৃৎ বা লিভারের অন্যতম প্রধান এক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়। আধুনিক নগরজীবন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস আর কায়িক শ্রমের অভাব আমাদের যে কয়টি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যাটি লিভার’। সাধারণ ভাষায় একে লিভারে চর্বি জমা বলা হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি এক নীরব ঘাতক।

​ফ্যাটি লিভার কী এবং কেন হয়?

​স্বাভাবিক অবস্থায় লিভারে সামান্য চর্বি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি লিভারের মোট ওজনের ৫% থেকে ১০%-এর বেশি চর্বি জমে, তবে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। ফ্যাটি লিভার মূলত দুই ধরনের হতে পারে:

১. অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার: অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে যা হয়।

২. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (NAFLD) বা মেটাবোলিক ডিসফাংশন এসোসিয়েটেড  স্টিয়াটোটিক  লিভার ডিজিজ (MASLD): মদ্যপান না করার পরেও লিভারে চর্বি জমা। আমাদের দেশে এই ধরনের রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

​এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো— অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল, নিয়মিত শারিরীক পরিশ্রম না করাএবং প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস।

​কেন একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?

​ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এর প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে না। সামান্য ক্লান্তি বা পেটের ডান পাশে হালকা অস্বস্তি ছাড়া রোগী কিছুই টের পান না। ফলে রোগটি নীরবেই শরীরে বাসা বাঁধে।

​লক্ষণ না থাকায় অনেকেই একে অবহেলা করেন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই চর্বি থেকে লিভারে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস (NASH/MASH)। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে তা লিভার সিরোসিস ও পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

​রোগ নির্ণয় ও প্রতিকার

​যেহেতু লক্ষণ দেখে রোগ বোঝা কঠিন, তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করতে হয়। সাধারণত পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG of Whole NGO/Abdomen), লিভারের এনজাইম পরীক্ষার (যেমন: SGPT, SGOT) এবং ফাইব্রোস্ক্যানের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে।

​ফ্যাটি লিভারের জন্য এখনো জাদুকরী কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। এর আসল চিকিৎসা লুকিয়ে আছে আপনার জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে আমি সবসময় কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে বলি:

  • ​খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: অতিরিক্ত শর্করা, ফাস্টফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস, চর্বিযুক্ত মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। খাদ্যতালিকায় রাখুন প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ওটস এবং আঁশযুক্ত খাবার।
  • ​ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন লিভারে চর্বি জমার প্রধান কারণ। শরীরের সামগ্রিক ওজনের মাত্র ৭% থেকে ১০% কমাতে পারলে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ অনেকাংশে কমে যায়।
  • ​নিয়মিত কায়িক শ্রম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট (প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৫ দিন) মাঝারি ধরনের ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • ​ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের তা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • ​ওষুধ গ্রহণে সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোন ধরনের ঔষধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, কারণ এগুলো লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

শেষ কথা

​লিভার হলো আমাদের শরীরের পাওয়ার হাউস বা শক্তিঘর। শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করা এবং বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে এর ভূমিকা অনন্য। তাই ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

​আজকের এই বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক— ‘সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম’। সচেতন হোন, জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনুন এবং সুস্থ-সবল লিভার নিয়ে দীর্ঘায়ু লাভ করুন, সবার সু-স্বাস্থ্য কামনা করছি।

শেয়ার করুন

নীরব ঘাতক ‘ফ্যাটি লিভার’: সচেতনতাই সুস্থ লিভারের চাবিকাঠি

আপডেট সময় : ১১:০০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আজ ১১ ই জুন, ‘বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস’। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে যকৃৎ বা লিভারের অন্যতম প্রধান এক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়। আধুনিক নগরজীবন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস আর কায়িক শ্রমের অভাব আমাদের যে কয়টি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফ্যাটি লিভার’। সাধারণ ভাষায় একে লিভারে চর্বি জমা বলা হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি এক নীরব ঘাতক।

​ফ্যাটি লিভার কী এবং কেন হয়?

​স্বাভাবিক অবস্থায় লিভারে সামান্য চর্বি থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি লিভারের মোট ওজনের ৫% থেকে ১০%-এর বেশি চর্বি জমে, তবে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। ফ্যাটি লিভার মূলত দুই ধরনের হতে পারে:

১. অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার: অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে যা হয়।

২. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (NAFLD) বা মেটাবোলিক ডিসফাংশন এসোসিয়েটেড  স্টিয়াটোটিক  লিভার ডিজিজ (MASLD): মদ্যপান না করার পরেও লিভারে চর্বি জমা। আমাদের দেশে এই ধরনের রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

​এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো— অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল, নিয়মিত শারিরীক পরিশ্রম না করাএবং প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস।

​কেন একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?

​ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এর প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষণ থাকে না। সামান্য ক্লান্তি বা পেটের ডান পাশে হালকা অস্বস্তি ছাড়া রোগী কিছুই টের পান না। ফলে রোগটি নীরবেই শরীরে বাসা বাঁধে।

​লক্ষণ না থাকায় অনেকেই একে অবহেলা করেন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে এই চর্বি থেকে লিভারে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়, যাকে বলা হয় নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস (NASH/MASH)। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে তা লিভার সিরোসিস ও পরবর্তীতে লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

​রোগ নির্ণয় ও প্রতিকার

​যেহেতু লক্ষণ দেখে রোগ বোঝা কঠিন, তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এটি শনাক্ত করতে হয়। সাধারণত পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG of Whole NGO/Abdomen), লিভারের এনজাইম পরীক্ষার (যেমন: SGPT, SGOT) এবং ফাইব্রোস্ক্যানের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে।

​ফ্যাটি লিভারের জন্য এখনো জাদুকরী কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। এর আসল চিকিৎসা লুকিয়ে আছে আপনার জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মধ্যে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে আমি সবসময় কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে বলি:

  • ​খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: অতিরিক্ত শর্করা, ফাস্টফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস, চর্বিযুক্ত মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। খাদ্যতালিকায় রাখুন প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, ওটস এবং আঁশযুক্ত খাবার।
  • ​ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন লিভারে চর্বি জমার প্রধান কারণ। শরীরের সামগ্রিক ওজনের মাত্র ৭% থেকে ১০% কমাতে পারলে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ অনেকাংশে কমে যায়।
  • ​নিয়মিত কায়িক শ্রম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট (প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৫ দিন) মাঝারি ধরনের ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • ​ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের তা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • ​ওষুধ গ্রহণে সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোন ধরনের ঔষধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, কারণ এগুলো লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

শেষ কথা

​লিভার হলো আমাদের শরীরের পাওয়ার হাউস বা শক্তিঘর। শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করা এবং বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে এর ভূমিকা অনন্য। তাই ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

​আজকের এই বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক— ‘সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম’। সচেতন হোন, জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনুন এবং সুস্থ-সবল লিভার নিয়ে দীর্ঘায়ু লাভ করুন, সবার সু-স্বাস্থ্য কামনা করছি।