যে দিনটি বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস
- আপডেট সময় : ০৯:৫৮:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / 111
আজ ১৬ জুলাই, ঐতিহাসিক ‘জুলাই শহীদ দিবস’। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের দমনপীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে ঝরে যায় প্রথম প্রাণগুলো। এদিন সারা দেশে অন্তত ৬ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন, যার মধ্যে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইংরেজি বিভাগের দ্বাদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের আত্মত্যাগ পুরো আন্দোলনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়।
১৬ জুলাই দুপুর নাগাদ দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আগের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলার প্রতিবাদে এদিন রাস্তায় নেমে আসে লাখো শিক্ষার্থী।
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যখন পুলিশ ও তৎকালীন সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়, তখন বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান ২৩ বছর বয়সী তরুণ আবু সাঈদ। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কেবলই প্রতিরোধের এক বুক আত্মবিশ্বাস। পুলিশের একে একে ছোঁড়া ছররা গুলি ও শটগানের আঘাত সরাসরি তাঁর বুকে বিঁধে যায়। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জাতি।
আবু সাঈদের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এদিন কেবল রংপুর নয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামেও রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ।
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে পুলিশ ও যুবলীগের যৌথ হামলায় শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং পথচারী মো. ফারুক।
এদিনে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টিয়ারশেল ও বুলেটে প্রাণ হারান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজসহ আরও এক তরুণ।
এক নজরে ১৬ জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ:
- দুপুর ১২:০০ — বেরোবি ক্যাম্পাসের সামনে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তীব্র সংঘর্ষ।
- দুপুর ২:০০ — পুলিশের গুলিতে বুক পেতে দিয়ে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ।
- বিকেল ৩:৩০ — ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর মুহুর্মুহু হামলা, ৫ জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়া।
- সন্ধ্যা ৭:০০ — তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশে ভাষণ, যা আন্দোলনকারীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে।
- রাত ১০:০০ — সারা দেশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত ও ১৮ জুলাইয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা।
১৬ জুলাইয়ের এই রক্তপাত সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বৃত্ত ভেঙে দেশের শিক্ষক, অভিভাবক, দিনমজুর ও আপামর জনতাকে রাজপথে টেনে আনে। ইতিহাসে এটি ‘৩৬ দিনের জুলাই’-এর সবচেয়ে বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যা শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মাধ্যমে সফল পরিণতি লাভ করে।
আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল দু’জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। সেই রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও সহযোদ্ধারা।
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলেটা তো আর ফিরে আসবে না। আজ ওর কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। আদালত রায় দিয়েছে। কিন্তু সেই রায় যদি আমার জীবদ্দশায় কার্যকর হতে দেখতাম, তাহলে অন্তত মনে একটু শান্তি পেতাম।’ তিনি মামলার সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান।
মা মনোয়ারা বেগমও ছেলেকে হারানোর বেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিদিন বাবার কবরের কাছে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেও প্রতিদিন ফোন করে খোঁজ নিতো। এখন আর কেউ বলে না- মা, কেমন আছো? সংসারের দায়িত্ব নেয়ার কথা ছিল ওর। দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। যারা আমার বাবাটাকে হত্যা করেছে, তাদের সবার ফাঁসি চাই।’
















