আমলা না রাজনীতিবিদ দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত ফেসবুক
ফরিদপুর পৌরসভার পেজ থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লেন প্রধান নির্বাহী
- আপডেট সময় : ১০:৩২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
- / 493
সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টাপাল্টি তোপ, ফেসবুকের অফিশিয়াল পেজ অপব্যবহারের অভিযোগ এবং এক আমলার খোলা চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এখন তুমুল আলোচনায় ফরিদপুর পৌরসভা। ঘটনাচক্রে একদিকে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা, অন্যদিকে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। প্রশাসনিক পদমর্যাদা ও সরকারি পেজের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলে নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয়েছে চরম তোলপাড়।
ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন জুয়েল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেন। ভাটি লক্ষ্মীপুর এলাকার ২০০টি জলমগ্ন পরিবারের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। জুয়েলের দাবি, বিগত সরকারের ‘সকল সুবিধাভোগী’ এক কর্মকর্তা বর্তমানে ফরিদপুর পৌরসভায় কর্মরত থেকে নাগরিক সেবা ব্যাহত করছেন এবং জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।
বিএনপি নেতার এই পোস্টের পরপরই সরগরম হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। ‘ফরিদপুর পৌরসভা কার্যালয়, ফরিদপুর’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে একটি দীর্ঘ পোস্ট জারি করা হয়, যেখানে জুয়েলকে ‘স্বঘোষিত মেয়র প্রার্থী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। একইসাথে ওই পোস্টে সিইও হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকীর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটি মন্তব্য হুবহু তুলে ধরা হয়।
বিএনপি নেতাকে সরাসরি ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে কর্মকর্তা জকী লেখেন:
“আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কোনো অনুমোদিত কমিটির পদে ছিলাম—তাহলে কালই চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে যাব। আর না পারলে মিথ্যাচারের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন? সাহস থাকলে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন!”
১০ বছর আগে সিলেট আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে নিজের বিরোধের উদাহরণ টেনে এই বিসিএস কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক সুবিধার বিরুদ্ধে গেলেই তাকে ‘ট্যাগ’ দেওয়া হয়েছে।
অফিশিয়াল পেজের ব্যবহার নিয়ে উঠছে প্রশ্ন:
একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক আক্রমণমূলক পোস্ট প্রকাশ করা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকেরা।
দৈনিক অগ্নিপ্রহরের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পৌরসভার পেজটিতে এখনও বিগত ফ্যাসিবাদের আমলের বিভিন্ন প্রচারণামূলক পোস্ট ঝুলছে। এ নিয়ে একটি ফটোকার্ড সংবাদ প্রকাশের পর, এক নাগরিকের শেয়ার করা পোস্টের বিপরীতে আবারও পৌর পেজ থেকে ফেসবুক ব্যবহারে সরকারের দেওয়া নীতিমালা লঙ্ঘণ করে ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক পোস্ট করা হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল আইডি কীভাবে এভাবে ব্যবহৃত হতে পারে—তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
বিতর্কের রেশ ধরে এই বিসিএস ক্যাডারের অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে বিভিন্ন মাধ্যম। জানা গেছে, ২০২৩ সালে ধামরাইয়ের ইউএনও থাকাকালে তিনি ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ ইউএনও হন। এরপর ২০২৪ সালের আলোচিত ‘ডামি নির্বাচনের’ আগে তাকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বদলি করা হয়। গাজীপুর-১ আসনে সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিজয় নিশ্চিত করার পর তৎকালীন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হোসাইন জকী গণমাধ্যমে ভোটকে “সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ” বলে দাবি করেছিলেন। ওই নির্বাচনের পরপরই গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি তাকে পদোন্নতি দিয়ে টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট করা হয়।
প্রায় চার মাস আগে ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী। একের পর এক বিতর্কিত পোস্ট, অতীতের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং অফিশিয়াল পেজ থেকে রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে সরাসরি বাকযুদ্ধে জড়ানোর ঘটনাটি এখন ফরিদপুর ছাড়িয়ে গোটা দেশের প্রশাসনিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


















