চাঁদে পা রাখা কি এবার আরও কঠিন?
আর্টেমিস থ্রি: চাঁদের বুকে মানুষের প্রত্যাবর্তনের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা
- আপডেট সময় : ১০:১৪:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / 114
PHOTO DATE: May 16, 2024. LOCATION: San Francisco Volcanic Fields. SUBJECT: JETT5 EVA 3. PHOTOGRAPHER: Josh Valcarcel. ছবি- সংগৃহিত
চাঁদের বুকে আবারও মানুষের পা রাখার ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। তবে নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস থ্রি’ মিশনে যারা চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটবেন, তাদের জন্য এই যাত্রা এক চরম শারীরিক ও মানসিক অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে। নাসার গবেষক ও চিকিৎসকদের প্যানেল সতর্ক করে জানিয়েছে, অ্যাপোলো মিশনের চেয়েও অনেক বেশি প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ‘আর্টেমিস থ্রি’ মিশনের নভোচারীদের। প্রযুক্তিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আরস টেকনিকা’ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায়।
নাসা আশা করছে ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ‘আর্টেমিস থ্রি’ মিশনের যাত্রা শুরু করতে পারবেন তারা। তবে স্পেসএক্স এবং ব্লু অরিজিনের ল্যান্ডার প্রস্তুতি এবং স্পেসস্যুটের আধুনিকায়নের ওপর এই সময়সূচী নির্ভর করছে। ১৯৭২ সালের পর এটিই হতে যাচ্ছে চাঁদে মানুষের প্রথম অবতরণ।
নাসার নেতৃত্বে পরিচালিত একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মহাকাশ অভিযানের মূল লক্ষ্য মানুষকে পুনরায় চাঁদে ফিরিয়ে নেওয়া। বিশেষ করে, এই মিশনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই মিশনের পর্যায়গুলোর মধ্যে রয়েছে- আর্টিমিস ওয়ান, টু ও থ্রি এই তিনটি ধাপ।
এর মধ্যে ‘আর্টিমিস ওয়ান’ ছিল একটি মানুষবিহীন পরীক্ষামূলক ফ্লাইট। এর মূল কাজ ছিল বিশালাকার এসএলএস রকেট এবং ওরিয়ন মহাকাশযানটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা পরীক্ষা করা। ২০২২ সালের শেষদিকে এটি চাঁদের চারপাশ ঘুরে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
এখন আর্টেমিস টু উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে নাসা। এর মাধ্যমে, তারা গভীর মহাকাশে মহাকাশচারীদের টিকিয়ে রাখার জন্য ওরিয়নের ক্ষমতা পরীক্ষা করবে। নাসার মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার এবং ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন, চাঁদের দূরবর্তী অংশে ১০ দিনের মিশনে ওরিয়নে চড়বেন। এই উড্ডয়নটি মহাকাশযানের সিস্টেমগুলিকে আর্টেমিস থ্রি’-এর জন্য যোগ্যতা অর্জন করবে, যা নাসা নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে ফিরিয়ে আনার মিশন হিসেবে পরিকল্পনা করছে।
মঙ্গলবার ভোরবেলায় নাসা তাদের বিশাল আর্টেমিস টূ রকেটের জ্বালানি পরীক্ষা শেষ করতে বাধ্য হয়, যার ফলে আর্টিমিস টু অভিযান কমপক্ষে এক মাস পিছিয়ে গেল।
বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর গর্তগুলোতে কোটি কোটি টন জলীয় বরফ জমা আছে যা কখনো সূর্যের আলো পায় না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই বরফ গলিয়ে জীবনধারণের উপাদান পানি পাওয়া যাবে এবং সেই পানিকে রাসায়নিকভাবে বিশ্লেষণ করে শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব হবে। আবার সেই পানি থেকে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন আলাদা করে তা দিয়ে রকেটের জ্বালানি তৈরি করার কথাও তারা বলছেন। এর মাধ্যমে চাঁদ হবে নভোচারীদের জন্য একটি ‘মহাকাশের পেট্রোল পাম্প’, যেখান থেকে মঙ্গলে যাওয়ার পথে রকেটগুলো জ্বালানি ভরে নিতে পারবে।
চাঁদের কক্ষপথে এই মহাকাশ স্টেশন বা ‘লুনার গেটওয়ে তৈরি করা গেলে এটি হবে চাঁদের চারপাশে আবর্তনকারী একটি ছোট মহাকাশ স্টেশন। মানুষের তৈরি এই প্রথম স্থায়ী স্টেশনটি অনেকটা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মতো হবে। তবে আকারে কিছুটা ছোট এবং এটি পৃথিবী থেকে অনেক বেশি দূরে অবস্থিত হবে। পৃথিবী থেকে আসা নভোচারীরা প্রথমে এই স্টেশনে পৌঁছাবেন এবং সেখান থেকে ল্যান্ডারে করে চাঁদের পৃষ্ঠে নামবেন। এটি অনেকটা মঙ্গলে যাওয়ার জন্য একটি ‘ট্রান্সফার স্টেশন’ হিসেবেও কাজ করবে। যা মহাকাশ বিজ্ঞানে এক বিশাল বিপ্লব আনতে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদ থেকে মঙ্গলের যাত্রা অনেক বেশি সুবিধাজনক, তার প্রধান কারণ হলো মহাকর্ষ। পৃথিবী থেকে একটি রকেট উৎক্ষেপণ করার সময় পৃথিবীর প্রবল মাধ্যাকর্ষণ বল কাটিয়ে উঠতে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি খরচ করতে হয়।
নাসার সাবেক নভোচারী এবং অভিজ্ঞ মাইক্রোবায়োলজিস্ট কেট রুবিন্স এই মিশনকে একটি ‘চরম শারীরিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সম্প্রতি ন্যাশনাল একাডেমি আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনায় তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা অনেকটা ভেসে বেড়ানোর সুযোগ পান, যা বেশ আরামদায়ক। কিন্তু চাঁদের বুকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আর্টেমিস থ্রি মিশনের জন্য হিউস্টনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাক্সিওম স্পেস’ ২২ কোটি ৮০ লাখ ডলার চুক্তিতে বিশেষ স্পেসস্যুট তৈরি করছে। যদিও এগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি, তবে ওজনে এগুলো অ্যাপোলো যুগের স্যুটগুলোর চেয়েও ভারী হবে। চাঁদের এক-ষষ্ঠাংশ অভিকর্ষ বলের মধ্যে এই ভারী স্যুট পরে দীর্ঘ সময় কাজ করা শরীরের হাড় ও পেশির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।
অভিজ্ঞ নভোচারী কেট রুবিন্স মনে করেন, এই মিশনে সফল হতে হলে নভোচারীদের কেবল দক্ষ হলেই চলবে না, তাদের শারীরিক সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার চূড়ান্ত পরিচয় দিতে হবে। চাঁদে নভোচারীদের প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা ভারী স্পেসস্যুট পরে কাজ করতে হবে। এটি অনেকটা একটি ম্যারাথন শেষ করার পরপরই আরেকটা ম্যারাথন দৌড়ানোর মতো ক্লান্তিকর। ৫০ বছর আগে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীদের তুলনায় এবার কাজ ও শারীরিক পরিশ্রমের চাপ থাকবে বহুগুণ বেশি।
ভবিষ্যতে চাঁদে মানববসতি গড়ে তোলার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বলা হচ্ছে এই মিশনে, সেখানে রয়েছে মানুষের জন্য বাড়িঘর তৈরির পরিকল্পনা। চাঁদের বুকের ধুলোবালি দিয়ে থ্রি-ডি প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা হবে এই ঘর। তবে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ পৃথিবীর চৌম্বকমণ্ডলের সুরক্ষার বাইরে হওয়ায় মহাজাগতিক বিকিরণের ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া চাঁদের সূক্ষ্ম ধুলো বা রেগোলিথ অত্যন্ত ক্ষতিকর, যা যন্ত্রপাতি ও ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘ সময় আংশিক মাধ্যাকর্ষণে থাকায় সেখানে বসবাসকারীদের হৃদরোগ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং হাড়ের ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।













