কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের একটি ‘ইশতেহার’ তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে!
টেকনোফ্যাসিবাদ: প্যালান্টিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুদ্ধতত্ত্ব নিয়ে তীব্র সমালোচনা
- আপডেট সময় : ১০:৪৩:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
- / 124
আমেরিকান কোম্পানি প্যালান্টিয়ার টেকনোলজিসের সিইও আলেকজান্ডার কার্পের বই ‘দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক-হার্ড পাওয়ার, সফট বিলিফ, অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ দ্য ওয়েস্ট’ সমালোচকদের মাঝে তীব্র প্রতিবাদের সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, এই বইটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দ্বারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের একটি ‘ইশতেহার’তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে সোমবার এ খবর প্রকাশ করা হয়।
বইটির লেখক হলেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার কার্প এবং এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান নিকোলাস ডব্লিউ জামিস্কা।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ কোম্পানি প্যালান্টিয়ার, যার মার্কিন সেনাবাহিনীসহ একাধিক মার্কিন সরকারি সংস্থার সাথে বহু-বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাথে অংশীদারিত্ব রয়েছে, সম্প্রতি এক্স-এ একটি পোস্টে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার কার্প এবং এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্সের প্রধান নিকোলাস ডব্লিউ জামিস্কার লেখা ‘দ্য টেকনোলজিক্যাল রিপাবলিক’-এর মূল যুক্তিগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছে।
বইটিতে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একটি ‘নৈতিক ঋণ’ রয়েছে, কারণ বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখার জন্য দেশটির অত্যাধুনিক সফটওয়্যার-চালিত হার্ড পাওয়ার প্রয়োজন। বইটির সারসংক্ষেপে প্যালান্টিয়ার লিখেছে, “যদি একজন মার্কিন মেরিন সেনা আরও ভালো রাইফেল চায়, তবে আমাদের তা তৈরি করা উচিত; এবং সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।”
বইটিতে আরও দাবি করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতের প্রতিরোধ ব্যবস্থা পারমাণবিক শক্তির ওপর নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা এআই অস্ত্র তৈরি করতে দ্বিধা করবে না। সংস্থাটি তার সারসংক্ষেপে বলেছে, “প্রশ্নটি এআই অস্ত্র তৈরি হবে কি না তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তা তৈরি করবে।”
এই উপস্থাপনাটি শিক্ষাবিদ ও ভাষ্যকারদের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বেলজিয়ামের প্রযুক্তি-দার্শনিক মার্ক কোকেলবার্গ এই বার্তাটিকে টেকনোফ্যাসিবাদের একটি উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গ্রিক অর্থনীতিবিদ এবং প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস বলেছেন, “প্যালান্টিয়ার কার্যকরভাবে পারমাণবিক মহাপ্রলয়ের সাথে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত হুমকি যুক্ত করার ইচ্ছার ইঙ্গিত দিয়েছে।” “এআই-চালিত ঘাতক রোবট আসছে”, এক্স-এ লিখেছেন ভারুফাকিস।
‘সভ্যতার ধ্বংসাত্মক সংঘাতের অভিযান’
প্যালান্টিয়ারের বইটির সারাংশে আরও যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা অংশীদারদের “একটি শূন্য ও অন্তঃসারশূন্য বহুত্ববাদ” প্রতিরোধ করা উচিত। এটি এই দাবি করে যে- “কিছু সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছে; অন্যগুলো অকার্যকর রয়ে গেছে।”
উদ্যোক্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভাষ্যকার আর্নড বার্ট্রান্ড বলেছেন, এই বার্তাটি একটি বিপজ্জনক মতাদর্শগত এজেন্ডাপ্রকাশ করে। এক্স-এ একটি পোস্টে বার্ট্রান্ড বলেন, “তারা কার্যকরভাবে বলছে- ‘‘আমাদের হাতিয়ারগুলো তোমাদের পররাষ্ট্রনীতির সেবা করার জন্য নয়। এগুলো আমাদের নীতি বলবৎ করার জন্য।”
বারট্রান্ড বইটির এই যুক্তির দিকেও ইঙ্গিত করেছেন যে, জার্মানি ও জাপানের যুদ্ধোত্তর নিষ্ক্রিয়তাকে অবশ্যই দূর করতে হবে। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট এই দুটি রাষ্ট্রের ঐতিহাসিকভাবে সংযত প্রতিরক্ষা নীতির প্রতি একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত। তিনি বলেন, “দুই মহাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ওলটপালট করে দেওয়ার পেছনে প্যালান্টিয়ারের উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক এবং আদর্শগত উভয়ই।”
বারট্রান্ড বলেন, “পুনরায় সামরিকায়িত জার্মানি ও জাপান প্রতিরক্ষা সফটওয়্যারের বিশাল নতুন বাজার।’’
কিন্তু আরও উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো, “ইশতেহারের বাকি অংশে বর্ণিত আদর্শগত প্রকল্পের সাথে খাপ খায় – একটি সভ্যতার লড়াইয়ের জন্য একটি সংহত পশ্চিমা জোট প্রয়োজন, এবং এই ধরনের লড়াইয়ে শান্তিবাদী সদস্যরা একটি বোঝা।”
মার্কিন সরকারের সাথে সম্পর্কের পাশাপাশি, প্যালান্টিয়ার ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীসহ অসংখ্য বিদেশী সরকারি সংস্থার সাথে চুক্তি করে, যাদেরকে এটি গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা যুদ্ধের সময় প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। চলতি বছরের শুরুতে আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে, প্যালান্টিয়ার ইউকে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দেশটির বৃহত্তর জোটের প্রতি তাদের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বারট্রান্ড বলেছেন, “যেসব সরকার এখনও তাদের গোয়েন্দা, নিরাপত্তা বা জনসেবা পরিকাঠামোতে প্যালান্টিয়ার সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, তাদের এখনই তা উপড়ে ফেলা শুরু করা উচিত! পাছে তারা সেই ভ্রান্ত ও চরম ধ্বংসাত্মক ‘সভ্যতার সংঘাতের’ অভিযানে জড়িয়ে পড়ে, যেটিতে প্যালান্টিয়ার এখন প্রকাশ্যে নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছে।”















