জলবায়ু সংকট মোকাবিলা
তরুণদের চেতনায় টেকসই বিশ্বের বীজ বপনের তাগিদ
- আপডেট সময় : ০২:৫৬:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 78
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা বর্তমান বাংলাদেশের জন্য অন্যতম বৃহৎ ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক ঝুঁকি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অসময়ে বন্যা এবং ঋতুপরিবর্তনের অস্বাভাবিক রূপ আমাদের জনজীবন ও অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে পরিমাণ কার্যকর প্রস্তুতি প্রয়োজন, তাতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই বিশাল বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকার জন্য কেবল সাময়িক ত্রাণ বা তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। আর এই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে দেশের তরুণ সমাজের হাতে। তরুণদের শিক্ষা, মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিশ্ব গঠনের চিন্তা কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেই সচেতনতার বীজ এখনই তাদের মনে বপন করা জরুরি।
পরিবেশবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মেগাসিটি ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দূষিত শহরে পরিণত হয়েছে। এখানকার বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ক্রমাগত বায়ুদূষণের কারণে ঢাকা শহরের অধিবাসীদের গড় আয়ু প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। শুধু বায়ুদূষণই নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে এবং পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। একই সাথে নদীভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হিসেবে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা কেবল প্রকৃতিকে দোষ না দিয়ে মানবসৃষ্ট দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রোধ করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা বলছেন, জলবায়ু সংকটের মোকাবিলা করতে হলে ‘পরিবেশগত ন্যায়বিচার’ (Environmental Justice) নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের মাশুল বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো গুচ্ছোভেগে দিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক দরবারে নিজেদের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও পরিবেশবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
অভিযোজন ও ভবিষ্যৎ গঠনে তরুণদের ভূমিকা
পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা ‘অভিযোজন’ (Adaptation) এবং পরিবেশের টেকসই প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই এখন টিকে থাকার প্রধান উপায়। এই লড়াইয়ে তরুণ সমাজকে সামনের সারিতে নিয়ে আসতে হলে কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
পাঠ্যসূচিতে পরিবেশ ও জলবায়ু শিক্ষা: প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পরিবেশবিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই জীবনযাত্রার বিষয়গুলোকে আবশ্যিক করা।
সবুজ দক্ষতা (Green Skills) উন্নয়ন: নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিতে তরুণদের আগ্রহী করে তোলা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
সামাজিক ও স্থানীয় আন্দোলন: প্লাস্টিক দূষণ রোধ, নদী রক্ষা, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় তরুণদের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা।
নীতি নির্ধারণে যুব নেতৃত্ব: পরিবেশ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তরুণ প্রতিনিধিদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।
জলবায়ু সংকট কেবল কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের লড়াই। আজকের তরুণ সমাজকে সঠিক জ্ঞান, পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে এই সংকট অতিক্রম করে একটি টেকসই ও সবুজ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।













