শহরের বহুতল ভবন ও বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্যে ভয়ংকর দূষণে কুমার নদ
নদীর দূষণে সংকটে জীবন
- আপডেট সময় : ১১:৪২:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- / 112
ফরিদপুরের কুমার নদের চিত্র। দখলে-দূষণে শহরের এই াক্সিজেনের ভান্ডারটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। ছবি- অগ্নিপ্রহর
ফরিদপুরে পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া কুমার নদ। পৌর এলাকার পয়ঃবর্জ্যের প্রায় ৭০ ভাগই সরাসরি কুমার নদের বুকে ফেলা হচ্ছে। অনেক বহুতল ভবনের পয়ঃবর্জ্যের লাইন সরাসরি ড্রেনের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যা বিভিন্ন নালা হয়ে এই নদীর বুকে পড়ছে। এতে চরম দূষণের কারণে কুমার নদের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ফলে নিত্যদিনের কাজেকর্মে চাপ পড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির উপরে। অন্যদিকে, নিতান্ত বাধ্য হয়ে যারা এই পানি ব্যবহার করছেন, তারাও নানা পানিবাহিত রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিরাট ক্ষতির শিকার হচ্ছে পরিবেশের জীববৈচিত্র। পাশাপাশি পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশন খাতে পৌরসভার রাজস্ব আয়ও কমে গেছে।
এ বিষয়ে ইতোপূর্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জড়িতদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও কাজ হয়নি। পৌর কর্তৃপক্ষের তরফ হতে কঠোর অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার ফল মিলছেনা। তবে তারা বলছেন, এসব অবৈধ পয়ঃবর্জ্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে শিঘ্রই কঠোর অবস্থানে যাচ্ছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে এব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জনগণের পক্জোষ থেকে জোর দাবি উঠেছে ।
ফরিদপুর নগর কর্তৃপক্ষ এই পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩৮ হাজার নিবন্ধিত হোল্ডিংধারী বসতবাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে পানির লাইনের গ্রাহক রয়েছেন ১০ হাজারের মতো।
এছাড়া বাসাবাড়ি ও সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নির্ধারিত লাইন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। অথচ এর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার বাসাবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী পৌরসভার মাধ্যমে মল ও বর্জ্য পরিষ্কার করেন। বাকি বিশাল একটি অংশ অবৈধভাবে ড্রেন ও নালার মাধ্যমে সেফটি ট্যাংকির সংযোগ করে অথবা ভিন্ন কোন পন্থায় বর্জ্য অপসারণ করছে। এই হিসেবে দৈনিক প্রায় র৪০ থেকে ৫০ টন পয়ঃবর্জ্য গিয়ে পড়ছে এই কুমার নদের বুকে। যা দিনের পর দিন জমে থেকে নদীর বুকে এক ভয়ংকর দূষণের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। স্যানিটেশন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংক প্রতি ৩ থেকে ৫ বছর পর পর পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফরিদপুর পৌরসভার চিত্র যেনো তার উল্টো।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে যে সকল প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি থেকে নিয়মিত পরিস্কার করানো হতো, সেসকল বাসাবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানও বিগত কয়েক বছরযাবত তাদের দিয়ে সেগুলো পরিস্কার করাচ্ছে না। এমনকি প্রত্যেকে প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে সেফটিক ট্যাংকের পাশাপাশি সোকওয়েল থাকার কথা থাকলেও তাও নেই অনেকের।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী আরো জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বসতবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র ৩০টি পরিবার সেফটিক ট্যাংক পরিষ্কার করিয়েছে। এ হিসেবে গড়ে প্রতি মাসে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫টি পরিবার এই সেবা গ্রহণ করে। শতকরা হিসাবে এতে মাত্র ৩০ শতাংশ বৈধভাবে পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশন করছে। বাকি বৃহৎ অংশই সরাসরি অবৈধ লাইন দিয়ে ড্রেনে কিংবা আশেপাশের বিকল্প উপায় অবলম্বন করছে।
ফরিদপুর পৌরসভা পয়ঃনিষ্কাশন ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (CRPC) চালু হওয়ার পর থেকে সেপটিক ট্যাংকের মল পরিস্কার বাবদ ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর কয়েক লক্ষাধিক টাকা আয় করতো। কিন্তু গত কয়েক বছরযাবত পৌরসভা থেকে সেবা না নিয়ে অবৈধভাবে ড্রেনের লাইনে বর্জ্য সংযোগ দেওয়ায় এই আয় অনেকটাই কমে গেছে। আর এদের একটি বড় অংশই এই পয়ঃবর্জ্য অসাধু উপায়ে ড্সরেনের মাধ্যমে কুমার ফেলছে। যা গোটা নদীকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোপূর্বে কুমার নদের দখল-দূষণ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। ময়লা–আবর্জনা ফেলে কুমার নদ দূষিত না করার জন্য বাজার কমিটিকে কঠোর হুঁশিয়ারির পাশাপাশি পৌরসভাকে ড্রেনের পয়বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। এরপর প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফরিদপুর পৌরসভার নর্দমার পানি নিয়মিতভবে কুমার নদে ফেলে দূষিত করা হচ্ছে। পাশপাশি নদীর পাড়ের সরকারি তিতুমীর বাজার ও হাজী শরিয়তুল্লাহ বাজারের যাবতীয় বর্জ্য প্রতিদিন এ নদীতে ফেলা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মিয়াপাড়ার রিয়াজউদ্দিন সড়কের বাসিন্দা রওশান আরা দীপ্তি বলেন, ‘‘ শহরের অনেক বাসিন্দা অবৈধলাইনের মাধ্যমে ড্রেনে ময়লা ফেলাচ্ছে। তাইড্রেনের উপর দিয়ে হাঁটা-চলাফেরা করার সময় তীব্রদুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমরা চাইবো পরিবেশ রক্ষায় পৌরসভার পক্ষ থেকে অতি দ্রুত অবৈধ সংযোগগুলো বন্ধ করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শহরের পূর্ব খাবাসপুর মহল্লার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান মিয়া বলেন, ‘‘আমরা আগে এই নদীতে গোসল করতাম। নদীর পানি দিয়ে বাসাবাড়ির নানা কাজ এমনকি রান্নাবান্নাতেও ব্যবহার করতাম। এই নদীর পানি দিয়ে অনেকে ওযুও করতেন। কিন্তু এখন এই নদের পানিতে শরীর ভেজালে চুলকানি হয়। মারাত্মকভাবে এই নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়েছে।
এ নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, “যারা এই পয়ঃবর্জ্য সরাসরি পৌরসভার ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ফেলছেন, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা উচিত। এর সাথে যেসকল বাসাবাড়িতে সেপটিক ট্যাংকের সাথে সোকওয়েল করা হয়না তাদের সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনলে নদীর এই দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।”
এ বিষয়ে ফরিদপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) সৈয়দ মোঃ আশরাফজানান দৈনিক অগ্নিপ্রহরকে জানান, “এই মাস থেকেই অবৈধ লাইনগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব বাড়িতে ড্রেনের সাথে পয়ঃবর্জ্যের লাইনের সংযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নদীতে আর্বজনা ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর পৌরসভার দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রশাসক (ডিডিএলজি) বলেন, আমাদের পৌর শহরের যতময়লা-আর্বজনা ড্রেনের মাধ্যমে নদে যায়। আসলে আমাদের এ আবর্জনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় এগুলো হয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আমরা পৌর শহরের আর্বজনা ও ড্রেনের ময়লাপানি যেন কুমার নদে না যায় সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছি।
ফরিদপুর শহরের অক্সিজেনভান্ডার এই কুমার নদের দূষণরোধে কার্যকর উপায় গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।













