খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তেহরানে মানুষের ঢল
- আপডেট সময় : ০৯:৪১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
- / 30
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। আধুনিক ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী এই শীর্ষ নেতা ও শিয়া মারজার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দেশ। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আপামর জনতা, সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডার এবং সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সেখানে সমবেত হয়েছেন।
শনিবার সকাল থেকেই তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিশাল এই ধর্মীয় কমপ্লেক্স এবং এর চারপাশের সড়কগুলোতে কালো পোশাক পরিহিত শোকার্ত মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দেশটিতে ইতিমধ্যেই কয়েকদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভোর থেকেই গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের প্রবেশপথগুলোতে মানুষের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। হাতে সর্বোচ্চ নেতার ছবি, কোরআন শরীফ এবং জাতীয় পতাকা নিয়ে অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তেহরান জুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে দেশটির এলিট ফোর্স আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কমপ্লেক্সের ভেতরে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত এবং বিশেষ শোক গাঁথা পরিবেশন করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ নেতার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, বিচার বিভাগের প্রধান ও সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সদস্যরা।
আয়ানুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে গভীর ভূ-রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় প্রতিনিধিরা তেহরানে এসে পৌঁছাতে শুরু করেছেন।
লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, খামেনির প্রয়াণ ইসলামিক উম্মাহর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
রাশিয়ার ক্রেমলিন এবং চীনের বেইজিং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেহরানের এই কঠিন সময়ে গভীর সমবেদনা ও পাশে থাকার বার্তা পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো ইরানের এই ক্ষমতার রূপান্তরকালকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
১৯৮৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের জনক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন আলী খামেনি। তার দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছরের শাসনামলে ইরান বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তারের (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) মূল রূপকার ছিলেন তিনি। তার এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরানের আধুনিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা বা উত্তরাধিকারী কে হচ্ছেন?
ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা একক এবং অপরিসীম। সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড থেকে শুরু করে পরমাণু নীতি—সবই চূড়ান্ত হতো তার দফতর থেকে। ফলে, তার শূন্যস্থানে কে আসছেন তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ইরানের ৮৮ সদস্যের প্রবীণ শিয়া আলেমদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ (বিশেষজ্ঞ পরিষদ) নতুন নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করবে।
ইতিমধ্যেই দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ একটি জরুরি অধিবেশনে বসেছে বলে জানা গেছে। পরবর্তী নেতা হিসেবে খামেনির প্রভাবশালী পুত্র মোজতবা খামেনি কিংবা দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো ধর্মীয় ও বিচারিক ব্যক্তিত্বের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার মরদেহ শায়িত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।










