ওয়ান হেলথ: বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য রক্ষার কার্যকর সমাধান
- আপডেট সময় : ১২:৪২:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
- / 73
বর্তমান বিশ্বে সংক্রামক ব্যাধি ও পরিবেশগত বিপর্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল মানুষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখার আর সুযোগ নেই। ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ হলো এমন একটি বৈপ্লবিক ধারণা, যা মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একই সুতোয় গেঁথে দেখার কথা বলে। এই পদ্ধতিটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে স্বীকৃত।
ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে—মানুষ, প্রাণী এবং আমাদের চারপাশের পরিবেশের স্বাস্থ্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই তিনটি খাতের বিশেষজ্ঞরা যখন সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তখনই কেবল একটি টেকসই স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় ওয়ান হেলথ পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ মহামারি (যেমন: কোভিড-১৯, ইবোলা, নিপাহ ভাইরাস) প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়িয়েছে। ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাণীর স্বাস্থ্যের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে এসব রোগ শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মানুষ ও গবাদি পশু—উভয় ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জীবাণুকে শক্তিশালী করে তুলছে। এটি নিয়ন্ত্রণে ডাক্তার ও পশুচিকিৎসকদের যৌথ সমন্বয় জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজাড়ের ফলে বন্যপ্রাণী মানুষের সংস্পর্শে আসছে, যা নতুন নতুন ভাইরাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা করা তাই পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষারই নামান্তর।
সুস্থ পশু এবং দূষণমুক্ত মাটি ও পানি থেকে উৎপাদিত খাদ্যই কেবল মানুষের দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব প্রাণিসম্পদ সংস্থা (WOAH) সম্মিলিতভাবে বিশ্বজুড়ে ‘ওয়ান হেলথ’ বাস্তবায়নে কাজ করছে।
বাংলাদেশেও এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ এবং গবাদি পশুর রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগ এখন একটি সাধারণ প্ল্যাটফর্মে কাজ করছে। ‘ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে এই কার্যক্রম গতিশীল করা হয়েছে।
ওয়ান হেলথ পদ্ধতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতি। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে প্রয়োজন:
জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ খাতের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যাতে মানুষ বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় যত্নবান হয়। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
একটি সুস্থ আগামীর জন্য ‘ওয়ান হেলথ’ কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং সময়ের দাবি। মানুষ, প্রাণী ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমেই আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি রোগমুক্ত ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে পারি।













