প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসস্তুপে তারা একটি নতুন সূত্রের সন্ধান পেল। মেজর সিনহা বুঝলেন, কলমের শেষ শব্দটি ছিল একটি ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক! হিমালয়ের লুকানো পারমাণবিক ঘাঁটির আরও কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি বিপজ্জনক পথ খোলা আছে।
ডেড জোন – ৩য় পর্ব
- আপডেট সময় : ১২:৪০:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
- / 99
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সাথে সাথে চারপাশের দেয়াল আর মেঝেতে পাথরের বদলে জায়গা করে নিল পুরু ঢালাই লোহা আর রিইনফোর্সড কংক্রিট। বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম, আর ঠান্ডা এতটাই তীব্র যে প্রতিবার নিঃশ্বাস ছাড়ার সাথে সাথে সাদা ধোঁয়া জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। টর্চের আলোয় মেজর সিনহা দেখল, চার দশক আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা একটা বিশাল সাইনেজ—‘অবজেক্ট-৮৮’।
বাঙ্কারের করিডোরটা গোলকধাঁধার মতো। সিনহা সাবধানে পা ফেলছিল। সে ভালো করেই জানে, শীতল যুদ্ধের সময়কার এই গোপন ঘাঁটিগুলো শুধু সুরক্ষিতই ছিল না, ছিল মারাত্মক সব অটোমেটিক ডিফেন্স সিস্টেমে ঠাসা।
হঠাৎ করেই সিনহার বুটের তলায় একটা হালকা স্প্রিংয়ের মতো মেকানিক্যাল সাউন্ড হলো—ক্লিক!
চটজলদি নিজের রিফ্লেক্সকে কাজে লাগাল সে। এক মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে সে নিজেকে পেছনের দিকে ছুড়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের দুই পাশের দেয়াল থেকে প্রচণ্ড শব্দে স্প্রিং-লোডেড স্টিলের বিশালাকার কতগুলো ধারালো ব্লেড ঝাড়ুর মতো আড়াআড়িভাবে বেরিয়ে এল। সিনহা যদি এক সেকেন্ডের জন্য দ্বিধা করত, তবে তার শরীরটা এতক্ষণে তিন টুকরো হয়ে যেত।
ব্লেডগুলো আবার দেয়ালে ফিরে যাওয়ার পর সে উঠে দাঁড়াল। কপাল থেকে এক ফোঁটা ঘাম নামার আগেই তা জমে বরফ হয়ে গেছে। সামনেই করিডোরের শেষ মাথায় ভারী প্রেশারাইজড ডোরটা লকড, কিন্তু তার ডিজিটাল প্যানেলটা লেজার কাটার দিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়েছে। কোভাচেক অলরেডি ভেতরে।
সিনহা সেই গলানো ফাঁক গলে ভেতরে প্রবেশ করল। এটা বাঙ্কারের মূল সার্ভার রুম। চারপাশে বড় বড় প্রসেসর ইউনিট আর সিলিং থেকে ঝুলছে মরচে পড়া চেইন। আর রুমের ঠিক মাঝখানে, একটি কাঁচের চেম্বারের ভেতর সবুজ আলোতে গ্লো করছে সেই কাঙ্ক্ষিত স্যুটকেস সাইজের সেন্ট্রাল কন্টেইনার—যার ভেতরে রয়েছে ‘ব্ল্যাক প্রমিথিউস’-এর মূল হার্ড-ড্রাইভ।
চেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে কোভাচেক তার পোর্টেবল হ্যাকিং ট্যাবটা মেইনফ্রেমের সাথে জুড়ে দিয়েছে। স্ক্রিনে ডেটা ডাউনলোডের পারসেন্টেজ উঠছে: ৭২%… ৭৩%…
“হাত ওপরে তোলো, কোভাচেক। খেলা শেষ,” সিনহার শান্ত অথচ বজ্রকঠিন গলা গমগম করে উঠল ঘরের স্পিকারে।
কোভাচেক চমকে ঘুরে তাকাল। তার মুখে এক পলকের জন্য বিস্ময় ফুটল, কিন্তু পরক্ষণেই তা এক পৈশাচিক হাসিতে রূপ নিল। “সিনহা! তুমি আসলেই একটা ভূত! কিন্তু তুমি একটা ভুল করেছ। এখানে কোনো ফায়ারআর্মস নেই, আর আমার হাতে সময় আছে।”
কোভাচেক ট্যাবের একটা সুইচে চাপ দিল। সাথে সাথে পুরো সার্ভার রুমে সাইরেন বেজে উঠল। সিলিংয়ের স্বয়ংক্রিয় নজেলগুলো থেকে তীব্র বেগে নির্গত হতে শুরু করল কার্বন ডাই-অক্সাইড আর তরল নাইট্রোজেনের কুয়াশা। চোখের পলকে ঘরের তাপমাত্রা মাইনাস চল্লিশে নেমে গেল, আর অক্সিজেনের স্তর শূন্যের কোঠায় নামতে শুরু করল।
“দেখা যাক কতক্ষণ দম আটকে রাখতে পারো, সিনহাজি!” কোভাচেক ক্রুর হেসে তার জ্যাকেটের ভেতর থেকে বের করল একটা ফোল্ডিং ট্যাকটিক্যাল ব্যাটন (লোহার লাঠি)।
সিনহা জানত, তার ফুসফুসে মাত্র আড়াই মিনিটের বাতাস আছে। এর মধ্যে কোভাচেককে শেষ করতে হবে, প্লাস ডেটা চুরি আটকাতে হবে।
কোভাচেক চিত্কার করে ব্যাটনের এক মারাত্মক সুইং চালাল সিনহার মাথা লক্ষ্য করে। সিনহা মাথা নিচু করে ডাক (Duck) করল এবং কোভাচেকের পা লক্ষ্য করে এক সুইপিং কিক মারল। কিন্তু কোভাচেকও ওস্তাদ ফাইটার, সে লাফিয়ে উঠে সিনহার বুকে বুটের লাথি বসিয়ে দিল।
ছিটকে গিয়ে একটা প্রসেসর র্যাকের ওপর পড়ল সিনহা। পিঠের ব্যথার তোয়াক্কা না করে সে সাথে সাথে রোল করে সরে গেল, কারণ কোভাচেকের ব্যাটনটা ঠিক সেই জায়গায় এসে আঘাত হেনেছে। লোহার আঘাতে প্রসেসরের স্পার্ক ছিটকে উঠল।
নাইট্রোজেনের কুয়াশায় চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। সিনহার ফুসফুস তখন বাতাসের জন্য হাহাকার করছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সে বুঝতে পারল, ডিফেন্সিভ খেলে লাভ নেই। তাকে অল-আউট অ্যাটাকে যেতে হবে।
কোভাচেক যখন তার ব্যাটনটা আবার ওপরে তুলল, সিনহা সরে না গিয়ে বুক চিতিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। ব্যাটনের আঘাত তার বাম কাঁধে এসে পড়ল, তীব্র যন্ত্রণায় সিনহার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু সে তার ডান হাত দিয়ে কোভাচেকের জ্যাকেটের কলার চেপে ধরল।
নিজের পুরো শরীরের ভর ব্যবহার করে সিনহাকে কুংফু স্টাইলের এক জোড়া ‘হাঁটু-আঘাত’ (Knee strike) করল কোভাচেকের লিভারে। পর পর দুটো নিখুঁত লিভার-শট!
কোভাচেকের চোখ জোড়া প্রায় কোটর থেকে বেরিয়ে এল। সে হাত থেকে ব্যাটনটা ফেলে দিয়ে পেটে হাত দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। লিভার শটের ধাক্কায় তার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম সাময়িকভাবে লক হয়ে গেছে।
সিনহা সময় নষ্ট না করে মেইনফ্রেমের দিকে তাকাল। ডাউনলোডের স্ক্রিনে ভাসছে: ৯৯%…
দম ফুরিয়ে আসার ঠিক শেষ মুহূর্তে সিনহা তার পকেটের থার্মাল টর্চটা বের করে সেটার ম্যাক্সিমাম হিট মোড অন করল। তারপর সরাসরি কোভাচেকের হ্যাকিং ট্যাবের মাদারবোর্ডের ওপর ওটা চেপে ধরল। তীব্র তাপে প্লাস্টিক আর চিপ গলে একাকার হয়ে শর্ট সার্কিট হলো।
স্ক্রিনটা দপ করে নিভে গিয়ে লাল অক্ষরে ভেসে উঠল: DOWNLOAD FAILED. SYSTEM PURGED.
কোভাচেক মেঝেতে শুয়ে গোঙাতে গোঙাতে দেখল তার কোটি ডলারের মিশন চোখের সামনে ছাই হয়ে গেল। কিন্তু তখনই বাঙ্কারের মূল কাউন্টডাউন স্ক্রিনে লাল আলো জ্বলে উঠল। মেকানিক্যাল ভয়েসে ঘোষণা হলো: “থার্মাল মেল্টডাউন প্রোটোকল অ্যাক্টিভেটেড। ইভাকুয়েশন টাইম: ৩ মিনিট।”
বাঙ্কারের রিঅ্যাক্টর কোর গলতে শুরু করেছে। পুরো সিলিং কাঁপছে, আর ওপর থেকে কংক্রিটের চাঁই খসে পড়ছে। সিনহা কোভাচেকের শার্টের কলার ধরে টেনে তুলল। মরতে হলে ওকে আইনের হাতে মরতে হবে, এই নরকে নয়।
কিন্তু বাঙ্কারের দরজাটার দিকে তাকাতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। ওপর থেকে ধসে পড়া একটা বিশাল লোহার বিম ঠিক দরজার মুখে আড়াআড়িভাবে পড়ে পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে!
[অসমাপ্ত]



















