ডেড জোন হিমালয় হিমালয়ের নিচে লুকানো রাশিয়ার এক পারমাণবিক বোমা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ, যা ধ্বংস করে দিতে পারে গোটা বিশ্বকে। সেই মারাত্মক অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার গোপন মিশনে নেমেছে বাংলাদেশের অকুতোভয় গোয়েন্দা মেজর সিনহা। রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর অন্ধকারের এই মরণপণ লড়াইয়ে সে কি পারবে বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে?
ডেড জোন-২
- আপডেট সময় : ০৩:০৫:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- / 109
[পূর্ববর্তী অংশের পর]
হলরুমের ঘুটঘুটে অন্ধকারে মুহূর্তের মধ্যে নরক গুলজার হয়ে উঠল। হঠাৎ আলো চলে যাওয়ায় কোভাচেকের দলবল প্যানিক করে এলোপাথাড়ি চিৎকার শুরু করেছে।
“হোল্ড ইওর ফায়ার! গুলি করিস না মূর্খের দল, দেয়ালে লাগলে ছাদ ধসে পড়বে!” কোভাচেকের কর্কশ গলা অন্ধকারের মধ্যেও গমগম করে উঠল।
কিন্তু রানার জন্য এই অন্ধকারটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। তার চোখ দুটো ততক্ষণে নাইন-ভিশন গ্লাসের মতো অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। সে ভালো করেই জানে, এই ভাড়াটে খুনিরা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হলেও, চোখের ওপর ভরসা হারানো মাত্রই এরা একেকটা চলন্ত টার্গেট।
ঠিক ডান পাশে একটা থার্মাল টর্চের আলো জ্বলে ওঠার আগেই রানা সেখানে পৌঁছাল। লাইটার জ্বেলে ওঠা লোকটার কবজি ধরে এক হ্যাঁচকা টানে তাকে সামনে এনে নিজের কনুই দিয়ে তার বুকে মারল এক প্রচণ্ড ‘এলবো স্ট্রাইক’। ফুসফুসের হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই লোকটা অবশ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। রানা তার হাত থেকে থার্মাল টর্চটা কেড়ে নিয়ে না জ্বেলেই পকেটে পুরল।
“ওদিকে! সাউন্ড এসেছে!” বাঁ দিক থেকে আরেকজন গর্জে উঠতেই রানা নিচু হয়ে স্লাইডিং ট্যাকল করল।
অন্ধকারে পা হড়কে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। রানা মেঝেতে থাকা অবস্থাতেই তার মাথাটা ধরে পাথুরে মেঝের সাথে ঠুকে দিল। নিখুঁত, শান্ত এবং নিঃশব্দ। দুজন শেষ।
“কোথায় ও? সাবধানে, দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাড়াও!” কোভাচেক চেঁচাচ্ছে, কিন্তু ততক্ষণে সে নিজে পেছনের দিকে সরতে শুরু করেছে। লড়াকু হিসেবে সে ধূর্ত, বুঝতে পেরেছে এই অন্ধকার কোনো সাধারণ লোডশেডিং নয়—এটা একটা ফাঁদ।
বাকি তিনজন গার্ড অন্ধকারের মধ্যে গোল হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই রানা মাঝখানে স্প্রিংয়ের মতো আছড়ে পড়ল। প্রথমজনের থুতনি লক্ষ্য করে নিচ থেকে এক আপারকাট। চোয়াল ভাঙার মট শব্দ হলের গুমট বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো। দ্বিতীয়জন রানাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করতেই রানা তার দুই হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে লোকটার ঘাড়ের ‘ক্যারোটিড সাইনাস’ প্রেসার পয়েন্টে চাপ দিল। মাত্র তিন সেকেন্ডে অক্সিজেনের অভাব ঘটে লোকটার চোখ উল্টে গেল।
তৃতীয় গার্ডটি ভয় পেয়ে নিয়ম ভেঙে তার সাব-মেশিনগান তাক করে ট্রিগার চাপতে চাইল।
ক্লিক!
ট্রিগার চাপার আগেই রানার ডান হাত সাপটে ধরেছে রাইফেলের ব্যারেল। এক ঝটকায় অস্ত্রটা কেড়ে নিয়ে সেটার বাট দিয়ে লোকটার কপালে সজোরে আঘাত করল রানা। ছিটকে গিয়ে মঠের একটা কাঠের পিলারে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল সে।
পুরো হলরুমে এখন শুধু লামাদের মৃদু ভয়ার্ত নিশ্বাস আর রানার শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ। মাত্র দেড় মিনিটে পাঁচজন সশস্ত্র গার্ডকে সে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
“চমৎকার, রানা!” অন্ধকারের এক কোণ থেকে হাততালির শব্দ ভেসে এল। ক্রিস্টোফ কোভাচেক।
সে ততক্ষণে হলরুমের পেছনের একটি ছোট দরজার মুখে দাঁড়িয়ে গেছে। তার এক হাতে একটি নাইন-এমএম পিস্তল, যা সে অন্ধকারের মধ্যেই আন্দাজে রানার দিকে তাক করে রেখেছে, আর অন্য হাতে একটি জ্বলন্ত ফ্লেয়ার (মশাল)।
“আমি জানতাম রাহাত খান তার সেরা কুকুরটাকেই পাঠাবে। কিন্তু তুমি বড্ড দেরি করে ফেলেছ,” কোভাচেক ক্রুর হাসল। “বাঙ্কারের কোড আমার চাই-ই। আর এই মঠ? এটা তোমার কবরস্থান!”
বলেই কোভাচেক হাতের জ্বলন্ত ফ্লেয়ারটি হলের মাঝখানে থাকা প্রাচীন তিব্বতি কাপড়ের তৈরি বিশাল থাংকা (পর্দা)-র ওপর ছুড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে শুকনো কাপড়ে আগুন ধরে লেলিহান শিখা সিলিংয়ের দিকে উঠে গেল। একই সাথে রানাকে লক্ষ্য করে দুটো গুলি ছুড়ল সে।
ঠাস! ঠাস!
রানা আগেই ডাইভ দিয়েছিল মেঝেতে। গুলি দুটো তার মাথার ওপর দিয়ে দেয়ালে গিয়ে বিধল। যখন সে সোজা হয়ে দাঁড়াল, ততক্ষণে কোভাচেক পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে ওপাশ থেকে ভারী লোহার হুড়কো আটকে দিয়েছে।
আগুন দ্রুত ছড়াচ্ছে। রানা লড়াকু সেনাদের চেয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেল বন্দি লামাদের দিকে। নিজের পকেট থেকে একটা ছোট সুইস নাইফ বের করে প্রধান লামার হাতের বাঁধন এক টানে কেটে দিল।
“লাফসান (ধন্যবাদ), মাই সান,” প্রধান লামা শান্ত গলায় বললেন, “তুমি ভেতরে যাও। আমাদের চিন্তা করো না, পেছনের গোপন পথ দিয়ে আমরা বের হতে পারব। কিন্তু ওই শয়তান যেন বাঙ্কারের নিচে পৌঁছাতে না পারে।”
লামা হলের এক কোণে থাকা বুদ্ধ মূর্তির নিচের একটা গোপন লিভারে চাপ দিলেন। মূর্তির পেছনের দেয়ালটা এক ইঞ্চি সরে গিয়ে একটা অন্ধকার সিঁড়ি উন্মোচন করল, যা সরাসরি মাটির নিচে নেমে গেছে।
“আপনারা সাবধানে বের হন,” রানা বলল।
সে পকেট থেকে থার্মাল টর্চটা বের করে অন করল। তীব্র নীল আলোয় নিচের সিঁড়িটা ভেসে উঠল। সিঁড়ির ধাপে ধাপে জমে আছে বরফ, আর বাতাস থেকে আসছে চার দশকের পুরোনো গ্রিজ, লোহা আর রাসায়নিকের গন্ধ।
টাইম কাউন্টডাউন তখন ঘড়িতে টিকটিক করছে—৪৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট।
রানা আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। টর্চের আলো ফোকাস করে সে অন্ধকারের অতল গহ্বরে, সোভিয়েত বাঙ্কার ‘অবজেক্ট-৮৮’-এর প্রবেশদ্বারের দিকে তীব্র গতিতে নেমে গেল।
[অসমাপ্ত]



















