Bangladesh ১২:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ>>
Logo জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি ওয়াহিদুজ্জামান Logo ফরিদপুর হলিডে মার্কেটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ইস্যুতে তোলপাড় Logo ফরিদপুরে যাত্রীবাহী বাস থেকে চাঁদা উঠানোর সময় আটক ৪ Logo লোভের গ্রাসে ধ্বংস হলো ফরিদপুর ‘টাউন থিয়েটার’ Logo ৩ বছরের শিশুর পেটে চাবির ছড়া : এন্ডোস্কোপির পর পেলো রক্ষা Logo বৃষ্টিভেজা দুপুরে ফমেক হাসপাতালে তিক্ত সাংবাদিকতা Logo মোংলা ও তিস্তায় চীনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’: কী ভাবছে দিল্লি? Logo মেক্সিকোর রোমাঞ্চকর প্রতিরোধ ভেঙে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড Logo ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে Logo বাস-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই যুবক নিহত
১৯১৫ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে. সি. দে একটি টিনের ছাপড়া ঘরের এই ‘টাউন থিয়েটার’ উদ্বোধন করেন

লোভের গ্রাসে ধ্বংস হলো ফরিদপুর ‘টাউন থিয়েটার’

বিশেষ প্রতিবেদন
  • আপডেট সময় : ০৯:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • / 484

ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘টাউন থিয়েটার’ গড়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক চর্চার এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে, যা পরবর্তী সময়ে রূপ নিয়েছিল সিনেমা হলে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে স্থাপিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি কীভাবে কতিপয় মানুষের স্বার্থচারিতা আর লোভের কারণে শুধু তার ঐতিহ্যই হারালো না, একইসাথে শহর ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রবাহকেও থামিয়ে দিল—তার এক মর্মস্পর্শী ও তথ্যভিত্তিক বিবরণ তুলে ধরেছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক মাজেদুর রহমান

পাঠকদের সুবিধার্থে মাজেদুর রহমানের লেখার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটিতে সেইসব তথ্য তুলে ধরা হলো।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, টাউন থিয়েটারের পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯১৩ সালে। ঝিলটুলির বাসিন্দা দীগম্বর বাবুর ড্রইং রুমে নিয়মিত বসতো আড্ডা ও তাসের আসর। তেমনই এক বৈঠকে একটি নাট্য সংগঠন ও স্থায়ী নাট্যমঞ্চ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার পর  জমিদার তারক চন্দ্র গুহ (উকিল), যোগেশ বাবু, কামিনী বাবু (উকিল), উমেশ মজুমদার (উকিল), বাবু কেদারনাথ, ডাঃ শ্রীধর বাবু, ডাঃ কৃষ্ণ প্রসাদ রায়, দেবেন্দ্র মোহন দত্ত ও হরলাল মজুমদারকে নিয়ে একটি নাট্য সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এই উদ্যোগে জজ কোর্টের সেরেস্তাদার রেবুতী মোহন সেনেরও অবদান ছিলো। আর নেপথ্যে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন বাবু অম্বিকা চরণ মজুমদার ও রায় বাহাদুর তারকানাথ চক্রবর্তী।

তাদের অনুরোধে বাইশ রশির জমিদার দক্ষিণারঞ্জন রায় চৌধুরী ও রমেশ চৌধুরী থিয়েটারের জন্য শহরের কেন্দ্রস্থলের ওই জমি দান করেন। মঞ্চ তৈরির জন্য জীতেশ চক্রবর্তী নামের এক সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে শিলিগুড়ি থেকে কাঠের গুঁড়ি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে আসেন। থিয়েটারের পূর্ব পাশের ছোট খাল থেকে মাটি কেটে জায়গাটি উঁচু করার কাজে শ্রমিকদের সাথে কাঁধ মেলান সংগঠনের সদস্যরাও।

১৯১৫ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে. সি. দে একটি টিনের ছাপড়া ঘরের এই ‘টাউন থিয়েটার’ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরের বছর, অর্থাৎ ১৯১৬ সালে উমেশ মজুমদার রচিত পৌরাণিক নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার মাধ্যমে এখানে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু হয়। পরে ১৯৩২ সালে কৃতিপুরুষ সুরেন্দ্রনাথ বাবুর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘সুরেন্দ্র মেমোরিয়াল হল’।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে কলকাতার প্রখ্যাত ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’ ও ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরের কর্ণধার সুকুমার বাবু, ফরিদপুর শহরের কিরন দী ও তার বড় ভাই প্রফুল্ল মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে টাউন থিয়েটার হলটি লিজ নেন। এরপর এখানে শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন। বিভিন্ন সময়ে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘মায়াহল’, ‘অরোরা’ এবং সর্বশেষে ‘ছায়াবাণী’ নামে পরিচিতি পায়।

সেই আমলে সিনেমা দেখতে পুরো শহর ভেঙে পড়তো। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র “মুখ ও মুখোশ” ঢাকার সঙ্গে একই সময়ে এই হলে প্রদর্শন করা হয়েছিল। কলকাতার ‘অরোরার’ কর্ণধার সুকুমার বাবু যুক্ত থাকায় কলকাতার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র ফরিদপুরের এই হলেই সরাসরি প্রদর্শিত হতো।

ঈদের সময় টানা ২/৩ সপ্তাহ হল ‘হাউসফুল’ থাকতো। হলের সামনে তিল ধারণের জায়গা থাকতো না এবং টিকিট কালোবাজারিতে (ব্ল্যাকে) বিক্রি হতো, যেখানে কমলাপুরের সজু ও ফজলা নামের ব্যক্তিরা জড়িত ছিল। হলের ভেতরে ম্যানেজার ভুলু বাবু (যিনি ফরিদপুর জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়ন টিমের ম্যানেজার ছিলেন), টিকিট বিক্রেতা মালেক ও ছোটকা দা, এবং চিপ অপারেটর সত্যদা (বরদা) ও নিখিলের উপস্থিতি হলটিকে জমজমাট রাখতো। হলের সামনে খন্দকার রেস্টুরেন্টে বিকেলে শহরের মানুষের মেলা বসতো। রিকশায় মাইক বেঁধে পুরো শহরে নতুন সিনেমার প্রচার করার স্মৃতি আজও মনে দাগ কেটে আছে।

স্বাধীনতার পরও কিরন লাহিড়ী সেক্রেটারি থাকাকালীন সময় পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে টাউন থিয়েটারের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। তবে তার মৃত্যুর পর নতুন কমিটিগুলো সেই গৌরবময় ধারা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।

মাজেদুর রহমানের তথ্যমতে, হলের পতনের মূল অধ্যায়টি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। তৎকালীন টাউন থিয়েটারের নতুন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আর্থিক প্রলোভনে পড়েন। নিজেদের স্বার্থ ও লোভের বশবর্তী হয়ে তারা পুরনো সিনেমা হলের লিজটি বাতিল করে নতুন এক পক্ষের কাছে বেশি টাকায় হলটি লিজ দেন।

এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আদালত (কোর্ট) পর্যন্ত গড়ায়। আইনি লড়াই এবং নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত হল টিকিয়ে রাখার মতো সুবিধাজনক জায়গা না পেয়ে কিরন দী ও তার ভাতিজা অরুন হলের সমস্ত প্রজেক্টর ও মূল্যবান মেশিনপত্র অন্যত্র বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।

এদিকে নতুন লিজগ্রহীতাদের চলচ্চিত্র ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায়, তাদের দেওয়া নতুন নাম “সঙ্গীতা” হলটি মাত্র দুই বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর “আনার কলি” নাম দিয়ে অন্য একজন ব্যবসায়ী হলটি চালু করার চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে সেটিও কিছুদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই চিরতরে নিভে যায় ফরিদপুর শহরের একমাত্র এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্তবিনোদনের কেন্দ্রটি।

সিনেমা হলটি বন্ধ হওয়ার পর কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী টাউন ক্লাবের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ এবং নীরব-নিথর। ইতিহাস সবকিছু ধারণ করলেও সেই সোনালী দিনগুলোকে আর ফিরিয়ে দিতে পারে না। আজ যেখানে কোলাহল আর সংস্কৃতির চর্চা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কেবলই নীরবতা। ফেলে আসা অতীত আর সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতি বুকে নিয়ে আজ শুধুই এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী টাউন থিয়েটার প্রাঙ্গণ।

 

শেয়ার করুন

১৯১৫ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে. সি. দে একটি টিনের ছাপড়া ঘরের এই ‘টাউন থিয়েটার’ উদ্বোধন করেন

লোভের গ্রাসে ধ্বংস হলো ফরিদপুর ‘টাউন থিয়েটার’

আপডেট সময় : ০৯:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘টাউন থিয়েটার’ গড়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক চর্চার এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে, যা পরবর্তী সময়ে রূপ নিয়েছিল সিনেমা হলে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে স্থাপিত এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি কীভাবে কতিপয় মানুষের স্বার্থচারিতা আর লোভের কারণে শুধু তার ঐতিহ্যই হারালো না, একইসাথে শহর ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রবাহকেও থামিয়ে দিল—তার এক মর্মস্পর্শী ও তথ্যভিত্তিক বিবরণ তুলে ধরেছেন নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক মাজেদুর রহমান

পাঠকদের সুবিধার্থে মাজেদুর রহমানের লেখার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটিতে সেইসব তথ্য তুলে ধরা হলো।

মাজেদুর রহমান লিখেছেন, টাউন থিয়েটারের পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯১৩ সালে। ঝিলটুলির বাসিন্দা দীগম্বর বাবুর ড্রইং রুমে নিয়মিত বসতো আড্ডা ও তাসের আসর। তেমনই এক বৈঠকে একটি নাট্য সংগঠন ও স্থায়ী নাট্যমঞ্চ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার পর  জমিদার তারক চন্দ্র গুহ (উকিল), যোগেশ বাবু, কামিনী বাবু (উকিল), উমেশ মজুমদার (উকিল), বাবু কেদারনাথ, ডাঃ শ্রীধর বাবু, ডাঃ কৃষ্ণ প্রসাদ রায়, দেবেন্দ্র মোহন দত্ত ও হরলাল মজুমদারকে নিয়ে একটি নাট্য সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এই উদ্যোগে জজ কোর্টের সেরেস্তাদার রেবুতী মোহন সেনেরও অবদান ছিলো। আর নেপথ্যে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন বাবু অম্বিকা চরণ মজুমদার ও রায় বাহাদুর তারকানাথ চক্রবর্তী।

তাদের অনুরোধে বাইশ রশির জমিদার দক্ষিণারঞ্জন রায় চৌধুরী ও রমেশ চৌধুরী থিয়েটারের জন্য শহরের কেন্দ্রস্থলের ওই জমি দান করেন। মঞ্চ তৈরির জন্য জীতেশ চক্রবর্তী নামের এক সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে শিলিগুড়ি থেকে কাঠের গুঁড়ি নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে আসেন। থিয়েটারের পূর্ব পাশের ছোট খাল থেকে মাটি কেটে জায়গাটি উঁচু করার কাজে শ্রমিকদের সাথে কাঁধ মেলান সংগঠনের সদস্যরাও।

১৯১৫ সালে তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে. সি. দে একটি টিনের ছাপড়া ঘরের এই ‘টাউন থিয়েটার’ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরের বছর, অর্থাৎ ১৯১৬ সালে উমেশ মজুমদার রচিত পৌরাণিক নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার মাধ্যমে এখানে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু হয়। পরে ১৯৩২ সালে কৃতিপুরুষ সুরেন্দ্রনাথ বাবুর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘সুরেন্দ্র মেমোরিয়াল হল’।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে কলকাতার প্রখ্যাত ‘অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন’ ও ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরের কর্ণধার সুকুমার বাবু, ফরিদপুর শহরের কিরন দী ও তার বড় ভাই প্রফুল্ল মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে টাউন থিয়েটার হলটি লিজ নেন। এরপর এখানে শুরু হয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন। বিভিন্ন সময়ে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘মায়াহল’, ‘অরোরা’ এবং সর্বশেষে ‘ছায়াবাণী’ নামে পরিচিতি পায়।

সেই আমলে সিনেমা দেখতে পুরো শহর ভেঙে পড়তো। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র “মুখ ও মুখোশ” ঢাকার সঙ্গে একই সময়ে এই হলে প্রদর্শন করা হয়েছিল। কলকাতার ‘অরোরার’ কর্ণধার সুকুমার বাবু যুক্ত থাকায় কলকাতার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র ফরিদপুরের এই হলেই সরাসরি প্রদর্শিত হতো।

ঈদের সময় টানা ২/৩ সপ্তাহ হল ‘হাউসফুল’ থাকতো। হলের সামনে তিল ধারণের জায়গা থাকতো না এবং টিকিট কালোবাজারিতে (ব্ল্যাকে) বিক্রি হতো, যেখানে কমলাপুরের সজু ও ফজলা নামের ব্যক্তিরা জড়িত ছিল। হলের ভেতরে ম্যানেজার ভুলু বাবু (যিনি ফরিদপুর জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়ন টিমের ম্যানেজার ছিলেন), টিকিট বিক্রেতা মালেক ও ছোটকা দা, এবং চিপ অপারেটর সত্যদা (বরদা) ও নিখিলের উপস্থিতি হলটিকে জমজমাট রাখতো। হলের সামনে খন্দকার রেস্টুরেন্টে বিকেলে শহরের মানুষের মেলা বসতো। রিকশায় মাইক বেঁধে পুরো শহরে নতুন সিনেমার প্রচার করার স্মৃতি আজও মনে দাগ কেটে আছে।

স্বাধীনতার পরও কিরন লাহিড়ী সেক্রেটারি থাকাকালীন সময় পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সাথে টাউন থিয়েটারের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। তবে তার মৃত্যুর পর নতুন কমিটিগুলো সেই গৌরবময় ধারা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।

মাজেদুর রহমানের তথ্যমতে, হলের পতনের মূল অধ্যায়টি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। তৎকালীন টাউন থিয়েটারের নতুন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আর্থিক প্রলোভনে পড়েন। নিজেদের স্বার্থ ও লোভের বশবর্তী হয়ে তারা পুরনো সিনেমা হলের লিজটি বাতিল করে নতুন এক পক্ষের কাছে বেশি টাকায় হলটি লিজ দেন।

এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আদালত (কোর্ট) পর্যন্ত গড়ায়। আইনি লড়াই এবং নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত হল টিকিয়ে রাখার মতো সুবিধাজনক জায়গা না পেয়ে কিরন দী ও তার ভাতিজা অরুন হলের সমস্ত প্রজেক্টর ও মূল্যবান মেশিনপত্র অন্যত্র বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।

এদিকে নতুন লিজগ্রহীতাদের চলচ্চিত্র ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায়, তাদের দেওয়া নতুন নাম “সঙ্গীতা” হলটি মাত্র দুই বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর “আনার কলি” নাম দিয়ে অন্য একজন ব্যবসায়ী হলটি চালু করার চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে সেটিও কিছুদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই চিরতরে নিভে যায় ফরিদপুর শহরের একমাত্র এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় চিত্তবিনোদনের কেন্দ্রটি।

সিনেমা হলটি বন্ধ হওয়ার পর কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী টাউন ক্লাবের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ এবং নীরব-নিথর। ইতিহাস সবকিছু ধারণ করলেও সেই সোনালী দিনগুলোকে আর ফিরিয়ে দিতে পারে না। আজ যেখানে কোলাহল আর সংস্কৃতির চর্চা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কেবলই নীরবতা। ফেলে আসা অতীত আর সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতি বুকে নিয়ে আজ শুধুই এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী টাউন থিয়েটার প্রাঙ্গণ।