Bangladesh ০৯:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন সচিবালয়ের নতুন আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্বোধন আমাদের পথিকৃৎ সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুযোগ বাড়াতে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা অসহায় পরিবারের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের বাড়ির চাবি হস্তান্তর “মায়ের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যু হলে, সে মৃত্যুই পরম শ্রেয়” বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে ঐতিহাসিক ৪টি সিদ্ধান্ত এলো খাজা বড় চাচাজানের দিশারী বক্তব্য ফেসবুকে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ছড়িয়ে মানহানী : থানায় জিডি কনসার্টের উচ্চ শব্দে শিশুদের কষ্টের কথা জেনে ক্ষমা চাইলেন বিএনপি নেতা স্বপন সাংবাদিক আমির খসরু আর নেই শহর ফরিদপুর ও গণিকালয়ের ডেরা: কার কান্না কত ভারী?
হিমালয়ের নিচে রাশিয়ার পারমাণবিক বোমার বাঙ্কার ধ্বংস করতে এসে সক্ষম হলেও সুযোগ বুঝে কোভাচেক হেলিকপ্টারে চড়ে চম্পট দেয়। শত্রুর পিছু ধাওয়া করতে সিনহা এক নতুন মিশনের নেশায় জুরিখের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। পড়ুন, তারপর কি হল?

ডেড জোন – শেষ পর্ব

নাজিব মাহমুদ
  • আপডেট সময় : ০৪:৩৪:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 84

সাইরেন আর মেকানিক্যাল ভয়েসের কর্কশ ঘোষণার মাঝে পুরো বাঙ্কারটা কাঁপছে। সিলিং থেকে ছোটখাটো পাথরের টুকরো আর ধুলোবৃষ্টির মতো ঝরছে। প্রকাণ্ড লোহার বিমটা দরজার মুখে এমনভাবে আটকে আছে যে, হাতি দিয়ে টেনেও সরানো সম্ভব নয়।

সময়: ২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।

সিনহা কোভাচেককে একপাশে ছুড়ে ফেলল। লোকটা লিভার শটের ব্যথায় এখনও সোজা হতে পারছে না, কিন্তু তার চোখে এখন মৃত্যুর ভয়।

“আমরা সবাই মরব, সিনহা! এই বাঙ্কার আমাদের কবর হবে!” কোভাচেক হিসহিসিয়ে উঠল।

সিনহা উত্তর দিল না। তার চোখ বাঙ্কারের সার্ভার রুমের চারপাশটা স্ক্যান করছে। পালাবার পথ নেই—এটা সে বিশ্বাস করে না। প্রতিটি সোভিয়েত বাঙ্কারে একটা না একটা আপৎকালীন ইমারজেন্সি এক্সিট থাকেই। কিন্তু সেটা কোথায়?

ধসে পড়া অংশের দিকে চোখ পড়ল সিনহার। সিলিংয়ের একটা কোণা ভেঙে গিয়ে সেখান দিয়ে বড় একটা এয়ার ভেন্ট (বাতাস চলাচলের পথ) দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা অন্তত পনের ফুট উঁচুতে। আর তার নিচে শুধুই ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ।

সময়: ২ মিনিট।

সিনহার চোখ পড়ল সার্ভার রুমের চেইনগুলোর দিকে, যা সিলিং থেকে ঝুলছে। ওগুলো দিয়েই ভারী মেইনফ্রেম ইউনিটগুলো সরানো হতো। সে দৌড়ে গিয়ে একটা ঝুলন্ত চেইন টেনে দেখল। মরচে ধরলেও ওটা এখনও মজবুত।

“কোভাচেক! সোজা হয়ে দাড়াও, যদি বাঁচতে চাও!” সিনহা গর্জে উঠল।

কোভাচেক কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। সিনহা চেইনটা নিয়ে কোভাচেকের কোমর আর হাত একসাথে শক্ত করে বাঁধল। তারপর চেইনের অন্য মাথাটা সার্ভার রুমের একটা ভারী, অচল জেনারেটরের হুকের সাথে আটকে দিল।

“তুমি কী করছ?” কোভাচেক আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“তোমাকে লিফট বানাচ্ছি,” সিনহা শান্ত গলায় বলল।

সময়: ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড।

সিনহা জেনারেটরের ম্যানুয়াল লিভারটা ধরল। এটা চার দশকের পুরোনো, গ্রিজ জমে জং ধরে আছে। সিনহা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে লিভারটা টানল। তার হাতের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত চিপে সে লিভারটা ঘোরাতে শুরু করল।

ক্র্যা-আ-আ-ক!

নারকীয় শব্দ করে জেনারেটরের গিয়ার ঘুরতে শুরু করল। চেইনটা টানটান হলো। কোভাচেক চিত্কার করে উঠল যখন সে ধীরে ধীরে শূন্যে ঝুলতে শুরু করল। সিনহা লিভার ঘুরিয়ে কোভাচেককে ঠিক ভাঙা সিলিংয়ের এয়ার ভেন্টের মুখ বরাবর ওপরে তুলল।

কোভাচেক ভেন্টের মুখটা খামচে ধরল। সিনহা নিচ থেকে চেইনটা ছেড়ে দিল। কোভাচেক ভেন্টের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সময়: ৫০ সেকেন্ড।

এখন সিনহার পালা। কিন্তু তার ওপরে ওঠার মতো কোনো চেইন নেই। সে জেনারেটরের ওপর লাফিয়ে উঠল। সেখান থেকে দেওয়ালের ফাটল আর ভাঙা কংক্রিটের চাঁই ব্যবহার করে স্পাইডারম্যানের মতো বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। এক জায়গায় পা হড়কে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা মরচে ধরা রড ধরে নিজেকে সামলে নিল।

তার হাতের তালু ছিলে রক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই। সে ভেন্টের মুখে পৌঁছাল।

সময়: ৩০ সেকেন্ড।

বাঙ্কারের মেকানিক্যাল ভয়েস তখন ঘোষণা করছে: “১০… ৯… ৮…”

সিনহা এয়ার ভেন্টের মুখে পৌঁছা মাত্রই নিচে সার্ভার রুমে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ হলো। নাইট্রোজেনের ট্যাঙ্কগুলো ফেটে গিয়ে সাদা ধোঁয়ায় পুরো ঘর ভরে গেল। সিনহা এক ঝটকায় নিজেকে ভেন্টের ভেতরে টেনে নিল।

ভেন্টের ভেতরটা আরও সরু এবং পিচ্ছিল। সামনেই কোভাচেক হাঁসপাস করে এগোচ্ছে। সিনহা তার পেছনে। বাঙ্কারের রিঅ্যাক্টর কোর গলে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো কাঠামোটা এক ভয়াবহ কম্পনে কেঁপে উঠল। ভেন্টের ধাতব পাতগুলো দুমড়েমুচড়ে যেতে শুরু করল।

“৩… ২… ১…”

বাঙ্কারের গভীরে মূল বিস্ফোরণটা ঘটল। এক প্রচণ্ড শকওয়েভ এয়ার ভেন্টের ভেতর দিয়ে ছুটে এল। সিনহা বুঝল, আর এক মুহূর্ত দেরি হলে তারা ভেন্টের ভেতরেই পিষে মারা পড়বে।

সে কোভাচেকের পা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। “দ্রুত! ডাইভ দাও!”

ভেন্টের শেষ মাথায় একটা জং ধরা গ্রিল ছিল। সিনহা তার বুট দিয়ে ওটাতে লাথি মারল। গ্রিলটা ছিটকে বেরিয়ে গেল। আর তার সাথে সাথে সিনহা আর কোভাচেক আছড়ে পড়ল বাঙ্কারের বাইরের বরফে ঢাকা পাহাড়ি ঢালে।

ঠিক তাদের পেছনেই, বাঙ্কারের প্রবেশপথ দিয়ে আগুনের এক লেলিহান শিখা আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে এল। সাথে প্রচণ্ড শব্দ। পুরো পাহাড়টা যেন কেঁপে উঠল। ‘অবজেক্ট-৮৮’ তার চার দশকের রহস্য আর ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’ কোডের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে চিরতরে বরফের নিচে চাপা পড়ে গেল।

সিনহা বরফের ওপর উপুড় হয়ে পড়েছিল। তার ফুসফুস তখন হিমশীতল বাতাস বুক ভরে টেনে নিচ্ছে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, হাত ছিলে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। কিন্তু সে বেঁচে আছে। মিশন সফল।

সে মাথা তুলে দেখল, কোভাচেক কয়েক ফুট দূরে বরফের ওপর পড়ে আছে। লোকটা অজ্ঞান হয়ে গেছে, নাকি মরার ভান করছে, বোঝা যাচ্ছে না। সিনহা উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে পা বাড়াল। কোভাচেককে ইন্টারপোলের হাতে তুলে দেওয়া জরুরি।

হঠাৎ করেই পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে একটা পরিচিত যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে এল। সিনহা ওপরের দিকে তাকাল। একটা কালো রঙের বেল-৪১২ হেলিকপ্টার পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। হেলিকপ্টারের গায়ে কোনো দেশের পতাকা নেই, কিন্তু সিনহা ভালো করেই চেনে ওটা কাদের। ‘শ্যাডো সিন্ডিকেট’-এর ব্যাকআপ টিম।

হেলিকপ্টারের স্লাইডিং ডোর খুলে গেল। সেখান থেকে একটা দড়ির মই নিচে নেমে এল। আর সাথে সাথে বরফের ওপর পড়ে থাকা কোভাচেক অবিশ্বাস্য চপলতায় লাফিয়ে উঠল। লোকটা সত্যিই মরার ভান করছিল!

সে দৌড়ে গিয়ে মইটা চেপে ধরল। হেলিকপ্টার থেকে একজন গার্ড সিনহাকে লক্ষ্য করে মেশিনগান তাক করল। সিনহা সাথে সাথে বরফের একটা বড় পাথরের আড়ালে ডাইভ দিল।

র‍্যাট-ট্যাট-ট্যাট-ট্যাট!

গুলিগুলো সিনহার পাথরের গায়ে লেগে বরফ ছিটকে দিল। হেলিকপ্টারটা কোভাচেককে নিয়ে দ্রুত ওপরে উঠে গেল। সিনহা পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে দেখল, কোভাচেক মইয়ে ঝুলতে ঝুলতে সিনহার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত বিজয়ের হাসি হাসছে। ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’ সে পায়নি, কিন্তু সিনহার হাত থেকে সে বেঁচে ফিরছে—এটাই তার বড় সান্ত্বনা।

সিনহা পকেট থেকে সোহেলের দেওয়া সেই ছোট স্যাটেলাইট ফোনটা বের করল। ফোনটা বাঙ্কারের ভেতর জ্যাম হয়ে গিয়েছিল, এখন আবার সিগন্যাল দেখাচ্ছে। সে ডায়াল করল।

“সিনহা? তুমি ঠিক আছ?” সোহেলের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল।

“আমি ঠিক আছি। বাঙ্কার শেষ,” সিনহা শান্ত গলায় বলল, হেলিকপ্টারটা দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থেকে। “কিন্তু কোভাচেক পালিয়ে গেছে।”

সোহেল এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর বলল, “জেনারেল আহমেদ ফিরোজ অলরেডি জুরিখ এয়ারপোর্টে তোমার নামে টিকিট বুক করে রেখেছেন। কোভাচেকের পালিয়ে যাওয়াটা উনি বোধহয় আন্দাজ করেছিলেন। সিন্ডিকেটের পরবর্তী মুভ জুরিখে হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

সিনহা মৃদু হাসল। এই হাসিটা ক্লান্তির নয়, বরং এক নতুন শিকারের নেশায় মেতে ওঠা শিকারির। সে নিজের জ্যাকেটের বরফ ঝেড়ে ফেলে তিব্বতি মঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রাচীন লামারা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় আছেন।

“বলো জেনারেল আহমেদ ফিরোজকে, আমি আসছি। তবে জুরিখ যাওয়ার আগে তিব্বতি এক কাপ গরম চা খেয়ে নেব।”

হিমালয়ের চূড়ায় সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। বরফে ঢাকা উপত্যকায় সিনহা একাকী হেঁটে চলেছে—এক মিশন শেষ করে আরেক নতুন থ্রিলিং মিশনের দিকে।

(সমাপ্ত)

 

হিমালয়ের নিচে রাশিয়ার পারমাণবিক বোমার বাঙ্কার ধ্বংস করতে এসে সক্ষম হলেও সুযোগ বুঝে কোভাচেক হেলিকপ্টারে চড়ে চম্পট দেয়। শত্রুর পিছু ধাওয়া করতে সিনহা এক নতুন মিশনের নেশায় জুরিখের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। পড়ুন, তারপর কি হল?

ডেড জোন – শেষ পর্ব

আপডেট সময় : ০৪:৩৪:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

সাইরেন আর মেকানিক্যাল ভয়েসের কর্কশ ঘোষণার মাঝে পুরো বাঙ্কারটা কাঁপছে। সিলিং থেকে ছোটখাটো পাথরের টুকরো আর ধুলোবৃষ্টির মতো ঝরছে। প্রকাণ্ড লোহার বিমটা দরজার মুখে এমনভাবে আটকে আছে যে, হাতি দিয়ে টেনেও সরানো সম্ভব নয়।

সময়: ২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।

সিনহা কোভাচেককে একপাশে ছুড়ে ফেলল। লোকটা লিভার শটের ব্যথায় এখনও সোজা হতে পারছে না, কিন্তু তার চোখে এখন মৃত্যুর ভয়।

“আমরা সবাই মরব, সিনহা! এই বাঙ্কার আমাদের কবর হবে!” কোভাচেক হিসহিসিয়ে উঠল।

সিনহা উত্তর দিল না। তার চোখ বাঙ্কারের সার্ভার রুমের চারপাশটা স্ক্যান করছে। পালাবার পথ নেই—এটা সে বিশ্বাস করে না। প্রতিটি সোভিয়েত বাঙ্কারে একটা না একটা আপৎকালীন ইমারজেন্সি এক্সিট থাকেই। কিন্তু সেটা কোথায়?

ধসে পড়া অংশের দিকে চোখ পড়ল সিনহার। সিলিংয়ের একটা কোণা ভেঙে গিয়ে সেখান দিয়ে বড় একটা এয়ার ভেন্ট (বাতাস চলাচলের পথ) দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা অন্তত পনের ফুট উঁচুতে। আর তার নিচে শুধুই ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ।

সময়: ২ মিনিট।

সিনহার চোখ পড়ল সার্ভার রুমের চেইনগুলোর দিকে, যা সিলিং থেকে ঝুলছে। ওগুলো দিয়েই ভারী মেইনফ্রেম ইউনিটগুলো সরানো হতো। সে দৌড়ে গিয়ে একটা ঝুলন্ত চেইন টেনে দেখল। মরচে ধরলেও ওটা এখনও মজবুত।

“কোভাচেক! সোজা হয়ে দাড়াও, যদি বাঁচতে চাও!” সিনহা গর্জে উঠল।

কোভাচেক কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। সিনহা চেইনটা নিয়ে কোভাচেকের কোমর আর হাত একসাথে শক্ত করে বাঁধল। তারপর চেইনের অন্য মাথাটা সার্ভার রুমের একটা ভারী, অচল জেনারেটরের হুকের সাথে আটকে দিল।

“তুমি কী করছ?” কোভাচেক আতঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করল।

“তোমাকে লিফট বানাচ্ছি,” সিনহা শান্ত গলায় বলল।

সময়: ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড।

সিনহা জেনারেটরের ম্যানুয়াল লিভারটা ধরল। এটা চার দশকের পুরোনো, গ্রিজ জমে জং ধরে আছে। সিনহা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে লিভারটা টানল। তার হাতের পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত চিপে সে লিভারটা ঘোরাতে শুরু করল।

ক্র্যা-আ-আ-ক!

নারকীয় শব্দ করে জেনারেটরের গিয়ার ঘুরতে শুরু করল। চেইনটা টানটান হলো। কোভাচেক চিত্কার করে উঠল যখন সে ধীরে ধীরে শূন্যে ঝুলতে শুরু করল। সিনহা লিভার ঘুরিয়ে কোভাচেককে ঠিক ভাঙা সিলিংয়ের এয়ার ভেন্টের মুখ বরাবর ওপরে তুলল।

কোভাচেক ভেন্টের মুখটা খামচে ধরল। সিনহা নিচ থেকে চেইনটা ছেড়ে দিল। কোভাচেক ভেন্টের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সময়: ৫০ সেকেন্ড।

এখন সিনহার পালা। কিন্তু তার ওপরে ওঠার মতো কোনো চেইন নেই। সে জেনারেটরের ওপর লাফিয়ে উঠল। সেখান থেকে দেওয়ালের ফাটল আর ভাঙা কংক্রিটের চাঁই ব্যবহার করে স্পাইডারম্যানের মতো বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। এক জায়গায় পা হড়কে সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা মরচে ধরা রড ধরে নিজেকে সামলে নিল।

তার হাতের তালু ছিলে রক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই। সে ভেন্টের মুখে পৌঁছাল।

সময়: ৩০ সেকেন্ড।

বাঙ্কারের মেকানিক্যাল ভয়েস তখন ঘোষণা করছে: “১০… ৯… ৮…”

সিনহা এয়ার ভেন্টের মুখে পৌঁছা মাত্রই নিচে সার্ভার রুমে একটা ছোটখাটো বিস্ফোরণ হলো। নাইট্রোজেনের ট্যাঙ্কগুলো ফেটে গিয়ে সাদা ধোঁয়ায় পুরো ঘর ভরে গেল। সিনহা এক ঝটকায় নিজেকে ভেন্টের ভেতরে টেনে নিল।

ভেন্টের ভেতরটা আরও সরু এবং পিচ্ছিল। সামনেই কোভাচেক হাঁসপাস করে এগোচ্ছে। সিনহা তার পেছনে। বাঙ্কারের রিঅ্যাক্টর কোর গলে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো কাঠামোটা এক ভয়াবহ কম্পনে কেঁপে উঠল। ভেন্টের ধাতব পাতগুলো দুমড়েমুচড়ে যেতে শুরু করল।

“৩… ২… ১…”

বাঙ্কারের গভীরে মূল বিস্ফোরণটা ঘটল। এক প্রচণ্ড শকওয়েভ এয়ার ভেন্টের ভেতর দিয়ে ছুটে এল। সিনহা বুঝল, আর এক মুহূর্ত দেরি হলে তারা ভেন্টের ভেতরেই পিষে মারা পড়বে।

সে কোভাচেকের পা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল। “দ্রুত! ডাইভ দাও!”

ভেন্টের শেষ মাথায় একটা জং ধরা গ্রিল ছিল। সিনহা তার বুট দিয়ে ওটাতে লাথি মারল। গ্রিলটা ছিটকে বেরিয়ে গেল। আর তার সাথে সাথে সিনহা আর কোভাচেক আছড়ে পড়ল বাঙ্কারের বাইরের বরফে ঢাকা পাহাড়ি ঢালে।

ঠিক তাদের পেছনেই, বাঙ্কারের প্রবেশপথ দিয়ে আগুনের এক লেলিহান শিখা আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে এল। সাথে প্রচণ্ড শব্দ। পুরো পাহাড়টা যেন কেঁপে উঠল। ‘অবজেক্ট-৮৮’ তার চার দশকের রহস্য আর ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’ কোডের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে চিরতরে বরফের নিচে চাপা পড়ে গেল।

সিনহা বরফের ওপর উপুড় হয়ে পড়েছিল। তার ফুসফুস তখন হিমশীতল বাতাস বুক ভরে টেনে নিচ্ছে। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, হাত ছিলে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। কিন্তু সে বেঁচে আছে। মিশন সফল।

সে মাথা তুলে দেখল, কোভাচেক কয়েক ফুট দূরে বরফের ওপর পড়ে আছে। লোকটা অজ্ঞান হয়ে গেছে, নাকি মরার ভান করছে, বোঝা যাচ্ছে না। সিনহা উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে পা বাড়াল। কোভাচেককে ইন্টারপোলের হাতে তুলে দেওয়া জরুরি।

হঠাৎ করেই পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে একটা পরিচিত যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে এল। সিনহা ওপরের দিকে তাকাল। একটা কালো রঙের বেল-৪১২ হেলিকপ্টার পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে ওপরে উঠে আসছে। হেলিকপ্টারের গায়ে কোনো দেশের পতাকা নেই, কিন্তু সিনহা ভালো করেই চেনে ওটা কাদের। ‘শ্যাডো সিন্ডিকেট’-এর ব্যাকআপ টিম।

হেলিকপ্টারের স্লাইডিং ডোর খুলে গেল। সেখান থেকে একটা দড়ির মই নিচে নেমে এল। আর সাথে সাথে বরফের ওপর পড়ে থাকা কোভাচেক অবিশ্বাস্য চপলতায় লাফিয়ে উঠল। লোকটা সত্যিই মরার ভান করছিল!

সে দৌড়ে গিয়ে মইটা চেপে ধরল। হেলিকপ্টার থেকে একজন গার্ড সিনহাকে লক্ষ্য করে মেশিনগান তাক করল। সিনহা সাথে সাথে বরফের একটা বড় পাথরের আড়ালে ডাইভ দিল।

র‍্যাট-ট্যাট-ট্যাট-ট্যাট!

গুলিগুলো সিনহার পাথরের গায়ে লেগে বরফ ছিটকে দিল। হেলিকপ্টারটা কোভাচেককে নিয়ে দ্রুত ওপরে উঠে গেল। সিনহা পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে দেখল, কোভাচেক মইয়ে ঝুলতে ঝুলতে সিনহার দিকে তাকিয়ে এক বিকৃত বিজয়ের হাসি হাসছে। ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’ সে পায়নি, কিন্তু সিনহার হাত থেকে সে বেঁচে ফিরছে—এটাই তার বড় সান্ত্বনা।

সিনহা পকেট থেকে সোহেলের দেওয়া সেই ছোট স্যাটেলাইট ফোনটা বের করল। ফোনটা বাঙ্কারের ভেতর জ্যাম হয়ে গিয়েছিল, এখন আবার সিগন্যাল দেখাচ্ছে। সে ডায়াল করল।

“সিনহা? তুমি ঠিক আছ?” সোহেলের উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল।

“আমি ঠিক আছি। বাঙ্কার শেষ,” সিনহা শান্ত গলায় বলল, হেলিকপ্টারটা দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থেকে। “কিন্তু কোভাচেক পালিয়ে গেছে।”

সোহেল এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর বলল, “জেনারেল আহমেদ ফিরোজ অলরেডি জুরিখ এয়ারপোর্টে তোমার নামে টিকিট বুক করে রেখেছেন। কোভাচেকের পালিয়ে যাওয়াটা উনি বোধহয় আন্দাজ করেছিলেন। সিন্ডিকেটের পরবর্তী মুভ জুরিখে হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

সিনহা মৃদু হাসল। এই হাসিটা ক্লান্তির নয়, বরং এক নতুন শিকারের নেশায় মেতে ওঠা শিকারির। সে নিজের জ্যাকেটের বরফ ঝেড়ে ফেলে তিব্বতি মঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রাচীন লামারা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় আছেন।

“বলো জেনারেল আহমেদ ফিরোজকে, আমি আসছি। তবে জুরিখ যাওয়ার আগে তিব্বতি এক কাপ গরম চা খেয়ে নেব।”

হিমালয়ের চূড়ায় সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। বরফে ঢাকা উপত্যকায় সিনহা একাকী হেঁটে চলেছে—এক মিশন শেষ করে আরেক নতুন থ্রিলিং মিশনের দিকে।

(সমাপ্ত)