সাড়ে ৩১ লাখ টাকার কেলেঙ্কারীর রহস্য কি?
- আপডেট সময় : ১১:৫৫:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬
- / 172
স্ত্রীর অসুস্থ্যতাজনিত কারণে দিনকাল ভালো যাচ্ছেনা ফরিদপুরের বাসস ও দেশটিভির প্রতিনিধি আনিচুর রহমানের। এরইমাঝে গত শনিবার ২৩মে তাকে মারধরের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এনিয়ে খবর বেরুচ্ছে- পেশাগত কাজে দুর্নীতির সাথে আপোস না করায় তার উপর এ হামলা করা হয়েছে। এরপর এ ঘটনা জড়িয়ে একে একে বেরোতে থাকে রীতিমতো পিলে চমকানোর মতো আরো নানান খবর।
সর্বশেষ সাংবাদিক পরিচয়ে ফরিদপুরে ভূমি অধিগ্রহণে জড়িত সার্ভেয়ারের থেকে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিস্ফোরক তথ্য দাবি করা হয়েছে রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে।
জানা গেছে, অসুস্থ্য স্ত্রীকে দেখতে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে যাওয়ার পর সেখানে সাংবাদিক আনিচুর রহমানের উপর হামলা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২০মে বিকাল ৩ টা ৪৫ মিনিটে সাব্বির সহ আরো দু’একজন যুবক তাকে কিলঘুষি মেরে আহত করেন। পরবর্তীতে এ ঘটনার ওই সিসিটিভি ফুটেজের ক্লিপ তিনদিন পরে ২৩ মে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বিভিন্ন মিডিয়ায় সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনার খবর হতে থাকে।
তার আগে তিনদিন ঘটনাটি জানাই ছিলোনা ফরিদপুরের সাংবাদিকদের! অথচ দু’দিন আগেই তিনি এনিয়ে থানায় অভিযোগও করেছেন দেখা গেলো।
জানা গেছে, সরকারি সংবাদ সংস্থা ও বেসরকারি একটিটিভি চ্যানেলের প্রতিনিধির উপর হামলার এমনএকটি ঘটনার পরেও বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানেননি তখন। তবে ২৩মে ভিডিও প্রকাশের পর জানা যায়, সাংবাদিক আনিচুর রহমানের ওই হামলার ঘটনায় পরেরদিন কোতয়ালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরও করেছেন। এতো বড় ঘটনা অথচ কোন সংবাদ হলোনা মিডিয়ায়! যেখানে তিনি অভিযোগ করেছেন, ভাঙ্গায় একটি সড়কের কাজের সংবাদ সংগ্রহের জের ধরে তার উপর এই হামলা ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
আনিচুর রহমান থানায় অভিযোগ করেছেন, সংবাদ সংগ্রহের সময় ঠিকাদার সাইদুর রহমান জেভির লোকজন তাকে তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয় এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে। তবে ওই ঘটনায় তিনি কোন সংবাদ প্রকাশ করেছেন কিনা, সেটিও জানা যায়নি এখন পর্যন্ত।
জানা গেছে, ঘটনার দুদিন পরে আনিচরের উপর হামলার ওই ভিডিওটি স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে পাঠান তার এক সহকর্মী। এরপর সেটি ফেসবুকে ছড়ানো হয়। তখন থেকেই বিষয়টি জানাজানি হয় এবং পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকের উপর হামলার খবরটি প্রকাশ পায়।
সিসিটিভি ফুটেজের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কথাবার্তার একপর্যায়ে আনিচুর রহমানকে কিলঘুষি মারতে থাকেন পাশে দাড়ানো আরেক যুবক। আর তার সাথে সেখানে আশেপাশে উপস্থিত আরো দু’ একজনও তার উপর চড়াও হয়ে কিলঘুষি মারতে থাকে।
পরে আনিচুরকে মারধরের ওই ঘটনার খোঁজখবর নিতে যেয়ে জানা যায়, কোতয়ালী থানায় দু’দিন আগে তিনি এ ঘটনায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এদিকে, সাংবাদিকের উপর হামলার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত সাব্বির আনিচুরের বিরুদ্ধে বিপুল অংকের চাঁদাবাজির বিষ্ফোরক তথ্য ফাঁস করে পাল্টা একটি অভিযোগপত্র প্রেরণ করেন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বরাবর। সেখানে তিনি সরকারি দপ্তর থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগটি করেন।
সাব্বির লিখিত অভিযোগে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে ভূমি অধিগ্রহণ এলএ শাখার একজন সার্ভেয়ার থেকে আনিচুর রহমান তার নাম ভাঙিয়ে দুই দফায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকার চাঁদা নেন। তার অভিযোগ, সেই দুর্নীতির বিষয়টি জানতে চাইতে গেলে এই নতুন ঘটনার অবতারণা হয়। আর এখন সেই পুরনো ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভিন্ন এক ঘটনার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে।
সাব্বির জানান, গত ২০২৪ সালের শেষের দিকে তার বন্ধু তানভীর আনান নির্জনের মাধ্যমে পরিচয় হয় তার মামা আনিচুরের সাথে। যখন নির্জন ও তিনি সহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছেলেরা বিভিন্ন অপরাধ অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। সেই কাজ করতে গিয়ে আনিচুর রহমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন নির্জন। পরবর্তীতে আনিচুর রহমানের তথ্যের ভিত্তিতে ওই সার্ভেয়ারের কাছে ভূমি অধিগ্রহণের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় জানতে চান তারা। তার অভিযোগ, ওই সময়ে তাদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাদের কথা বলে ওই সার্ভেয়ারের নিকট থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে দুই দফায় ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করেন আনিচুর। আর সেই টাকা নেওয়ার ঘটনায় তারা আমার নাম ব্যবহার করায় বিভিন্ন মহল থেকে ফোন করে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এতে তাকে পারিবারিক ও সামাজিক হেনেস্তার নিদারন শিকার হতে হয়। ওই ঘটনার পর একপর্যায়ে পরিবারের চাপে তিনি ফরিদপুর ছেড়ে অপমানে আমি ঢাকায় যেয়ে একটি চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে ঈদের ছুটিতে ফরিদপুর এসে তিনি আনিচুরকে ডেকে অভিযোগের সত্যতা জানতে চান।
সাব্বির বলেন, অনেক সমস্যায় রয়েছেন জানিয়ে আনিচুর প্রথমে তার সাথে দেখা করতে চাননি। পরবর্তীতে তিনি আমাকে ফোন দিয়ে হাসপাতালে যেতে বলেন। তার কথামতো সেখানে গেলে ওই সার্ভেয়ারের নিকট থেকে আমার নাম ব্যবহার করে সাড়ে ৩১ লাখ টাকার চাঁদাবাজির বিষয় নিয়ে জানতে চাই। তখন তিনি আমাকে বিভিন্নজনের ভয় দেখান। এই শহরের বিভিন্ন লোকের নাম বলে তাদের ভয় দেখান। এই ঘটনা জের ধরে একপর্যায়ে তার সাথে আমার হাতাহাতি হয়।
কিন্তু আনিচুর রহমান এ ঘটনার পর থানায় যেই অভিযোগ করেছেন, তার সাথে ওই ঘটনার বিন্দুমাত্র যোগসাজশ নেই। সাব্বির বলেন, এলজিইডির যেই কাজের সংবাদ সংগ্রহের বাধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেই ঘনটার সাথে তার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। মামলায় যাকে প্রধান আসামি যাকে করা হয়েছে তাকে আমি চিনিও না। বিষয়টি প্রকৃত তদন্ত করে আসল সত্য উদঘাটনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সাব্বির বলেন, আনিচুর রহমানের সাথে আমার যে বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্ব, সেটি একান্তই পূর্বের একটি ঘটনা নিয়ে। এখানে সাংবাদিকতার কোন বিষয় নয়। বরং সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি করা হয়েছে। সে আমার বন্ধুর মামা বলে আমি তাকে মামা বলে ডাকতাম। প্রশাসনের কাছে দাবি করছি- সত্যতা যাচাই করে আসল ঘটনা উদঘাটন করা হোক। অপরাধী যেই হোক, তার শাস্তি নিশ্চিত করার অনুরোধ করেন তিনি।
এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এহেন অভিযোগ গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।














