মাকে ডেকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে থানায় নিখোঁজ ডায়রি : গোপন তথ্য জেনে ফেলায় কাঁচি দিয়ে পিটিয়ে বিষ খাইয়ে কৃষক ইউসুফ আলীকে হত্যা
“তথ্য ফাঁসে হত্যা”
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
- / 845
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুপথযাত্রী ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের চর অমরাপুর গ্রামের বাসিন্দা শেখ ইউসুফ আলী (৬০) । ছবি- অগ্নিপ্রহর
‘‘আমি চোহে দেখি না।’’ একথা বলেই হাফাচ্ছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী ইউসুফ আলী। প্রায় ষাট বছরের মতো তার বয়স। বলেন- “আমারে মারছে বশর মেম্বারের বাড়ির ওহন থ্যা। একটা ছ্যামরা চকের মইধ্যে থিক্যা আইস্যা কয়, আপনারে ছত্তারের ছাওয়াল শামীম ডাক পাড়ে।’’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে যায় ইউসুফ আলী ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করছি বিদেশ থিক্যা আইছে শামীম। দেখা কইর্যা আসি। গেছি পার হোনে দেহি কি, চাইর পাঁচটা।’
“ওগো অর্ডার দিছে মারার লি’গ্যা। কইলো তুই কইলি ক্যা?’ প্রশ্নের জবাবে বলে যান তিনি।
‘আমারে বাড়ি দিছে না, আমি পইর্যা গেছি, হাথে হাথে আমার মুখের মইধ্যে ওষুধ ঢাইল্যা দিছে।”
“আমি দৌড় দিয়ে সামনে আইস্যা পইর্যা গেছি ইটে বাইধ্যা, হাটের দিন। সাথে সাথে আমারে উঠেইয়্যা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে।”
“মারার সময় জুলহাস, আক্কাস, ইদ্রস, নুরু ইয়াসমিন, ইয়াসমিনের ভাই শামীম এরা ছিল। উরা চকের মধ্যে আছিলো।”
কথা শেষ না করতেই আবার বমি করতে করতে হাসপাতালের ফ্লোরে পাতা বেডে শুয়ে পরেন তিনি। গতকাল সোমবার ভোররাতের দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে গাজীরটেক ইউনিয়নের চর অমরাপুর গ্রামে ইউসুফ আলী (৬০) নামে এই কৃষককে শারীরিক নির্যাতন শেষে জোরপূর্বক বিষাক্ত কীটনাশক খাইয়ে হত্যার অভিযোগ করেছেন তার পরিবার। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।
গত শনিবার রাত ৮টার দিকে ইউসুফ আলী তার বাড়ির পাশে বশির মেম্বারের বাড়ির সামনে দাড়িয়েছিলেন।
পরিবারের স্বজনরা জানান, গত শনিবার সন্ধ্যায় একই এলাকার ছাত্তার শেখের ছেলে শামীম কৌশলে ইউসুফ আলীকে পদ্মার পাড়ে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে শামীমের বোন ইয়াসমিন সহ সজিব, ইউনুস, নুরু, আক্কাচ, ইদ্রিস ও জুলহাসরা তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়।
নিহতের স্ত্রীর ভাষ্যমতে, শনিবার রাত ৮টার দিকে শামীম তাঁর স্বামী ইউসুফ আলীকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে অন্য আসামিরা তাঁকে প্রথমে কাস্তে বা চাপাতি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে বোতলের মুখ খুলে জোরপূর্বক মুখের ভেতর বিষ ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর তাকে প্রথমে স্থানীয় বাজারের ডাক্তারের ঘরে এবং সেখান থেকে ফমেক হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়।
মৃত্যুর আগে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইউসুফ আলী সাংবাদিকদের তার উপর হামলার এই ঘটনার কথা বর্ণনা করে যান।
জানা যায়, একই গ্রামের আব্দুস সাত্তার শেখ নামে এক ব্যক্তির স্ত্রী আছমা বেগম (৫৫) নিখোঁজ হয়েছে বলে সম্প্রতি চরভদ্রাসন থানায় একটি জিডি করে তার পরিবার।
‘দৈনিক অগ্নিপ্রহর’ ওই নারীর নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি ফটোকার্ড ২৬ জুলাই মখল্টিমিডিয়া ফেসবুক পেজে প্রকাশ করে।
আছমা বেগমের নিখোঁজ হওয়ার নেপথ্যে এই ইউসুফ আলী হত্যার আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে বলে এপর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। কেননা, ওই নারীর নিখোঁজ রহস্যই জেনে ফেলেছিলেন দুিরদ্র কৃষক ইউসুফ আলী।তারপরেই তাকেও মেরে ফেলা হয়।
ইউসুফ আলীর দেওয়া তথ্য মতে, ছাত্তার শেখের ছেলে শামীম এবং তার বোন ইয়াসমিন এই নিখোঁজ ঘটনার সাথে জড়িত।
ইউসুফ আলীর জানান, কিছুদিন আগে শামীমের বোন ইয়াসমিন তাঁর ইউসুফ আলীর) কাছে এসে বলে, তার (ইয়াসমীনের) ফোনে টাকা নাই। বাড়িতে মাকে ফোন দিবেন। একথা বলে মোবাইল ফোনটি চায়। ইউসুফ আলী তাকে ফোনটি দিলে ইয়াসমিন ফোন করে মাকে বাড়ির বাইরে ডেকে আনে। আর বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসার পর আছমা বেগমকে পদ্মা নদীর ঘাটে নিয়ে তিন চারজন যুবকের হাতে তুলে দেন তারই ছেলে শামীম ও মেয়ে ইয়াসমীনেরা।
রহস্যের শুরু এখানেই। আছমা আক্তারের সন্তানেরা গোপনে তাদের মাকে ওই যুবকদের কাছে তুলে দিয়ে উল্টো চরভদ্রাসন থানায় এসে মা নিখোঁজ রয়েছেন মর্মে একটি জিডি করলে পুলিশ তদন্তে নামে।
তবে এরইমাঝে ইউসুফ আলী আছমাকে কারো হাতে তুলে দেওয়ার এই ঘটনা তার বাইকে বললে, ভাইয়ের মাধ্যমে আছমা বেগমের ছেলেমেয়েরা জেনে যায়। এর জের ধরেই সেদিন শনিবার সন্ধ্যায় ইউসুফ আলীকেও ডেকে নেয়।
নিহতের স্ত্রী বলেন, শনিবার রাত ৮টার দিকে শামীম তাঁর স্বামী ইউসুফ আলীকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে অন্য আসামিরা তাঁকে প্রথমে কাস্তে বা চাপাতি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে বোতলের মুখ খুলে জোরপূর্বক মুখের ভেতর বিষ ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর তাকে প্রথমে স্থানীয় বাজারের ডাক্তারের ঘরে এবং সেখান থেকে ফমেক হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়।
এ বিষয়ে চরভদ্রাসন থানার ওসি সফর আলীর ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফরিদপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমীর হোসেনের কাছে বিষয়টি নজানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েকজনকে আনা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।















