Bangladesh ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিদেশে চাকরির ফাঁদ দেখিয়ে অপহরণ : মুক্তিপণ দাবি

৯ দিন নির্যাতনের পর উদ্ধার শিকলবন্দি তরুণ, গ্রেপ্তার ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৯:১৭:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / 152

র‍্যাব-১০ এর সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে ব্রিফিং করছেন র‍্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। -অগ্নিপ্রহর

বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর এক তরুণকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র। এরপর একটি আবাসিক ভবনের বদ্ধ কক্ষে পায়ে শিকল পরিয়ে টানা ৯ দিন আটকে রেখে চালানো হয় বর্বরোচিত নির্যাতন। নির্যাতনের আর্তনাদ আড়াল করতে বাজানো হতো উচ্চশব্দের সাউন্ডবক্স! অবশেষে ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুর এলাকা থেকে শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানে অপহৃত ওই তরুণকে জীবিত উদ্ধার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-১০)। এ সময় অপহরণ চক্রের মূলহোতাসহ তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে কেরানীগঞ্জে র‍্যাব-১০ এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।

উদ্ধার হওয়া তরুণের নাম মো. নিলয় শিকদার (৩৫)। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা থানার মহেষপাড়া এলাকার মৃত আবু খায়েরের ছেলে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার রঘুনন্দনপুর এলাকার মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ও চক্রের মূলহোতা মো. ফেরদৌস উর রহমান (৪২), গোয়ালচামট এলাকার মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে মহুয়া আহমেদ (৩২) এবং মুন্সীডাঙ্গী এলাকার মৃত আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে এস এম মনোয়ার (৩৬)।

যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ ও মুক্তিপণ আদায়: র‍্যাব-১০ এর প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরি দেওয়ার কথা বলে নিলয় শিকদারের কাছ থেকে কয়েক দফায় পাসপোর্টসহ ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। কিন্তু বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে গত ৬ আগস্ট তাকে অপহরণ করা হয়। পরে তার পরিবারের কাছে ফোন করে আরও ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় নিলয়ের পরিবার বিভিন্ন বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে ৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পাঠায়। কিন্তু চক্রটি তাকে মুক্তি না দিয়ে উল্টো আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে বসে। নিরুপায় হয়ে ভিকটিমের শ্বশুর বাদী হয়ে ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

অমানবিক নির্যাতনের চিত্র: মামলার পর তদন্তকারী কর্মকর্তার অনুরোধে র‍্যাব-১০ ছায়াতদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। তদন্তে র‍্যাব জানতে পারে, অপহরণের পর নিলয়কে একটি কক্ষে আটকে রেখে পায়ে শিকল পরিয়ে গ্রিলের সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দিনে তাকে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হতো। প্রতিরাতে তার ওপর চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। মারধরের সময় ভিকটিমের চিৎকার যেন বাইরে কেউ শুনতে না পায়, সেজন্য চক্রের সদস্যরা উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স বাজিয়ে রাখত।

র‍্যাবের সফল অভিযান: গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-১০, সিপিসি-৩, ফরিদপুর ক্যাম্পের একটি চৌকস আভিযানিক দল শনিবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানাধীন চরকমলাপুরের একটি আবাসিক ভবনে আকস্মিক অভিযান চালায়। সেখান থেকে পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় নিলয় শিকদারকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মূলহোতা মো. ফেরদৌস উর রহমান ও মহুয়া আহমেদকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই নিজ বসতবাড়ি থেকে চক্রের আরেক সদস্য এস এম মনোয়ারকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। অভিযানের সময় আসামিদের কাছ থেকে ২টি লোহার শিকল, চাবিসহ ২টি তালা, ২টি স্টিলের পাইপ, ১টি চাকু, ৬টি মোবাইল ফোন এবং মুক্তিপণের কিছু নগদ টাকা জব্দ করা হয়।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর র‍্যাবের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। র‍্যাব জানায়, অপহরণ ও মানব পাচারকারী দালাল চক্রের ফাঁদে পা না দিয়ে বিদেশে গমনেচ্ছুদের প্রকৃত মাধ্যম ও বৈধ উপায় অনুসরণ করা উচিত। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা র‍্যাবকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

বিদেশে চাকরির ফাঁদ দেখিয়ে অপহরণ : মুক্তিপণ দাবি

৯ দিন নির্যাতনের পর উদ্ধার শিকলবন্দি তরুণ, গ্রেপ্তার ৩

আপডেট সময় : ০৯:১৭:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর এক তরুণকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র। এরপর একটি আবাসিক ভবনের বদ্ধ কক্ষে পায়ে শিকল পরিয়ে টানা ৯ দিন আটকে রেখে চালানো হয় বর্বরোচিত নির্যাতন। নির্যাতনের আর্তনাদ আড়াল করতে বাজানো হতো উচ্চশব্দের সাউন্ডবক্স! অবশেষে ফরিদপুর শহরের চরকমলাপুর এলাকা থেকে শ্বাসরুদ্ধকর এক অভিযানে অপহৃত ওই তরুণকে জীবিত উদ্ধার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-১০)। এ সময় অপহরণ চক্রের মূলহোতাসহ তিন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে কেরানীগঞ্জে র‍্যাব-১০ এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।

উদ্ধার হওয়া তরুণের নাম মো. নিলয় শিকদার (৩৫)। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা থানার মহেষপাড়া এলাকার মৃত আবু খায়েরের ছেলে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার রঘুনন্দনপুর এলাকার মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ও চক্রের মূলহোতা মো. ফেরদৌস উর রহমান (৪২), গোয়ালচামট এলাকার মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে মহুয়া আহমেদ (৩২) এবং মুন্সীডাঙ্গী এলাকার মৃত আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে এস এম মনোয়ার (৩৬)।

যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ ও মুক্তিপণ আদায়: র‍্যাব-১০ এর প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরি দেওয়ার কথা বলে নিলয় শিকদারের কাছ থেকে কয়েক দফায় পাসপোর্টসহ ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। কিন্তু বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে গত ৬ আগস্ট তাকে অপহরণ করা হয়। পরে তার পরিবারের কাছে ফোন করে আরও ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তারা এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় নিলয়ের পরিবার বিভিন্ন বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে ৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পাঠায়। কিন্তু চক্রটি তাকে মুক্তি না দিয়ে উল্টো আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে বসে। নিরুপায় হয়ে ভিকটিমের শ্বশুর বাদী হয়ে ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

অমানবিক নির্যাতনের চিত্র: মামলার পর তদন্তকারী কর্মকর্তার অনুরোধে র‍্যাব-১০ ছায়াতদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। তদন্তে র‍্যাব জানতে পারে, অপহরণের পর নিলয়কে একটি কক্ষে আটকে রেখে পায়ে শিকল পরিয়ে গ্রিলের সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দিনে তাকে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হতো। প্রতিরাতে তার ওপর চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। মারধরের সময় ভিকটিমের চিৎকার যেন বাইরে কেউ শুনতে না পায়, সেজন্য চক্রের সদস্যরা উচ্চশব্দে সাউন্ডবক্স বাজিয়ে রাখত।

র‍্যাবের সফল অভিযান: গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাব-১০, সিপিসি-৩, ফরিদপুর ক্যাম্পের একটি চৌকস আভিযানিক দল শনিবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানাধীন চরকমলাপুরের একটি আবাসিক ভবনে আকস্মিক অভিযান চালায়। সেখান থেকে পায়ে শিকল পরানো অবস্থায় নিলয় শিকদারকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে মূলহোতা মো. ফেরদৌস উর রহমান ও মহুয়া আহমেদকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই নিজ বসতবাড়ি থেকে চক্রের আরেক সদস্য এস এম মনোয়ারকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। অভিযানের সময় আসামিদের কাছ থেকে ২টি লোহার শিকল, চাবিসহ ২টি তালা, ২টি স্টিলের পাইপ, ১টি চাকু, ৬টি মোবাইল ফোন এবং মুক্তিপণের কিছু নগদ টাকা জব্দ করা হয়।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর র‍্যাবের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। র‍্যাব জানায়, অপহরণ ও মানব পাচারকারী দালাল চক্রের ফাঁদে পা না দিয়ে বিদেশে গমনেচ্ছুদের প্রকৃত মাধ্যম ও বৈধ উপায় অনুসরণ করা উচিত। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা র‍্যাবকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।